ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

তিন বছরের অপেক্ষার অবসান, দেশে আসছে ৮ ডিজিটাল ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৬, ০৯:৪৮ এএম

তিন বছরের অপেক্ষার অবসান, দেশে আসছে ৮ ডিজিটাল ব্যাংক

ছবিঃ সংগৃহীত

তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে নানা জটিলতা, নীতিমালা পরিবর্তন ও যাচাই-বাছাইয়ের পর অবশেষে বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর পথ আবারও খুলছে। দ্বিতীয় দফায় আবেদন করা ১২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮টি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে বাছাই করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী পর্ষদ সভায় এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে প্রচলিত ব্যাংকের মতো গ্রাহকদের ব্যাংক শাখা, উপশাখা কিংবা নিজস্ব এটিএমে যেতে হবে না। মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল অ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসেই ব্যাংক হিসাব খোলা, অর্থ জমা, টাকা স্থানান্তর, বিল পরিশোধ, লেনদেন এবং ঋণের আবেদনসহ বিভিন্ন সেবা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এর ফলে ব্যাংকিং সেবার ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দেশের ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠী, তরুণ উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

পর্ষদ সভায় উঠছে ৮ প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান আজকের পত্রিকাকে জানিয়েছেন, দ্বিতীয় দফায় জমা পড়া আবেদনগুলোর মধ্যে ৮টি প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী পর্ষদ সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে এবং সেখানেই চূড়ান্ত লাইসেন্স অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে দ্বিতীয় দফার আবেদনকারীদের মধ্যে ঠিক কোন আটটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রগুলো এখনো প্রকাশ করেনি।

আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে মূলধনের সক্ষমতা, উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত শর্ত পূরণের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হয়েছে।

কীভাবে কাজ করবে ডিজিটাল ব্যাংক?

ডিজিটাল ব্যাংকের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হবে—এর কার্যক্রম হবে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর। প্রচলিত ব্যাংকের মতো গ্রাহকসেবার জন্য বড় শাখা নেটওয়ার্ক, উপশাখা কিংবা নিজস্ব এটিএম স্থাপনের প্রয়োজন হবে না।

মোবাইল অ্যাপ ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গ্রাহকরা বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা নিতে পারবেন। সম্ভাব্য সেবার মধ্যে থাকবে—

ডিজিটালভাবে ব্যাংক হিসাব খোলা
টাকা জমা ও উত্তোলনের সুবিধা
অর্থ স্থানান্তর ও বিল পরিশোধ
ডিজিটাল ঋণের আবেদন
ভার্চুয়াল কার্ড
কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন
মোবাইল ও অনলাইন ব্যাংকিং সেবা

ফলে একজন গ্রাহক ঘরে বসেই প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

২০২৩ সালে শুরু হয়েছিল উদ্যোগ

বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ শুরু হয় ২০২৩ সালে। ওই বছরের ১৪ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের নীতিমালা জারি করে।

প্রাথমিক নীতিমালা অনুযায়ী একটি ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২৫ কোটি টাকা। প্রথম দফায় মোট ৫২টি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করে।

যাচাই-বাছাই শেষে ৯টি প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদে উপস্থাপন করা হয়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় আগ্রহপত্রও।

এর মধ্যে নগদ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি ২০২৪ সালের জুনে চূড়ান্ত লাইসেন্স পেয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে নগদকে ঘিরে আর্থিক অনিয়ম ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠার পর ওই লাইসেন্স স্থগিত করা হয়। ফলে প্রথম দফায় ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ কার্যত থমকে যায়।

১২৫ কোটি থেকে মূলধন ৩০০ কোটি

পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে বাংলাদেশ ব্যাংক।

২০২৫ সালের ২১ আগস্ট সংশোধিত নীতিমালায় ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ১২৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করা হয়।

এর কয়েক দিন পর, ২৬ আগস্ট, দ্বিতীয় দফায় ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্য নতুন করে আবেদন আহ্বান করা হয়। এতে মোট ১২টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে।

