ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

১০ বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত, আজ কি জমা পড়বে রিজার্ভ চুরি মামলার প্রতিবেদন?

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬, ০৯:৪৭ এএম

১০ বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত, আজ কি জমা পড়বে রিজার্ভ চুরি মামলার প্রতিবেদন?

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) আদালতে দাখিলের কথা রয়েছে। তবে প্রায় এক দশক ধরে তদন্ত চললেও এখনো প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। নির্ধারিত সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় এ পর্যন্ত ৯৭ বার সময় পেয়েছে তদন্ত সংস্থা।

ফলে বহুল আলোচিত এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আজ সত্যিই আদালতে জমা হবে কি না, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এর আগে সর্বশেষ গত ৯ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য থাকলেও সেদিনও তা জমা দিতে পারেনি সিআইডি। পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সেফাতুল্লাহর আদালত নতুন করে ১৪ সেপ্টেম্বর তারিখ নির্ধারণ করেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) রুকনুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

২০১৬ সালে সাইবার হামলায় রিজার্ভ চুরি

২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সাইবার হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি করা হয়। বিশ্বের অন্যতম আলোচিত সাইবার ও ব্যাংকিং জালিয়াতির ঘটনা হিসেবে পরিচিত এই ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন ওঠে।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, দেশের ভেতরের একটি চক্রের সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরি এবং পরে তা বিদেশে পাচার করা হয়েছিল।

ঘটনার পর একই বছরের ১৫ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের তৎকালীন উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা মতিঝিল থানায় মামলা করেন। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে দায়ের করা ওই মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়।

এর পরদিন, ১৬ মার্চ মামলাটির তদন্তভার সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেই থেকে প্রায় এক দশক ধরে মামলাটির তদন্ত করছে সংস্থাটি।

৯৭ বার পেছাল তদন্ত প্রতিবেদন

মামলার তদন্ত দীর্ঘ সময় ধরে চললেও আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্ধারিত তারিখ বারবার পিছিয়েছে। সর্বশেষ গত ৯ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা থাকলেও সিআইডি তা দিতে পারেনি।

ওই দিন শুনানি শেষে আদালত নতুন করে ১৪ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ নির্ধারণ করেন। এর ফলে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা ৯৭তমবারের মতো পিছিয়ে যায়।

আজকের তারিখে প্রতিবেদন দাখিল হলে দীর্ঘদিনের এই অপেক্ষার অবসান ঘটতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

কীভাবে সরানো হয়েছিল ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার?

তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে মোট প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার সরানোর চেষ্টা করা হয়।

এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়েছে—এমন ভুয়া পরিচয়ে মোট ৩৫টি সুইফট বার্তা পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে পাঁচটি অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশনা কার্যকর হয়।

এই পাঁচটি নির্দেশনার মাধ্যমে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের (আরসিবিসি) চারটি হিসাবে পাঠানো হয়। আরও ২ কোটি ডলার পাঠানো হয় শ্রীলঙ্কায়।

তবে শ্রীলঙ্কায় পাঠানো অর্থের লেনদেনে নামের বানান ভুল থাকায় তা আটকে যায়। পরবর্তী সময়ে পুরো ২ কোটি ডলারই বাংলাদেশে ফেরত আসে।

ফিলিপাইনে যাওয়া অর্থের বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি

ফিলিপাইনে পাঠানো ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের বড় অংশ বিভিন্ন ক্যাসিনোর মাধ্যমে দ্রুত সরিয়ে ফেলা হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ফিলিপাইন থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ফলে চুরি যাওয়া অর্থের প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার এখনো উদ্ধারের বাইরে রয়েছে।

অর্থাৎ মামলা ও তদন্তের পাশাপাশি চুরি যাওয়া বিপুল অর্থ ফেরত আনার বিষয়টিও এখনো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

খসড়া অভিযোগপত্র নিয়ে সিআইডির সতর্কতা

রিজার্ভ চুরি মামলার তদন্ত নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে সম্ভাব্য অভিযোগপত্র ও আসামিদের বিষয়ে নানা তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। কয়েকটি প্রতিবেদনে মামলার খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত এবং এতে ৬৪ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করার তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছিল।

তবে চলতি বছরের ১৯ জুন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান এসব তথ্যের বিষয়ে সতর্ক অবস্থান জানান। তিনি বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে রিজার্ভ চুরি মামলার তদন্ত ও খসড়া চার্জশিট নিয়ে প্রকাশিত তথ্যকে সিআইডির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

