নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামে যখন নিম্ন আয়ের মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে, তখন তাদের খাবারের তালিকায় থাকা বনরুটি, বাটারবান ও অন্যান্য বেকারি পণ্যের দামও বাড়ছে। শুধু দাম বাড়ানো নয়, একই দাম রেখে পণ্যের ওজন ও আকার কমিয়ে দেওয়ার পথেও হাঁটছে কিছু বেকারি প্রতিষ্ঠান।
ব্যবসায়ীদের দাবি, ময়দা, চিনি, ডালডা, তেল, প্যাকেজিং সামগ্রীসহ উৎপাদনের বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় বেকারি পণ্যের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। ফলে লোকসান সামাল দিতে পণ্যের দাম ও ওজনে সমন্বয় করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, এভাবে হঠাৎ দাম বাড়ানো বা পণ্যের আকার ছোট করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। কারণ দিনমজুর, রিকশাচালক, হকারসহ প্রান্তিক মানুষের একটি বড় অংশের স্বল্পমূল্যের নাশতা বা তাৎক্ষণিক খাবারের অন্যতম ভরসা বনরুটি ও বাটারবান।
চা-রুটিও এখন অনিশ্চিত শ্রমজীবীদের
মিরপুর এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান মো. সাইমন। প্রতিদিন সকালে বাসা থেকে ভাত খেয়ে কাজে বের হন তিনি। এরপর বেলা ১১টা থেকে ১২টার দিকে ক্ষুধা লাগলে রাস্তার পাশের চায়ের দোকান থেকে একটি বনরুটি বা বাটারবান এবং এক কাপ চা খেয়ে নেন।
কিন্তু গত দুই-তিন দিন ধরে তার পরিচিত কয়েকটি চায়ের দোকানে বনরুটি পাওয়া যাচ্ছে না। আবার শিগগিরই এসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে—এমন কথাও শুনছেন তিনি।

সাইমনের ভাষায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়লেও তার আয় বাড়েনি। ফলে কম দামের একটি বনরুটি ও চা-ও যদি নাগালের বাইরে চলে যায়, তাহলে কর্মজীবী মানুষের দৈনন্দিন খাবারের হিসাব আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, ‘বাজারে তো কোনও কিছুর দাম কম বলে কিছু নেই আমাদের জন্য। আমাদের জন্য সবকিছুর দামই বেশি। সকালবেলা ভাত খেয়ে বের হই। ১১-১২টার দিকে ক্ষুধা লাগলে চা-রুটি খাই। এখন সেই রুটিও ঠিকমতো সব দোকানে পাই না। আবার বলছে দামও নাকি বাড়বে। এরকম হলে আমরা আসলে কী করবো? সবকিছুর দাম বাড়ে, আমাদের খরচ বাড়ে। খালি আমাদের ইনকাম বাড়ে না।’
কয়েক দিন ধরে দোকানে বনরুটি সরবরাহ বন্ধ
মিরপুরের একটি চায়ের টং দোকানের বিক্রেতা জোৎস্না জানান, কয়েক দিন ধরে স্থানীয় বেকারি থেকে বনরুটি ও বাটারবান সরবরাহ করা হচ্ছে না। আপাতত তিনি কেক বিক্রি করছেন।
তার ভাষ্য, বেকারি ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন। যে বাটারবান আগে ২০ টাকায় বিক্রি করতেন, সেটি ২৫ টাকা করার কথা বলা হচ্ছে। অন্যান্য রুটির দামও প্রায় ৫ টাকা করে বাড়ানোর আলোচনা চলছে বলে তিনি শুনেছেন।
মিরপুর-১ নম্বর এলাকার আরেক চায়ের দোকানি রাহেলা বেগমও একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তার দোকানে কয়েক দিন ধরে বেকারি পণ্যের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। তার ধারণা, দাম সমন্বয়ের প্রস্তুতির কারণেই সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
সব বেকারি অবশ্য দাম বাড়াচ্ছে না
তবে বাজারের সব বেকারি প্রতিষ্ঠান একই সিদ্ধান্ত নেয়নি। মিরপুর-২ নম্বরের অলিম্পিয়া বেকারি মিরপুর-২, ১০ ও ১৩ নম্বর, কাফরুল, বনানী ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় পাউরুটি, বনরুটি ও অন্যান্য বেকারি পণ্য সরবরাহ করে।
