দেশে সড়ক দুর্ঘটনা যেন থামছেই না। গত আগস্ট মাসে সারা দেশে ৫১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮১ জন নিহত এবং ৬৬৪ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। এক মাসে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৭৬ জন, যা সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহতের ৩৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে বেসরকারি সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন (আরএসএফ)। সংগঠনটি জানিয়েছে, ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে আগস্ট মাসের সড়ক দুর্ঘটনার এই পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানি সবচেয়ে বেশি
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, আগস্টে মোট ১৮৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৭৬ জন। মোট সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৩৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
অর্থাৎ, আগস্টে সংঘটিত প্রায় প্রতি তিনটি সড়ক দুর্ঘটনার একটি ছিল মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক। দুর্ঘটনার পাশাপাশি প্রাণহানির হিসাবেও মোটরসাইকেল ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ বাহন।
সংগঠনটির পরিসংখ্যান বলছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে চালক ও আরোহী উভয়েই রয়েছেন। তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, অতিরিক্ত গতি, ট্রাফিক আইন না মানা এবং হেলমেট ব্যবহারে অনীহাকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পথচারী নিহত ১০২ জন
আগস্ট মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ১০২ জন পথচারী নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা মোট সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪৮১ জনের ২১ দশমিক ২০ শতাংশ।
সড়ক পারাপার, ফুটপাতের অভাব, রাস্তার পাশে অনিয়ন্ত্রিতভাবে যানবাহন চলাচল ও পার্কিং এবং পথচারীবান্ধব সড়ক অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে পথচারীদের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া আগস্টে যানবাহনের চালক ও সহকারীসহ মোট ৬৭ জন নিহত হয়েছেন। মোট প্রাণহানির হিসাবে এ শ্রেণির মানুষের মৃত্যুর হার ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ।
কোন যানবাহনে কত প্রাণহানি
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, আগস্টে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীসহ ১৭৬ জন নিহত হয়েছেন। বাসের যাত্রী নিহত হয়েছেন ৩৭ জন।
এ ছাড়া ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, পিকআপ, ট্রাক্টর, লরি ও ড্রাম ট্রাকের আরোহী নিহত হয়েছেন ৫১ জন। মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও জিপের যাত্রী নিহত হয়েছেন ১১ জন।
থ্রি-হুইলার যাত্রী নিহত হয়েছেন ৭৮ জন। স্থানীয়ভাবে তৈরি বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী নিহত হয়েছেন ২১ জন। অন্যদিকে রিকশা ও বাইসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন ৫ জন।
৭৪৯ যানবাহন দুর্ঘটনায় জড়িত
আগস্ট মাসের সড়ক দুর্ঘটনাগুলোতে মোট ৭৪৯টি যানবাহন সম্পৃক্ত ছিল। এর মধ্যে মোটরসাইকেল ছিল ১৯৪টি। এ ছাড়া ১১২টি থ্রি-হুইলার, ১০৮টি ট্রাক এবং ১০৩টি বাস দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।
এ পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, মোটরসাইকেলের পাশাপাশি ভারী যানবাহন ও গণপরিবহনও সড়ক দুর্ঘটনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
নৌ ও রেলপথেও প্রাণহানি
শুধু সড়ক নয়, আগস্টে দেশের নৌ ও রেলপথেও একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে ৭টি নৌ-দুর্ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৯ জন আহত হয়েছেন।
একই সময়ে ৩৪টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত এবং ২৩ জন আহত হয়েছেন।
ফলে সড়ক, নৌ ও রেল—তিন ধরনের পরিবহন ব্যবস্থায়ই দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
অতিরিক্ত গতিই বড় কারণ
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, দেশে অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতিতে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বেপরোয়া ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ি চালানো।
সংগঠনটি দুর্ঘটনার আরও কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ সড়কব্যবস্থা, চালকদের অদক্ষতা, চালকদের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা, অনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা এবং দীর্ঘ সময় বিরতিহীনভাবে গাড়ি চালানো।
এ ছাড়া মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকেও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
দুর্ঘটনা কমাতে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে শুধু চালকদের সচেতন করলেই হবে না; সড়ক অবকাঠামো, যানবাহনের ফিটনেস, চালকদের প্রশিক্ষণ ও কর্মঘণ্টা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগ—সব ক্ষেত্রেই কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।
বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমাতে চালকদের প্রশিক্ষণ, গতিসীমা কার্যকর করা, হেলমেট ব্যবহারে কঠোরতা এবং ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানোরও প্রয়োজন রয়েছে।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি দুর্ঘটনার পর কারণ অনুসন্ধান করে দায় নির্ধারণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গেলে প্রাণহানি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এক মাসে ৫১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮১ জনের প্রাণহানি এবং ৬৬৪ জন আহত হওয়ার এই পরিসংখ্যান আবারও দেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি প্রাণহানি হওয়ায় এ বাহনের নিরাপদ ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ এখন সড়ক নিরাপত্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

