ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

দেশের অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর: স্পিকার হাফিজ উদ্দিন

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬, ১০:৪৫ এএম

দেশের অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর: স্পিকার হাফিজ উদ্দিন

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা ঘুষ ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত এবং তাদের অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনে তীব্র নাভিশ্বাস উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি অভিযোগ করেছেন, বিগত সরকারের আমলে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে যে অনিয়ম ও দুর্নীতির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তার খেসারত এখনো সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা অডিটোরিয়ামে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্পিকার বলেন, প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম, ঘুষ ও দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, সরকারি সেবা এবং দেশের অর্থনীতিতে।

বিগত সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের অভিযোগ

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, দীর্ঘ শাসনামলে দেশের জাতীয় কোষাগার ব্যাপকভাবে লুট করা হয়েছে। বিদেশি সাহায্যের অর্থ থেকে শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ পর্যন্ত চুরি ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তার ভাষ্য, রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির কারণে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব অনিয়মের দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ওপরই গিয়ে পড়ে।

স্পিকার বলেন, দেশের সম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যয় হওয়ার কথা থাকলেও অতীতে ক্ষমতাসীনদের একটি অংশ রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে নিজেদের সম্পদ গড়ে তুলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রিজার্ভ চুরি নিয়েও ক্ষোভ

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির প্রসঙ্গ তুলে স্পিকার বলেন, এ ঘটনায় ফিলিপাইনে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচারিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বাংলাদেশে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রত্যাশিত শাস্তি নিশ্চিত হয়নি।

তিনি বলেন, দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অন্যায় ও অবিচারের শিকার হলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা যথাযথ বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় অর্থ ও সম্পদ আত্মসাতের মতো ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা হিসাব থেকে সাইবার হামলার মাধ্যমে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি হয়ে ফিলিপাইনে চলে যায়। ঘটনাটি বাংলাদেশের আর্থিক খাতের অন্যতম আলোচিত অর্থপাচার ও সাইবার অপরাধের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বিরুদ্ধে সম্পদ পাচারের অভিযোগ

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন স্পিকার। তিনি অভিযোগ করেন, সাবেক সরকারের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের কেউ কেউ দেশের বিপুল সম্পদ বিদেশে পাচার করে সেখানে সম্পদের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।

এ প্রসঙ্গে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের নাম উল্লেখ করেন তিনি। স্পিকারের দাবি, লন্ডনে তার বিপুলসংখ্যক বাড়িসহ দুবাই ও যুক্তরাষ্ট্রে উল্লেখযোগ্য সম্পদ রয়েছে। এসব সম্পদের উৎস নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

তবে এসব সম্পদ ও অর্থের উৎস নিয়ে যে অভিযোগ তিনি করেছেন, সেগুলোকে তিনি রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য বা এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্বাধীন যাচাইয়ের তথ্য বক্তব্যে উপস্থাপন করা হয়নি।

স্পিকার আরও অভিযোগ করেন, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে এখনো আগের সরকারের কিছু দোসর বহাল থাকায় অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির পুরো চিত্র জনগণের সামনে আসছে না।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও সমালোচনা

প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বিগত সরকারের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও নীতিরও সমালোচনা করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

তিনি অভিযোগ করেন, বিগত ১৬-১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার দেশের স্বার্থের চেয়ে ভারতের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তার দাবি, এর ফলে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের আপস করতে হয়েছে।

স্পিকার বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশকে একটি ‘করদ রাজ্য’ হিসেবে দেখতে চায়—এমন অভিযোগও তিনি তুলে ধরেন। তবে এ বক্তব্য তার রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবে এসেছে।

বন্দর ও বাণিজ্যিক সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন

চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম ও ভারতীয় পণ্য পরিবহনের বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্পিকার।

তিনি অভিযোগ করেন, চট্টগ্রাম বন্দরে ভারতীয় জাহাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে এবং বাংলাদেশের জাহাজকে অপেক্ষায় রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে নামমাত্র শুল্কে ভারতীয় পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তার মতে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থ, সমতা ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

সীমান্ত হত্যার তীব্র প্রতিবাদ

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার।

তিনি বলেন, সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ এবং কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে।

স্পিকারের অভিযোগ, ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ অন্যের হাতে তুলে দিয়েছিল।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জবাবদিহির তাগিদ

হাফিজ উদ্দিন আহমদের বক্তব্যে প্রশাসনের দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় অর্থ লুট, বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলা, রিজার্ভ চুরি, সীমান্ত হত্যাসহ বিভিন্ন জাতীয় ইস্যু উঠে আসে।

তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে হলে প্রশাসনের সর্বস্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারে স্বচ্ছতা, সরকারি সেবায় ঘুষ ও হয়রানি বন্ধ এবং জনগণের কাছে প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

রাজনৈতিক বক্তব্যে উঠে এলো জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন

তজুমদ্দিনের মতবিনিময় সভায় দেওয়া বক্তব্যে স্পিকার একদিকে যেমন প্রশাসনের দুর্নীতি ও অতীত সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন, অন্যদিকে জাতীয় সম্পদ রক্ষা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।

তার বক্তব্যের মূল সুর ছিল—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক করা, জনগণের অর্থ ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সার্বভৌম স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।

তবে স্পিকারের উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যই চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!