দ্বিতীয় দফার এই আবেদনগুলোর দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে এখন আটটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বিবেচনা করা হচ্ছে।

যেসব খাতের প্রতিষ্ঠান আগ্রহী

ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স পেতে দ্বিতীয় দফায় বিভিন্ন খাতের দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা আগ্রহ দেখিয়েছে। আবেদনকারীদের মধ্যে মোবাইল আর্থিক সেবা, টেলিযোগাযোগ, প্রযুক্তি, ক্ষুদ্রঋণ ও শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।

আবেদনকারীদের তালিকায় ছিল রবি আজিয়াটার ‘বুস্ট’, বাংলালিংক ও স্কয়ারের যৌথ উদ্যোগ ‘নোভা ডিজিটাল ব্যাংক’, আকিজ রিসোর্সের ‘মুনাফা ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংক’, আশার ‘মৈত্রী ডিজিটাল ব্যাংক’, ‘আমার ডিজিটাল ব্যাংক-২২’, ‘৩৬ ডিজিটাল ব্যাংক’, ব্রিটিশ-বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক, ভুটানের ডিকে ব্যাংকের ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান, অ্যাপ ব্যাংক, জাপান বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক, উপকারী ডিজিটাল ব্যাংক ও বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক।

তবে এসব আবেদনকারীর মধ্য থেকে কোন আটটি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত লাইসেন্সের জন্য নির্বাচিত হয়েছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সভার সিদ্ধান্তের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।

বিকাশকে ঘিরে বিতর্কও তৈরি হয়েছিল

দ্বিতীয় দফার আবেদন প্রক্রিয়ার মধ্যে বিকাশকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে, নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের এক দিন আগে তৎকালীন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জরুরি পর্ষদ সভা ডাকার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের নেতারা স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং সভা স্থগিতের দাবি জানান।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।

নতুন গভর্নরের সময়ে গতি

নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিজিটাল ব্যাংকের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কথা জানান। এরপর দ্বিতীয় দফায় জমা পড়া আবেদনগুলোর মূল্যায়ন ও যাচাই-বাছাই শেষ করার প্রক্রিয়া জোরদার করা হয়।

এখন আটটি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদে উঠতে যাচ্ছে। পর্ষদের সিদ্ধান্তের পরই দেশে নতুন ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক যাত্রা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

কম খরচে ব্যাংকিং সেবার সম্ভাবনা

ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অভিজ্ঞ ব্যাংকার মো. আরফান আলী মনে করেন, ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে কম খরচে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

তার মতে, তরুণ প্রজন্মকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তিও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে নতুন ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হলে প্রচলিত ব্যাংকগুলোও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ও ব্যবসায়িক মডেল আধুনিক করতে উৎসাহিত হবে।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়

ডিজিটাল ব্যাংকের সম্ভাবনার পাশাপাশি বেশ কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে সাইবার নিরাপত্তা, গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ডিজিটাল অবকাঠামো।

ডিজিটাল ব্যাংককে শুরু থেকেই শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। গ্রাহকের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া তরুণ ও নতুন গ্রাহকদের বড় আমানত না থাকায় শুরুতে তহবিল সংগ্রহও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে গ্রাহকদের সচেতনতার ঘাটতি এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাও ডিজিটাল ব্যাংকের সম্প্রসারণে বাধা তৈরি করতে পারে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে নতুন দিগন্ত

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিকভাবে পরিচালিত হলে ডিজিটাল ব্যাংক বাংলাদেশের আর্থিক খাতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে যেসব মানুষ প্রচলিত ব্যাংকের শাখা থেকে দূরে থাকেন, তাদের জন্য মোবাইলভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

তরুণ উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার এবং ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে সহজে আর্থিক সেবার আওতায় আনার ক্ষেত্রে ডিজিটাল ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সুশাসন, গ্রাহক সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর তদারকিও প্রয়োজন হবে।

সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সভার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পর দেশে নতুন করে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!