দেশের ৬৮টি কারাগারে বন্দি ধারণের সক্ষমতা প্রায় ৪৫ হাজার। অথচ সর্বশেষ ৮ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী এসব কারাগারে বন্দির সংখ্যা প্রায় এক লাখ। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দি নিয়ে চলছে দেশের কারা ব্যবস্থা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ ও জরুরি পরিবহনের সংকট। ৬৮টি কারাগারের বিপরীতে কারা অধিদফতরের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ২৩টি।
ফলে কারাগারের ভেতরে কোনো বন্দির হঠাৎ বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, স্ট্রোকের উপসর্গ কিংবা অন্য কোনো গুরুতর শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। চিকিৎসক দেখানো, কারা হাসপাতাল থেকে রেফার করা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা, অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা এবং শেষ পর্যন্ত বাইরের হাসপাতালে পৌঁছানো—প্রতিটি ধাপেই সময় লাগছে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে চিকিৎসার এই বিলম্ব অনেক সময় জীবন রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ‘গোল্ডেন টাইম’ কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে রাতে চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বন্দিমৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ
কারাগারের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বন্দিমৃত্যুর পরিসংখ্যানও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বেসরকারি সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের কারাগারগুলোতে ৯৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৬১ জন।
অর্থাৎ আসকের হিসাবে, এক বছরের ব্যবধানে প্রথম আট মাসেই বন্দিমৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে কারাগারে ৭৩ জন বন্দি মারা গেছেন। সংগঠনটির এই পরিসংখ্যান দেশের কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে সংগৃহীত।
তবে কারা অধিদফতরের হিসাবের পরিধি আরও বড়। অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৩৯০ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৩০০ বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও কারাগারে বন্দিমৃত্যুর বিষয়টি যে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মতৈক্য রয়েছে।
৬৮ কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স মাত্র ২৩টি
দেশে বর্তমানে কারাগার রয়েছে ৬৮টি। অথচ এসব কারাগারের জন্য কারা অধিদফতরের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ২৩টি। অর্থাৎ প্রতিটি কারাগারের জন্য পৃথক জরুরি রোগী পরিবহন ব্যবস্থা নেই।
কারা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুরুতর অসুস্থ বন্দিকে কারাগারের বাইরে বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানোর সময়ই এই সংকট সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়। কোনো কারাগারে নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স না থাকলে বিকল্প যানবাহনের ব্যবস্থা করতে হয়। একই সঙ্গে বন্দির নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হয়। এসব প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষ করে হৃদরোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো আকস্মিক জটিলতার ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের বিলম্বও রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটাতে পারে।
তবে এই সংকট কাটাতে নতুন অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।
ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল বলেন, বর্তমানে কারা অধিদফতরের ২৩টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতির পর আরও ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কিছু পর্যবেক্ষণ নিষ্পত্তি হলে অনুমোদনের পর ক্রয় প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে। নতুন অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া গেলে জরুরি রোগী পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের উন্নতি হবে বলে আশা করছে কারা কর্তৃপক্ষ।
চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ১৫১, নিয়মিত আছেন মাত্র ১০ জন
কারাগারের স্বাস্থ্যসেবার আরেকটি বড় দুর্বলতা চিকিৎসক সংকট। কারা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৮টি কারাগারের জন্য চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৫১টি। কিন্তু নিয়মিত চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত আছেন মাত্র ১০ জন।
অর্থাৎ অনুমোদিত পদের তুলনায় নিয়মিত চিকিৎসকের উপস্থিতি অত্যন্ত কম। বিপুলসংখ্যক বন্দির বিপরীতে চিকিৎসক স্বল্পতার কারণে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ডিপ্লোমা নার্সের সংকটও দীর্ঘদিনের। বন্দির সংখ্যা যখন ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি, তখন সীমিত চিকিৎসক ও নার্স দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ভারপ্রাপ্ত আইজি প্রিজন্স কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল চিকিৎসক ও নার্স সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, বাস্তব সীমাবদ্ধতার মধ্যেই কারা কর্তৃপক্ষকে কাজ করতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সংকট কাটানোর চেষ্টা চলছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, চিকিৎসক নিয়োগ ও পদায়নের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন হওয়ায় এ ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়।
৫৫ ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ
নার্স সংকট কিছুটা কমাতে সম্প্রতি সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে কারা অধিদফতরে ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত আইজি প্রিজন্স।
নিয়োগ-সংক্রান্ত বাকি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এসব নার্স বন্দিদের চিকিৎসাসেবায় যুক্ত হবেন। এতে কারা হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর জনবল সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
রাতে জরুরি চিকিৎসায় সংকট বেশি
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কারাগারে চিকিৎসক সংকট নতুন কোনো সমস্যা নয়। তবে রাতের বেলায় জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, কোনো বন্দি রাতে গুরুতর অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেওয়া এবং প্রয়োজনে বাইরের হাসপাতালে স্থানান্তর করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স সংকট যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
তিনি কারাগারে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতির অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেন। পাশাপাশি গ্রেপ্তারের আগে বা গ্রেপ্তারের সময় শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের কারাগারে পাঠানোর পর যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।
নূর খান লিটনের মতে, কারাগারে অসুস্থ বন্দিদের রাখার জায়গাও সীমিত। একই সঙ্গে কারা চিকিৎসাকেন্দ্রের সুবিধা ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে প্রকৃত অসুস্থ বন্দিরা চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে বঞ্চিত হতে পারেন।
