ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

ই-নামজারি-অনলাইন খাজনা চালু হলেও ভূমি অফিসে ঘুষের অভিযোগ, সংসদে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম

ই-নামজারি-অনলাইন খাজনা চালু হলেও ভূমি অফিসে ঘুষের অভিযোগ, সংসদে প্রশ্ন

ছবিঃ সংগৃহীত

শতভাগ ই-নামজারি ও অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধের ব্যবস্থা চালু হলেও সাবরেজিস্ট্রি ও ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না—এমন অভিযোগ নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদ। একই সঙ্গে ভুয়া দলিলের মাধ্যমে সরকারি খাসজমি ও সংখ্যালঘুদের জমি দখলের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালীদের তালিকা প্রকাশের বিষয়েও সরকারের কাছে জানতে চান তিনি।

রবিবার (৩০ আগস্ট) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনুর কাছে এসব বিষয়ে প্রশ্ন করেন সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদ।

ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না—সংসদে অভিযোগ

সংসদে প্রশ্ন করার সময় সুলতানা আহমেদ বলেন, ভূমি সেবাকে ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি ও ঘুষ দাবির অভিযোগ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

বিশেষ করে ভূমি অফিস ও সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ে নামজারি, জমির রেকর্ড সংশোধন, খাজনা, খতিয়ানসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে অনৈতিক অর্থ দিতে হয়—এমন অভিযোগের বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চান তিনি।

তিনি জানতে চান, ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত দুর্নীতিবাজ তহসিলদার বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একই সঙ্গে ভুয়া দলিল তৈরি করে সরকারি খাসজমি এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন জমি দখলের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকা কবে প্রকাশ করা হবে, সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা: ভূমিমন্ত্রী

জবাবে ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ও ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তাদের কার্যক্রম-সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কমিশনার।

মন্ত্রী জানান, ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মাঠপর্যায়ে কর্মরত এসব কর্মকর্তার কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে বিভাগীয় প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তদন্ত করা হয় এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অর্থাৎ, ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে সংসদকে জানান মন্ত্রী।

অনলাইনে অভিযোগ জানানোর নতুন ব্যবস্থা

ভূমি-সংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ জানাতে সম্প্রতি অনলাইনভিত্তিক অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সিস্টেম চালু করা হয়েছে বলেও সংসদে জানান ভূমিমন্ত্রী।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের যেকোনো স্থান থেকে ভূমি সংক্রান্ত অভিযোগ অনলাইনে দাখিল করা যাবে। সিস্টেমে পাওয়া অভিযোগগুলো নিয়মিতভাবে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এবং অভিযোগকারীদের মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে ফিডব্যাক দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

এ ছাড়া গ্রিভ্যান্স রিড্রেস সিস্টেম (জিআরএস)-এর মাধ্যমেও পাওয়া অভিযোগের বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ভূমি সেবায় হটলাইন ১৬১২২

ভূমি সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ বা সমস্যার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে ১৬১২২ নম্বরে যোগাযোগ করার সুযোগ রয়েছে বলেও সংসদে জানান ভূমিমন্ত্রী।

ফলে ভূমি অফিসে সরাসরি গিয়ে হয়রানির শিকার হওয়ার পাশাপাশি অনিয়ম, দুর্নীতি বা সেবা না পাওয়ার অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনলাইন ও হটলাইনের মাধ্যমে জানানোর সুযোগ রয়েছে।

খাসজমি অবৈধ দখলমুক্ত করা চলমান প্রক্রিয়া

সরকারি খাসজমি দখলের বিষয়ে ভূমিমন্ত্রী বলেন, দেশের খাসজমি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন জেলা প্রশাসকরা। তাদের তত্ত্বাবধানে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে খাসজমি নিয়মিত মনিটরিং করেন।

মন্ত্রী বলেন, সরকারি খাসজমি অবৈধভাবে দখল হলে তা দখলমুক্ত করে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া। দেশের যেকোনো স্থানে খাসজমি অবৈধ দখলের ঘটনা ঘটলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।

ভুয়া দলিল তৈরি দণ্ডনীয় অপরাধ

ভুয়া দলিলের মাধ্যমে জমি দখলের বিষয়েও সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন ভূমিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভুয়া দলিল তৈরি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের দলিলের মাধ্যমে সরকারি খাসজমি কিংবা সংখ্যালঘুদের জমি দখলের ঘটনা ঘটলে আইন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

তবে সংসদ সদস্যের প্রশ্নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ—ঘুষ ছাড়া ফাইল না নড়ার অভিযোগে কতজন কর্মকর্তা বা তহসিলদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কতজনকে কী ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়েছে এবং খাসজমি ও সংখ্যালঘুদের জমি দখলের ঘটনায় কতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে জবাবে কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বা তালিকা দেওয়া হয়নি।

ডিজিটাল ভূমিসেবার পরও মাঠপর্যায়ের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন

ভূমি সেবাকে ডিজিটাল করার ফলে নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধসহ বিভিন্ন সেবা অনলাইনে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে সরাসরি অফিসে গিয়ে সেবা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে সংসদে উত্থাপিত অভিযোগের কারণে প্রশ্ন উঠেছে—ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর পরও মাঠপর্যায়ে যদি ঘুষ, হয়রানি বা অনিয়মের অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি পুরোপুরি বন্ধ করতে নজরদারি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হচ্ছে।

বিশেষ করে ঘুষের অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার সংখ্যা, তদন্তের ফলাফল ও শাস্তির তথ্য প্রকাশ করা হলে ভূমি প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও জোরদার হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে, একদিকে ভূমি সেবাকে ডিজিটাল ও সহজ করার উদ্যোগ, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে ঘুষ ও জমি দখল নিয়ে অভিযোগ—দুটি বিষয়ই এখন আলোচনায় এসেছে। সংসদে মন্ত্রীর দেওয়া জবাবে অভিযোগ তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ না হওয়ায় ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দাবি উঠতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!