ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

চার আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘অকার্যকর’ ঘোষণা, প্রশাসক নিয়োগ বাংলাদেশ ব্যাংকের

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: আগস্ট ১০, ২০২৬, ১১:২১ এএম

চার আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘অকার্যকর’ ঘোষণা, প্রশাসক নিয়োগ বাংলাদেশ ব্যাংকের

ছবিঃ সংগৃহীত

আর্থিক খাতে সুশাসন, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সংকটে থাকা চারটি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে (NBFI) ‘অকার্যকর’ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় এনে প্রশাসক ও সহ-প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

রোববার (৯ আগস্ট) রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এ তথ্য জানায়।

অকার্যকর ঘোষণা করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—আভিভা ফাইন্যান্স লিমিটেড, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তকে দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের পুনর্গঠন ও শৃঙ্খলা ফেরানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে বিপুল খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতার কারণে যেসব প্রতিষ্ঠান কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেগুলোকে ধাপে ধাপে রেজল্যুশনের আওতায় আনার অংশ হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

কেন অকার্যকর ঘোষণা

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা এবং আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারদের স্বার্থ বিবেচনা করে অকার্যকর ঘোষণা ও রেজল্যুশন প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকটের পেছনে বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতি, উচ্চমাত্রার শ্রেণিকৃত ঋণ ও বিনিয়োগ, তারল্য সংকট, আয়ক্ষমতার অবনতি এবং দায় পরিশোধে অক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অর্থাৎ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার পর্যাপ্ত সক্ষমতা তৈরি না হওয়ায় স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি তদারকিতে রেজল্যুশন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

চার প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের চিত্র ভয়াবহ

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে অকার্যকর ঘোষণা করা চার প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ছিল অত্যন্ত উচ্চ।

এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট: ৯৯.৯৯ শতাংশ
ইন্টারন্যাশনাল লিজিং: ৯৯.৪৪ শতাংশ
ফারইস্ট ফাইন্যান্স: ৯৮.৫০ শতাংশ
আভিভা ফাইন্যান্স: ৯৩.৯৩ শতাংশ

খেলাপি ঋণের এমন উচ্চ হার প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দুর্বলতার গভীরতা স্পষ্ট করে। ঋণের বড় অংশ নিয়মিতভাবে আদায় না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ক্ষমতা কমেছে, তারল্য সংকট তৈরি হয়েছে এবং আমানতকারীসহ বিভিন্ন পাওনাদারের দায় পরিশোধের সক্ষমতাও দুর্বল হয়েছে।

প্রশাসক দিয়ে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ

রেজল্যুশন কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের প্রশাসক ও সহ-প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগ পাওয়া প্রশাসকরা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসন, সার্বিক ব্যবস্থাপনা, সম্পদ ও দায়ের অবস্থা পর্যালোচনা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করবেন।

এর ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনার ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ, দায়, ঋণ আদায় এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, তা মূল্যায়ন করা হবে।

২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানই সমস্যাগ্রস্ত

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৩৫টি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠানকে সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সংকটে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা খেলাপি, যা মোট ঋণের ৮৩.১৬ শতাংশ।

অন্যদিকে এসব ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পদের মূল্য মাত্র ৬ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ২৬ শতাংশ। ফলে ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের সামনে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।

এর বিপরীতে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা ১৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৭ শতাংশ। ২০২৪ সালে এসব প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে ১ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। একই সময়ে তাদের মূলধন উদ্বৃত্ত ছিল ৬ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা।

আমানতকারীদের অর্থ নিয়ে বড় উদ্বেগ

সংকটে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দুর্বলতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে আমানতকারী ও অন্যান্য পাওনাদারদের ওপর।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, এসব সমস্যাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক মিলিয়ে মোট ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকার আমানত রয়েছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র বা সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আমানত ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।

ব্যক্তি আমানতকারীদের সবচেয়ে বেশি অর্থ আটকে রয়েছে পিপলস লিজিংয়ে—প্রায় ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। এছাড়া আভিভা ফাইন্যান্সে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি এবং প্রাইম ফাইন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা সাধারণ আমানতকারীদের আটকে রয়েছে।

ফলে চার প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করে রেজল্যুশনে নেওয়ার বিষয়টি শুধু আর্থিক খাতের পুনর্গঠনের সঙ্গে নয়, হাজারো আমানতকারীর অর্থ ফেরত পাওয়ার প্রশ্নের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

আগেও ৯ প্রতিষ্ঠানকে ‘অপরিচালনযোগ্য’ চিহ্নিত

উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি এবং আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থতার কারণে এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ‘অপরিচালনযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

ওই তালিকায় রয়েছে—পিপলস লিজিং, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স এবং প্রাইম ফাইন্যান্সসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।

নতুন চার প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর ঘোষণা করায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন বা প্রয়োজনে রেজল্যুশনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া আরও বিস্তৃত হলো।

পুরো আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতেই বাড়ছে খেলাপি ঋণের চাপ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন শেষে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। এটি খাতটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৫.৭২ শতাংশ।

অর্থাৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে বিতরণ করা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৬ টাকাই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এতে একদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় ও তারল্য সংকট বাড়ছে, অন্যদিকে নতুন ঋণ বিতরণ এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতাও চাপে পড়ছে।

আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, রেজল্যুশনের মূল উদ্দেশ্য হলো আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং আমানতকারী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর স্বার্থ সুরক্ষা।

তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল খেলাপি ঋণ, সীমিত সম্পদ এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতার কারণে রেজল্যুশন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রশাসক নিয়োগ করলেই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রকৃত ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, অনিয়মের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ সুরক্ষা এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, রেজল্যুশন কার্যক্রমের মাধ্যমে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থার পুনর্মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় পুনর্গঠন এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর অগ্রগতি হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংকটে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাও এ উদ্যোগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!