ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

দেশীয় কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি নির্ভরতা কমানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬, ১০:১৭ এএম

দেশীয় কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি নির্ভরতা কমানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশে উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে—এমন কৃষি ও খাদ্যপণ্যের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, লাভজনক ও আধুনিক করতে গবেষণা, উন্নত জাত, আধুনিক প্রযুক্তি, সেচ ও কৃষিযান্ত্রিকীকরণের সুবিধা দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। যেসব কৃষিপণ্য দেশে উৎপাদন করা সম্ভব, সেসব পণ্যের উৎপাদন বাড়িয়ে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সচিবালয়ে নিজের কার্যালয় থেকে পায়ে হেঁটে কৃষি মন্ত্রণালয়ে যান প্রধানমন্ত্রী। পরে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে কৃষি খাতের সার্বিক পরিস্থিতি, চলমান কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি।

সরিষার উৎপাদন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে

বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশের কৃষি উৎপাদনের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরিষার উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগের কথা জানানো হয়।

মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে সরিষার উৎপাদন ছিল ৮ দশমিক ২৪ লাখ মেট্রিক টন। কয়েক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৩৪ লাখ মেট্রিক টনে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরিষার উৎপাদন আরও বেড়ে ১৫ দশমিক ৪১ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে।

ভোজ্যতেলের চাহিদার একটি অংশ দেশীয়ভাবে উৎপাদিত সরিষা দিয়ে পূরণ করা গেলে আমদানির ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের সুযোগও তৈরি হতে পারে। এ কারণে সরিষার উৎপাদন আরও সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বৈঠকে।

পেঁয়াজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে নতুন উদ্যোগ

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ার-ফ্লো প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের উন্নত জাতের সম্প্রসারণের মাধ্যমে বছরের বিভিন্ন সময়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

পেঁয়াজের উৎপাদন ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো গেলে মৌসুমি ঘাটতি মোকাবিলা এবং বাজারে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে তা সহায়ক হতে পারে। বৈঠকে এ বিষয়েও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

জলবায়ু সহনশীল ফসলের জাত সম্প্রসারণ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় লবণাক্ততা, খরা ও জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু নতুন জাতের ফসল মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের বিষয়টিও বৈঠকে উঠে আসে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষির পরিবেশ ও মাটির বৈশিষ্ট্য এক নয়। কোথাও লবণাক্ততা, কোথাও খরা আবার কোথাও জলাবদ্ধতার কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়। এসব প্রতিকূলতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সক্ষম ফসলের জাত কৃষকের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এর ফলে প্রতিকূল পরিবেশেও উৎপাদন ধরে রাখা এবং কৃষিজমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

১ হাজার ৯০টি ফসলের জাত উদ্ভাবন

কৃষি গবেষণায় দেশের অগ্রগতির চিত্রও বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বিভিন্ন ফসলের মোট ১ হাজার ৯০টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর মধ্যে ধানের জাত রয়েছে ১৫৫টি।

এ ছাড়া কৃষি উৎপাদন বাড়াতে এক হাজারের বেশি কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের তথ্যও উপস্থাপন করা হয়। এসব গবেষণা ও প্রযুক্তির সুফল কৃষকের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গবেষণার ফলাফল মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিতে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়তে পারে।

কৃষিযান্ত্রিকীকরণে আরও গুরুত্ব

কৃষিতে শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে যান্ত্রিকীকরণের ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

দেশীয়ভাবে কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবন ও উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার ও রাইস ট্রান্সপ্লান্টারসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র কৃষকের কাছে সুলভমূল্যে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।

কৃষিতে শ্রমিক সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কৃষকের সময় ও শ্রম সাশ্রয়ের মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম আরও গতিশীল করার সুযোগ রয়েছে।

সৌর সেচে কমতে পারে জ্বালানি ব্যয়

কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। বর্তমানে দেশে ২ হাজার ৬১৭টি সৌর সেচব্যবস্থা রয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সৌরবিদ্যুৎনির্ভর সেচব্যবস্থা আরও সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের সেচ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতে পারে।

কৃষি খাতে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো হলে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের লক্ষ্যও এগিয়ে যাবে।

কৃষক কার্ডে ৪৩ লাখ কৃষককে যুক্ত করার লক্ষ্য

কৃষকদের সরকারি সহায়তা আরও সরাসরি ও কাঠামোবদ্ধভাবে পৌঁছে দিতে কৃষক কার্ড কর্মসূচিকেও বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪৩ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ডের আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কৃষককে কার্ড দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা, কৃষি উপকরণ ও বিভিন্ন সেবার সঙ্গে কৃষকদের আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

খাল খনন, বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণেও গুরুত্ব

কৃষির সামগ্রিক উন্নয়নে শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, সেচ, পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ এবং কৃষিপণ্যের পরবর্তী ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বিপণন নিয়েও আলোচনা হয়। উৎপাদনের পর কৃষকের পণ্য যাতে নষ্ট না হয় এবং বাজারজাতকরণের সময় ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ থাকে, সে বিষয়েও নজর দেওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

আমদানি নির্ভরতা কমানোর মূল লক্ষ্য উৎপাদন বাড়ানো

বৈঠকের মূল আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল দেশে উৎপাদন করা সম্ভব এমন কৃষি ও খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো।

প্রধানমন্ত্রী কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের বলেন, যেসব পণ্য দেশে উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে, সেগুলোর উৎপাদন বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য কৃষি গবেষণা ও উন্নত জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত সেচ, কৃষিযান্ত্রিকীকরণ এবং কৃষকের কাছে প্রয়োজনীয় সেবা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দিতে হবে।

একই সঙ্গে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না—কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

খাদ্যনিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় কৃষি উৎপাদন শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই। আমদানিনির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকের সক্ষমতা বাড়ানো, প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ, ফসলের বহুমুখীকরণ, সংরক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা এবং বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করাও গুরুত্বপূর্ণ।

রোববারের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এসব বিষয়ই গুরুত্ব পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গবেষণা থেকে মাঠপর্যায়ের কৃষক পর্যন্ত প্রযুক্তি ও সরকারি সহায়তা কার্যকরভাবে পৌঁছানো গেলে দেশীয় কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের আয় ও খাদ্যনিরাপত্তা—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!