সিআইডির পক্ষ থেকে বলা হয়, মামলাটি তখনো তদন্তাধীন ছিল এবং তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের পর প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে হালনাগাদ তথ্য জানানো হবে বলেও জানানো হয়েছিল।

অর্থ উদ্ধারে দেশে-বিদেশে আইনি লড়াই

মামলার তদন্ত শেষ না হলেও চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশি-বিদেশি পর্যায়ে আইনি তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

একদিকে ফিলিপাইনের আরসিবিসির সঙ্গে সালিশ প্রক্রিয়া চলছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতেও অর্থ উদ্ধারের জন্য আইনি লড়াই এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।

২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে মামলা করে। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের ২৭ মে নিউইয়র্কের সুপ্রিম কোর্টে আরসিবিসিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করা হয়।

২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্ক সুপ্রিম কোর্ট মামলার তিনটি অভিযোগ—কনভার্সন, কনভার্সনে সহায়তা এবং কনভার্সনের ষড়যন্ত্র—খারিজ করে। তবে মামলার অন্যান্য অভিযোগ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে।

২০২৫ সালে ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার বাজেয়াপ্তের আদেশ

অর্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টায় ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার একটি সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত ফিলিপাইনের আরসিবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার বাজেয়াপ্তের আদেশ দেন।

সিআইডির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় আদালত এ আদেশ দেন বলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।

সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, আদালতের আদেশের অনুলিপি ফিলিপাইনে আরসিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়। বাজেয়াপ্ত অর্থ বাংলাদেশ সরকারের কোষাগারে ফেরত আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও আদালতের নির্দেশনায় ছিল।

তদন্তে আরসিবিসির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লরেঞ্জো টান, জুপিটার শাখার ব্যবস্থাপক মায়া সান্তোস দেগুইতোসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে সিআইডি বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছে।

ফিলিপাইনের ব্যাংক ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা

সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে অর্থ স্থানান্তর বন্ধ করার বার্তা পাঠানো হলেও ফিলিপাইনের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখায় অর্থ বিতরণের প্রক্রিয়া থামানো হয়নি। এ ঘটনায় আরসিবিসির কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ফিলিপাইনের আদালতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দণ্ডিত হওয়ার তথ্যও সিআইডির পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরসিবিসিকে বড় অঙ্কের জরিমানাও করেছিল।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আরসিবিসি বাংলাদেশ ব্যাংককে ৬৮ হাজার ডলার ফেরত দিয়েছিল। তদন্তে আরসিবিসিকে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় অর্থ পাচারের ঘটনায় দায়ী করা হয়েছে বলেও সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনেই মিলতে পারে অনেক প্রশ্নের উত্তর

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় এত বছর ধরে তদন্ত চললেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আদালতে দাখিল না হওয়ায় ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে চূড়ান্ত আইনি অবস্থান স্পষ্ট হয়নি।

আজ প্রতিবেদন দাখিল হলে চুরি কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিল, দেশের ভেতরে কোনো ব্যক্তি বা চক্রের সহায়তা ছিল কি না এবং অর্থ স্থানান্তর ও পাচারের পুরো প্রক্রিয়ায় কার ভূমিকা ছিল—এসব বিষয়ে সিআইডির অনুসন্ধানের ফল আদালতের সামনে আসতে পারে।

তবে প্রতিবেদন দাখিলের আগ পর্যন্ত তদন্তে কী তথ্য পাওয়া গেছে বা কাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ আনা হচ্ছে, সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়। কারণ সিআইডি এর আগে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সম্ভাব্য খসড়া অভিযোগপত্রের তথ্যকে তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয় বলে জানিয়েছে।

এক দশক পরও শেষ হয়নি রিজার্ভ চুরির অধ্যায়

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি শুধু দেশের আর্থিক খাতের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির ঘটনা নয়; এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সাইবার নিরাপত্তা, সুইফট ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃদেশীয় অর্থপাচার প্রতিরোধের দুর্বলতাও সামনে আসে।

ঘটনার প্রায় এক দশক পরও দেশে দায়ের করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল না হওয়া এবং চুরি যাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ উদ্ধার না হওয়া—দুই বিষয়ই আলোচনায় রয়েছে।

এখন নজর আজকের আদালতের দিকে। ৯৭ বার সময় নেওয়ার পর এবার সিআইডি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারে কি না, সেটিই রিজার্ভ চুরি মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠেছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!