সন্তানকে সম্পত্তি দান করার পরও জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ভোগ ও দখলে রাখার অধিকার পাবেন বাবা-মা। একইভাবে পিতা-মাতা বা পিতামহ-মাতামহ থেকে সন্তান বা নাতি-নাতনিকে এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রেও দাতার আজীবন ভোগাধিকার সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ সংক্রান্ত ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সংসদ অধিবেশনে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিলটি উত্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
নতুন বিধানের ফলে বাবা-মা জীবিত থাকা অবস্থায় সন্তানকে সম্পত্তি দান করলেও, দানকৃত সম্পত্তিতে তাদের বসবাস, ব্যবহার ও ভোগদখলের অধিকার আইনগতভাবে সংরক্ষিত থাকবে। ফলে সম্পত্তি দানের পর বাবা-মাকে ওই সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার ঝুঁকি কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কী থাকছে নতুন আইনে?
বিলে বলা হয়েছে, পিতা-মাতা বা পিতামহ/মাতামহ তার সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন। একইভাবে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রেও দাতার জীবনকাল পর্যন্ত ভোগাধিকার সংরক্ষণের সুযোগ থাকবে।
অর্থাৎ, কোনো বাবা যদি তার বাড়ি, জমি বা অন্য কোনো স্থাবর সম্পত্তি সন্তানের নামে দান করে দেন, তাহলে দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় ওই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার বজায় রাখতে পারবেন। একই বিধান মা, পিতামহ-মাতামহ এবং স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
এ ক্ষেত্রে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরের সঙ্গে দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকারকে আলাদাভাবে সুরক্ষা দেওয়া হবে।
দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলে কী হবে?
নতুন বিধানে এ বিষয়টিও স্পষ্ট করা হয়েছে। দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তির গ্রহীতা মারা গেলে, দাতার ভোগাধিকার বহাল থাকবে। একই সঙ্গে আইন অনুযায়ী সম্পত্তিটি গ্রহীতার বৈধ ওয়ারিশদের কাছে হস্তান্তরিত হবে।
অর্থাৎ, সম্পত্তি দানের পর গ্রহীতার মৃত্যু হলেও দাতাকে সঙ্গে সঙ্গে ওই সম্পত্তির ভোগাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। অন্যদিকে উত্তরাধিকার আইনের বিধান অনুযায়ী গ্রহীতার ওয়ারিশদের অধিকারও বিবেচনায় থাকবে।
কেন এই সংশোধন আনা হলো?
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে আইনমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে বিধান থাকলেও দাতার জীবদ্দশা পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে দান করার বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান ছিল না।
এই আইনি ঘাটতি পূরণ করতেই নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক সম্পত্তি দানের ব্যবস্থাকে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
সব ধর্মের মানুষের জন্য প্রযোজ্য
আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, নতুন এই বিধান কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে না। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হবে।
এর ফলে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে বাবা-মা বা অন্য দাতারা নিজেদের জীবনকালীন আবাসন ও ভোগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ পাবেন।
বিশেষ করে জীবনের শেষ পর্যায়ে থাকা বাবা-মা সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর যেন নিজেদের বসতভিটা বা সম্পত্তির ব্যবহার থেকে বঞ্চিত না হন, সেই বিষয়টি নতুন বিধানের মাধ্যমে গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রচলিত দান বা হেবায় প্রভাব পড়বে না
বিলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নতুন এই বিধান চালু হলেও প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের অধীন হেবা বা আইন দ্বারা স্বীকৃত অন্য কোনো ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতির ওপর এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
আইনমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত বিধান অন্য প্রচলিত সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না। বরং দাতা চাইলে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের এই বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারবেন।
বিরোধীদলের আপত্তি
তবে বিলটি নিয়ে সংসদে আপত্তি জানিয়েছে বিরোধীদল। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বিলটির বিধানকে শরিয়াবিরোধী বলে উল্লেখ করে তীব্র আপত্তি জানান।
বিরোধীদল বিলটির ওপর ভোটে অংশ নেয়নি। বিল পাসের আগে তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।
ফলে বিরোধীদলের অংশগ্রহণ ছাড়াই কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।
সরকারি দলের দাবি, সুরক্ষিত হবে বাবা-মায়ের অধিকার
অন্যদিকে সরকারি দল বিলটির পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছে, নতুন আইনটি বাবা-মায়ের সম্পত্তিগত ও আবাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সরকারি দলের সদস্যদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা জীবিত থাকতেই সন্তানদের নামে বাড়ি বা জমি লিখে দেওয়ার পর ওই সম্পত্তিতে তাদের থাকার বা ভোগ করার অধিকার নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। নতুন আইনের মাধ্যমে দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত হলে এ ধরনের বিরোধ কমতে পারে।
তাদের দাবি, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের নাগরিকদের সামাজিক, পারিবারিক ও আবাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদক্ষেপ।
সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ কমানোর উদ্যোগ?
