ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

যানজট কমাতে সরছে গাবতলী-মহাখালী-সায়েদাবাদ টার্মিনাল, বিকল্প ডিপো ব্যবহারের পরিকল্পনা

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬, ১০:৩৪ এএম

যানজট কমাতে সরছে গাবতলী-মহাখালী-সায়েদাবাদ টার্মিনাল, বিকল্প ডিপো ব্যবহারের পরিকল্পনা

ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানীর দীর্ঘদিনের যানজট কমাতে ঢাকার প্রধান বাস টার্মিনালগুলোর ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি বিকল্প স্থান ও বিদ্যমান ডিপোগুলো কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পনার আওতায় গাবতলী বাস টার্মিনাল সম্প্রসারণ, কাঁচপুর ও পূর্বাচল এলাকার ডিপো ও অবকাঠামো ব্যবহার, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়কের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং সিটি করপোরেশনের অধীন বাস টার্মিনালগুলো আধুনিকায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে নির্ধারিত বাস কাউন্টার স্থাপন, যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন, গণপরিবহনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং এসি বাসগুলোকে নির্দিষ্ট টার্মিনাল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলনকক্ষে বৃহত্তর ঢাকার যানজট নিরসনে গঠিত জাতীয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে সড়ক পরিবহন ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এসব তথ্য জানান।

প্রধান চার টার্মিনালের ওপর চাপ কমানোর পরিকল্পনা

রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ ও গুলিস্তান বাস টার্মিনালকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বাস ও যাত্রী চলাচল করে। এসব টার্মিনাল ও আশপাশের সড়কে বাসের অতিরিক্ত চাপ, যাত্রী ওঠানামা, পার্কিং এবং কাউন্টারকেন্দ্রিক কার্যক্রমের কারণে যানজট বাড়ে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

এ কারণে শুধু বিদ্যমান চার টার্মিনালকে কেন্দ্র করে পরিবহন ব্যবস্থাপনা না করে ঢাকার প্রবেশ ও বহির্গমন পথের কাছাকাছি বিকল্প ডিপো এবং টার্মিনাল সুবিধা ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, রাজধানীর যানজটের অন্যতম বড় কারণ শহরের ভেতরে বাস ও অন্যান্য গণপরিবহনের অতিরিক্ত চাপ। এই চাপ কমাতে বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প অবকাঠামো ব্যবহার করা হবে।

কাঁচপুর ও পূর্বাচলের ডিপো কাজে লাগানোর উদ্যোগ

বিকল্প পরিবহন অবকাঠামো হিসেবে কাঁচপুর ও পূর্বাচল এলাকায় থাকা ডিপো ও অন্যান্য সুবিধা ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার বাইরে থেকে আসা কিছু গণপরিবহন রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে না ঢুকেই নির্ধারিত এলাকায় থামানো বা ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা সম্ভব হতে পারে। এতে শহরের ভেতরের সড়কে বাসের চাপ কমানোর পাশাপাশি টার্মিনালকেন্দ্রিক যানজট নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে কোন রুটের বাস কোন ডিপো বা টার্মিনাল ব্যবহার করবে এবং কীভাবে যাত্রীদের সহজে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হবে—এসব বিষয় বাস্তবায়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

সম্প্রসারণ করা হবে গাবতলী বাস টার্মিনাল

গাবতলী বাস টার্মিনাল সম্প্রসারণের বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে। টার্মিনালের আশপাশে থাকা নতুন জায়গাগুলো দ্রুত ব্যবহারের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হওয়ায় গাবতলী এলাকায় দূরপাল্লার বাস ও অন্যান্য যানবাহনের চাপ বেশি। টার্মিনালের ধারণক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা উন্নত করা গেলে রাস্তার ওপর বাস দাঁড় করানো, যাত্রী ওঠানামা এবং এলোমেলো পার্কিংয়ের চাপ কমানো সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