প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহের দায়িত্বে থাকা এক কর্মী জানান, গত বছর দুই দফায় পণ্যের দাম বাড়ানোর পর বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে নতুন করে দাম বাড়ালে বিক্রি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মী বলেন, মানুষের আয় বাড়েনি, কিন্তু ব্যয় বেড়েছে। এ অবস্থায় ১০ টাকার একটি বনরুটি ১৫ টাকা করা হলে অনেক ক্রেতাই তা কিনতে চাইবেন না। তাই আপাতত তাদের প্রতিষ্ঠানে নতুন করে দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই।
দাম না বাড়িয়ে কমতে পারে পণ্যের ওজন
মিরপুর-২ নম্বরের বনলতা লাইভ বেকারি শাখার ম্যানেজার মকিদুল ইসলাম শিশির জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দাম বাড়ানো বা পণ্যের ওজন কমানোর কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় দুটি সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
তার মতে, একদিকে পণ্যের দাম বাড়ানোর কথা ভাবা হচ্ছে; অন্যদিকে দাম অপরিবর্তিত রেখে পণ্যের ওজন কমিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ৪০০ গ্রামের ব্রেডের ওজন কমিয়ে ৩২০ থেকে ৩৫০ গ্রাম করা হতে পারে। আর যদি দাম বাড়ানো হয়, তাহলে ৪০০ গ্রাম ওজনই রাখা হতে পারে।
তিনি জানান, বেকারি মালিক সমিতির সিদ্ধান্তের ওপরও অনেক প্রতিষ্ঠান নির্ভর করছে। তবে তাদের কোম্পানি থেকে এখনো চূড়ান্ত নির্দেশনা আসেনি।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
বেকারি পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে শুধু কাঁচামালের দাম নয়, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন উৎপাদকরা।
বনলতা লাইভ বেকারির ম্যানেজার মকিদুল ইসলাম শিশির জানান, আগে যে গ্যাসের জন্য প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হতো, এখন তা বেড়ে প্রায় ৫ হাজার ২০০ টাকা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় হচ্ছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটরে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি খরচ হয়। প্রতি লিটার জ্বালানির দাম প্রায় ১৫০ টাকা হওয়ায় কোনো কোনো দিনে শুধু জেনারেটর চালাতেই প্রায় ২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
লাইভ বেকারিতে ওভেন, মিক্সারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হয়। ফলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়।
২০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য সমন্বয়ের কথা বলছে মালিক সমিতি
বেকারি পণ্যের মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বেকারি মালিক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা ইচ্ছা করে দাম বাড়াতে চান না। কিন্তু ময়দা, ডালডা, তেল ও প্যাকেজিং সামগ্রীর দাম বৃদ্ধির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়েছে।
তার দাবি, পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন পণ্যে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য সমন্বয় করা হচ্ছে। কিছু পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে, আবার কিছু পণ্যের ওজন কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
জালাল উদ্দিন বলেন, আগে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকার ময়দা এখন প্রায় ৩ হাজার ২০০ টাকায় উঠেছে। একইভাবে ২৫ হাজার টাকার তেলের ড্রাম বেড়ে ৩৩ হাজার টাকা হয়েছে। প্যাকেজিং সামগ্রীর দামও ৮০-৮৫ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১৪০ টাকা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

তার ভাষ্য, এসব কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হয়ে বেকারি শিল্পের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে।
শ্রমজীবী মানুষের ওপর চাপ বাড়ার কথা স্বীকার ব্যবসায়ীদের