বাংলাদেশে জমি, বাড়ি ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে পারিবারিক বিরোধ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে বাবা-মা জীবিত অবস্থায় সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর দখল, বসবাস ও ব্যবহারের অধিকার নিয়ে নানা ধরনের বিরোধ দেখা যায়।
নতুন আইনে দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকারকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা হলে এ ধরনের বিরোধের একটি অংশ কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বাস্তবে এই বিধান কীভাবে প্রয়োগ হবে, দলিলের শর্ত কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং বিরোধের ক্ষেত্রে আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কীভাবে বিষয়টি বিবেচনা করবে—তা আইনটির বাস্তব প্রয়োগের ওপর নির্ভর করবে।
গ্রহীতার ওয়ারিশদের অধিকারও থাকছে
নতুন বিধানে শুধু দাতার স্বার্থই নয়, সম্পত্তির গ্রহীতার মৃত্যুর পর তার ওয়ারিশদের অধিকারও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় গ্রহীতার মৃত্যু হলে দাতা তার জীবনকাল পর্যন্ত সম্পত্তিটি ভোগ করতে পারবেন। তবে গ্রহীতার মৃত্যুর পর আইন অনুযায়ী তার ওয়ারিশদের কাছে সম্পত্তির অধিকার হস্তান্তরের বিষয়টিও বহাল থাকবে।
এতে একদিকে বাবা-মায়ের জীবনকালীন নিরাপত্তা এবং অন্যদিকে গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের আইনগত অধিকার—দুই দিক সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ কী?
সহজভাবে বলতে গেলে, নতুন আইনের মূল সুবিধা হলো—সম্পত্তি দান করলেও দাতা চাইলে জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো বাবা তার বসতবাড়ি সন্তানের নামে দান করলেন। নতুন আইনের আওতায় নির্ধারিত পদ্ধতিতে দান করা হলে বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই বাড়িতে বসবাস ও ভোগ করতে পারবেন। বাবার মৃত্যুর পর সম্পত্তির অধিকার আইন অনুযায়ী পরবর্তী মালিকের কাছে যাবে।
তবে এই বিধানের সুনির্দিষ্ট প্রয়োগের ক্ষেত্রে দলিলের ধরন, দানের শর্ত এবং প্রচলিত অন্যান্য আইন ও উত্তরাধিকার বিধান বিবেচনায় নিতে হবে।
এখন কী হবে?
জাতীয় সংসদে বিলটি পাস হওয়ার পর আইনটি কার্যকর হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এরপর নতুন বিধান অনুযায়ী জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দানের সুযোগ তৈরি হবে।
আইনটি কার্যকর হলে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে বাবা-মা ও অন্যান্য দাতাদের অধিকার সুরক্ষায় এটি একটি নতুন আইনি পথ তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশে সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে মালিকানা হস্তান্তরের পাশাপাশি দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণের একটি স্বতন্ত্র আইনি কাঠামো তৈরি হলো। তবে নতুন বিধানের বাস্তব প্রয়োগ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে এর সমন্বয় ভবিষ্যতে এ আইনের কার্যকারিতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।