রাজধানীর প্রবেশপথে নজর

যানজট নিরসনের পরিকল্পনায় শুধু ঢাকার অভ্যন্তরের সড়ক নয়, রাজধানীর প্রবেশপথগুলোকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ঢাকার সঙ্গে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের জেলার সড়ক যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব পথে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক বাস ও অন্যান্য যানবাহন ঢাকায় প্রবেশ করে। ফলে প্রবেশপথে যানবাহনের চাপ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে রাজধানীর অভ্যন্তরে যানজট কমানো কঠিন।

এ কারণে বিকল্প টার্মিনাল ও ডিপো কার্যকর করার পাশাপাশি ঢাকার বাইরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জ-গাজীপুরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

বৃহত্তর ঢাকার যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে সড়কের ওপর থাকা অবৈধ স্থাপনাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সভায় নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়কের জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব স্থাপনা সরিয়ে সড়কের প্রয়োজনীয় জায়গা যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন সড়কের জায়গা দখল করে নতুন করে স্থাপনা গড়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়েও নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

সিটি করপোরেশনের টার্মিনাল হবে আধুনিক

সভায় সিটি করপোরেশনগুলোর ব্যবস্থাপনায় থাকা বাস টার্মিনালগুলোর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

টার্মিনালে নির্ধারিত বাস কাউন্টার স্থাপন, যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা এবং বাসগুলোর শৃঙ্খলাপূর্ণ অবস্থান ও চলাচলের ব্যবস্থা করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

এতে টার্মিনালের বাইরে যত্রতত্র বাস দাঁড় করানো এবং সড়কের ওপর যাত্রী ওঠানামার প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এসি বাসের জন্য নির্দিষ্ট টার্মিনাল

গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা আরও সুশৃঙ্খল করতে এসি বাসগুলোকে নির্দিষ্ট টার্মিনাল ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

এর ফলে বিভিন্ন কোম্পানির বাসের জন্য নির্দিষ্ট কাউন্টার ও অপেক্ষমাণ স্থান নির্ধারণ করা গেলে টার্মিনাল এলাকার বিশৃঙ্খলা কমতে পারে। একই সঙ্গে যাত্রীদের জন্য টিকিট সংগ্রহ, অপেক্ষা এবং বাসে ওঠার প্রক্রিয়াও আরও সুশৃঙ্খল করা সম্ভব হবে।

আগের কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি পর্যালোচনা

সভায় শুধু নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি; এর আগে যানজট নিরসনে নেওয়া নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন কতদূর এগিয়েছে, সেটিও পর্যালোচনা করা হয়েছে।

কোন কাজগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন এবং কোন ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বা সমন্বয়গত সমস্যা রয়েছে—এসব বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়।

প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। কারণ রাজধানীর যানজট শুধু একটি সংস্থার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়; সড়ক, পরিবহন, পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

‘শুধু ঢাকার ভেতরের যানজট কমালেই হবে না’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু রাজধানীর অভ্যন্তরের যানজট কমানোর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বৃহত্তর ঢাকার পুরো যোগাযোগব্যবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

এ জন্য গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মহাসড়কের প্রতিবন্ধকতা দূর করা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং গণপরিবহনের শৃঙ্খলাপূর্ণ চলাচল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অর্থাৎ ঢাকার যানজটকে শুধু মহানগরের সমস্যা হিসেবে না দেখে ঢাকা ও এর আশপাশের জেলার সঙ্গে সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

দ্রুত বাস্তবায়নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ

রাজধানীর যানজট কমাতে এর আগেও বিভিন্ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরিকল্পনার পাশাপাশি সেগুলোর সময়মতো বাস্তবায়ন না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি।

এবারও বিকল্প টার্মিনাল, ডিপো ব্যবহার, গাবতলী সম্প্রসারণ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও টার্মিনাল আধুনিকায়নের মতো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় কতটা করা যায়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজধানীতে বাসের প্রবেশ ও অবস্থানজনিত চাপ কমার পাশাপাশি টার্মিনালকেন্দ্রিক যানজট নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

সভায় যারা ছিলেন

সভায় ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৃহত্তর ঢাকার যানজট নিরসনে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের ওপর সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!