তার মতে, কারাবিধি সংস্কার, কারা হাসপাতালের আধুনিকায়ন, রাতের জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং গুরুতর রোগীকে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া সমস্যার মৌলিক সমাধান সম্ভব নয়।
ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি
কারাগারের চিকিৎসা সংকটের সঙ্গে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি যুক্ত হয়েছে, তা হলো অতিরিক্ত বন্দির চাপ।
কারা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, দেশের কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৫ হাজার। বিপরীতে বর্তমানে বন্দির সংখ্যা প্রায় এক লাখ।
ভারপ্রাপ্ত আইজি প্রিজন্স বলেন, ৪৫ হাজার বন্দি রাখার সক্ষমতার জায়গায় প্রায় এক লাখ বন্দি থাকলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনিক ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হয়।
অতিরিক্ত বন্দির কারণে শুধু চিকিৎসা নয়, আবাসন, খাবার, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, বায়ু চলাচল ও নিরাপত্তা—প্রতিটি ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত মানুষ একই পরিবেশে থাকলে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে হৃদরোগ, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত বন্দিদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
বন্দিমৃত্যুর পেছনে একাধিক কারণ
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির মানবাধিকারকর্মী ইজাজুল ইসলামের মতে, বন্দিমৃত্যুর পেছনে একক কোনো কারণ নয়; পরস্পর সম্পর্কযুক্ত একাধিক বিষয় কাজ করতে পারে।
তিনি অসুস্থ বন্দিকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠাতে না পারা, হৃদরোগ, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত বন্দি, চিকিৎসক ও নার্স সংকট, ওষুধের ঘাটতি, মানসিক চাপ এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে না পারাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।
এর পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন এবং পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের বিষয়গুলোকেও বন্দিদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
ইজাজুল ইসলামের মতে, কারাগারে থাকা ব্যক্তির স্বাধীনতা সীমিত হলেও তার জীবন, মর্যাদা ও স্বাস্থ্যসেবার অধিকার অক্ষুণ্ন থাকে। বিশেষ করে বিচারাধীন বা হাজতি বন্দির মৃত্যুর ঘটনা আরও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন, কারণ বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত একজন হাজতি আইনের চোখে দোষী সাব্যস্ত নন।
প্রবেশের সময় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবার দাবি
মানবাধিকারকর্মীরা কারাগারে প্রবেশের সময় প্রত্যেক বন্দির পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পরবর্তী সময়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং চালুর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তাদের মতে, বন্দিদের জন্য ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসা, পর্যাপ্ত চিকিৎসক-নার্স, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অ্যাম্বুলেন্স নিশ্চিত করা জরুরি। গুরুতর অসুস্থ বন্দিকে দ্রুত বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালে নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।
এ ছাড়া প্রতিটি বন্দিমৃত্যুর কারণ স্বাধীন ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত এবং কারাগারে স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ও মৃত্যুর তথ্য নিয়মিত প্রকাশের দাবিও রয়েছে।
৪৫ বছর বা তার বেশি বয়সী বন্দি প্রায় অর্ধেক
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কারাগারে থাকা বন্দিদের প্রায় ৫০ শতাংশের বয়স ৪৫ বছর বা তার বেশি।
ভারপ্রাপ্ত আইজি প্রিজন্সের মতে, এ বয়সে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। কারাগারের সীমিত পরিবেশ ও মানসিক চাপ এসব ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।
তিনি বলেন, কারাগারে থাকা ব্যক্তিরা বদ্ধ পরিবেশে থাকেন এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ সীমিত। এর সঙ্গে মানসিক চাপ যুক্ত হওয়ায় বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
প্রায় ৩০ শতাংশ বন্দি মাদকসংশ্লিষ্ট
কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কারাগারে থাকা বন্দিদের প্রায় ৩০ শতাংশ মাদকাসক্ত অথবা মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধের সঙ্গে যুক্ত।
মাদকাসক্ত বন্দিদের ক্ষেত্রে সাধারণ শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি আসক্তি নিরাময়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও পুনর্বাসনমূলক সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু কারাগারের সীমিত স্বাস্থ্য অবকাঠামোর কারণে এ ধরনের সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করাও একটি চ্যালেঞ্জ।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, সীমিত সক্ষমতার মধ্যেও অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজন হলে বন্দিদের কারাগারের বাইরে সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ভারপ্রাপ্ত আইজি প্রিজন্স কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামালের ভাষ্য, কারাগারে এক লাখের বেশি বন্দির বিপরীতে মৃত্যুর সংখ্যা শুধু মোট সংখ্যা দিয়ে মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। তবে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুই কারা কর্তৃপক্ষের কাছে উদ্বেগের বিষয়।
তিনি জানান, চিকিৎসক ও নার্স সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি নতুন ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের উদ্যোগ এবং ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগের মাধ্যমে জরুরি ও নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় উন্নতি আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
সব মিলিয়ে দেশের কারাগারগুলোর স্বাস্থ্যসেবায় একসঙ্গে কয়েকটি সমস্যা কাজ করছে—ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দি, চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি, সীমিত অ্যাম্বুলেন্স, রাতের জরুরি চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘমেয়াদি রোগের চাপ এবং কারা হাসপাতালের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা।
কারা কর্তৃপক্ষের নতুন অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহ ও নার্স নিয়োগের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে মানবাধিকারকর্মীদের মতে, বন্দিমৃত্যু কমাতে শুধু পরিবহন ব্যবস্থা বাড়ালেই হবে না; কারাগারে প্রবেশের সময় স্বাস্থ্য পরীক্ষা থেকে শুরু করে নিয়মিত স্ক্রিনিং, ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা, পর্যাপ্ত ওষুধ, বিশেষায়িত চিকিৎসা এবং প্রতিটি মৃত্যুর স্বচ্ছ তদন্ত—পুরো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকেই শক্তিশালী করতে হবে।

