ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

অনিয়ম-জালিয়াতির অভিযোগের মুখে ডব্লিউএইচওর পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬, ১০:২১ এএম

অনিয়ম-জালিয়াতির অভিযোগের মুখে ডব্লিউএইচওর পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ

ছবিঃ সংগৃহীত

বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও শিক্ষাগত সনদে অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগের তদন্তের মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন সায়মা ওয়াজেদ। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন তিনি বলে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

প্রায় এক বছর বেতন ছাড়া ছুটিতে থাকার পর এই পদত্যাগের ঘটনা ঘটল। ডব্লিউএইচওর এই গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক পদে সায়মা ওয়াজেদের দায়িত্ব পালন নিয়ে এরই মধ্যে তদন্ত ও প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছিল।

২০২৪ সালে দায়িত্ব গ্রহণ

২০২৩ সালের নভেম্বরে সদস্য দেশগুলোর ভোটে ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচিত হন সায়মা ওয়াজেদ। পরের বছর, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ বছরের মেয়াদে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তবে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিষয়েও তদন্ত শুরু করে।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ডব্লিউএইচও তাকে অবৈতনিক ছুটিতে পাঠায়।

কী অভিযোগ উঠেছিল সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে?

রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ডব্লিউএইচও সায়মা ওয়াজেদের বিরুদ্ধে কয়েকটি বিষয়ে তদন্ত করছিল। এর মধ্যে ছিল চীন ভ্রমণসংক্রান্ত আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ নিয়ে ভুল তথ্য প্রদান এবং বাংলাদেশে অবৈধভাবে প্লট অধিগ্রহণের অভিযোগ।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সায়মা ওয়াজেদ। তার আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চীন ভ্রমণসংক্রান্ত ৯০১ মার্কিন ডলারের সমন্বয় জটিলতা কোনো ধরনের ব্যক্তিগত আর্থিক অনিয়ম নয়; বরং একজন সহকারীর প্রশাসনিক ভুলের কারণে এ সমস্যা তৈরি হয়েছিল।

শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়ে তার দাবি, তার ডক্টরেট ডিগ্রিটি সম্মানসূচক (honorary) হওয়ায় বিষয়টি তিনি ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালককে আগেই জানিয়েছিলেন।

অর্থাৎ, তদন্তে অভিযোগগুলো উত্থাপিত হলেও সায়মা ওয়াজেদ নিজে এসব অভিযোগের দায় স্বীকার করেননি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

পদত্যাগপত্রে আস্থার সংকটের কথা

পদত্যাগপত্রে ডব্লিউএইচওর নেতৃত্বের প্রতি আস্থার সংকটের কথা জানিয়েছেন সায়মা ওয়াজেদ। তিনি অভিযোগ করেন, দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালনের ক্ষেত্রে তাকে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।

পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার কারণে ডব্লিউএইচওর নেতৃত্বের ওপর তার আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হয়েছে।

এ ছাড়া দীর্ঘ সময় বেতন ছাড়া ছুটিতে থাকায় তার আর্থিক পরিস্থিতিও অসহনীয় হয়ে উঠেছে বলে পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন তিনি। প্রায় এক বছর পারিশ্রমিক না পাওয়ার বিষয়টিকেও পদত্যাগের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন সায়মা ওয়াজেদ।

ডব্লিউএইচওতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এগোচ্ছিল

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সায়মা ওয়াজেদকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদ থেকে সরানোর প্রক্রিয়াও চলছিল। এর মধ্যেই তিনি নিজে পদত্যাগপত্র জমা দিলেন।

ফলে তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালক পদে নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সামনে চলে এসেছে।

নতুন আঞ্চলিক পরিচালক কবে?

সংস্থা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আগামী ১২ অক্টোবর এই পদের জন্য নতুন মনোনয়ন ঘোষণা করা হতে পারে। এরপর মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষে আগামী ২৪ জানুয়ারি নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনের জন্য ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে নতুন পরিচালক নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত এই পদে অন্তর্বর্তী বা ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা কীভাবে চলবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রভাবও আলোচনায়

সায়মা ওয়াজেদ বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সায়মা ওয়াজেদের ডব্লিউএইচওর দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়।

তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো এখনো অভিযোগ ও তদন্তের পর্যায়েই রয়েছে। সায়মা ওয়াজেদ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং কয়েকটি বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। ফলে পদত্যাগের ঘটনাকে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চল জনস্বাস্থ্য, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালীকরণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ করে। এ অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদটি তাই আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ।

সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগের ফলে এখন ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। আগামী কয়েক মাসে মনোনয়ন, যাচাই-বাছাই ও ভোটের মধ্য দিয়ে নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে।

সংক্ষেপে, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ বছরের মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়া সায়মা ওয়াজেদ তদন্ত ও প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে প্রায় এক বছর অবৈতনিক ছুটিতে থাকার পর বুধবার ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালকের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষাগত সনদ ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচনের দিকেই নজর থাকবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!