বেকারি মালিক সমিতির সভাপতি স্বীকার করেন, তাদের পণ্যের প্রধান ক্রেতাদের একটি বড় অংশ শ্রমজীবী মানুষ। দিনমজুর, রিকশাচালক, হকারসহ নিম্ন আয়ের মানুষের দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় বনরুটি ও অন্যান্য বেকারি পণ্যের উপস্থিতি রয়েছে।
ফলে দাম বা ওজনের সমন্বয়ের প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে—এটি ব্যবসায়ীরাও বুঝতে পারছেন। তবে কাঁচামালের দাম না কমলে উৎপাদন চালিয়ে যেতে তাদের জন্য মূল্য সমন্বয় ছাড়া বিকল্প কম বলে দাবি তাদের।
জালাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি, সাধারণ মানুষের ওপর, বিশেষ করে গরিব মানুষের ওপর চাপ পড়ছে। এরপরও আমাদের কোনও পথ নেই। কারণ আমাদের ম্যাক্সিমাম কাস্টমার হলো শ্রমজীবী মানুষ—যারা দিনমজুর, রিকশা চালায়, হকারি করে।’
ছোট বেকারি ব্যবসায়ীদের টিকে থাকা নিয়েও শঙ্কা
বেকারি মালিক সমিতির সভাপতি আরও অভিযোগ করেন, বড় ব্যবসায়ীরা ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ কঠিন করে তুলছেন। স্বল্প পুঁজি নিয়ে পরিচালিত বেকারি ব্যবসাগুলো বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে বলে তার দাবি।
তার মতে, বড় শিল্পগোষ্ঠী যদি একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ছোট ও মাঝারি খাদ্যপণ্যের বাজারে প্রবেশ করে, তাহলে সীমিত পুঁজির স্থানীয় উদ্যোক্তারা আরও চাপে পড়বেন। এ কারণে ছোট উদ্যোক্তাদের সুরক্ষায় কার্যকর নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
ভোক্তা অধিকারকর্মীদের আপত্তি
বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানো ও ওজন কমানোর প্রক্রিয়ায় আপত্তি জানিয়েছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন।
তিনি বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক মানুষ রুটি, বনরুটি ও অন্যান্য বেকারি পণ্যের ওপর নির্ভর করে দিন পার করেন। এমনকি হাসপাতালের রোগীদের খাবারের তালিকাতেও এসব পণ্যের ব্যবহার রয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়লে এর প্রভাব সমাজের বিস্তৃত একটি অংশের ওপর পড়বে।
তার মতে, ব্যবসায়ীরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করে হঠাৎ করে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে একই দামে পণ্যের আকার বা ওজন কমিয়ে দেওয়ার প্রবণতাকেও তিনি ভোক্তার স্বার্থের পরিপন্থি বলে মনে করেন।
এস এম নাজের হোসাইন বলেন, শুধু দাম বাড়ানো নয়, অনেক ক্ষেত্রে রুটির আকার ছোট করে দেওয়া হচ্ছে। আবার ১০ টাকার রুটি ১৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এ ধরনের সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
কাঁচামাল, জ্বালানি ও বাজারদর—ত্রিমুখী চাপে বেকারি শিল্প
সব মিলিয়ে বেকারি শিল্প এখন কয়েক দিক থেকে ব্যয়ের চাপে রয়েছে। ময়দা, চিনি, ডালডা ও তেলের মতো কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, প্যাকেজিং ব্যয় এবং গ্যাস-বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় উৎপাদকরা দাম বাড়ালেই বিক্রি কমে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।
এই পরিস্থিতিতে কোনো প্রতিষ্ঠান দাম বাড়িয়ে খরচ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, কোনো প্রতিষ্ঠান আপাতত দাম অপরিবর্তিত রাখছে, আবার কোথাও পণ্যের ওজন কমিয়ে একই দাম রাখার পরিকল্পনা আলোচনায় রয়েছে।
ফলে সামনে বনরুটি, বাটারবান, পাউরুটি ও অন্যান্য বেকারি পণ্যের বাজারে দাম বাড়া কিংবা পণ্যের আকার ছোট হয়ে যাওয়ার প্রবণতা আরও দৃশ্যমান হতে পারে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে সেই শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর, যাদের দৈনন্দিন খাবারের একটি সহজলভ্য ও তুলনামূলক কম খরচের বিকল্প হলো চা-রুটি।

