ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

বাজারে দামের দাপট, আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম ভোক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ১১:০৯ এএম

বাজারে দামের দাপট, আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম ভোক্তারা

ছবিঃ সংগৃহীত

নিত্যপণ্যের বাজারে দীর্ঘদিনের অস্বস্তি কাটতে না কাটতেই ফের কিছু পণ্যের দাম বাড়ায় ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একদিকে মাছের বাজারে ইলিশসহ বিভিন্ন মাছের দাম চড়া, অন্যদিকে সবজির বাজারেও সপ্তাহের ব্যবধানে কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের সংসার চালাতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

বাজারের সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো পণ্যের সরবরাহ বাড়ায় দাম কিছুটা কমেছে। তবে একদিকে দাম কমছে, অন্যদিকে কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়ছে—এমন পরিস্থিতিতে স্বস্তি ফিরছে না বাজারে। ক্রেতাদের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দামই এখন আগের তুলনায় বেশি হওয়ায় সামান্য দাম বাড়লেও তা সরাসরি সংসারের ব্যয়ে প্রভাব ফেলছে।

ইলিশের দাম বাড়ছে দ্রুত

মাছের বাজারে সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি তৈরি করেছে ইলিশের দাম। নদীতে মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় দুই-তিন দিনের ব্যবধানে ইলিশের দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

বর্ষা মৌসুমে ইলিশের সরবরাহ বাড়লে সাধারণত বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নদীতে প্রত্যাশিত পরিমাণ মাছ ধরা না পড়ায় সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।

ইলিশের পাশাপাশি অন্যান্য মাছের বাজারেও স্বস্তি পুরোপুরি ফেরেনি। নদীর কিছু মাছের দাম তুলনামূলকভাবে কমলেও সেগুলোর অধিকাংশই নিম্ন ও স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।

চাষের মাছেও বাড়তি দাম

নদীর মাছের পাশাপাশি চাষের মাছের বাজারেও দামের ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। রুই, কাতলা, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন চাষের মাছের দাম কেজিতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ক্রেতাদের প্রশ্ন, এসব মাছের উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও দাম কেন বাড়ছে। বিক্রেতারা অবশ্য পরিবহন ব্যয়, পাইকারি বাজারের দাম এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক খরচ বৃদ্ধিকে দামের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।

তবে ভোক্তাদের কাছে এসব ব্যাখ্যার চেয়ে বাজারে কম দামে পণ্য পাওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে মাছের বাজারে দাম বাড়ায় অনেক পরিবার আগের তুলনায় মাছ কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।

সবজির বাজারেও ফের বাড়ছে দাম

সাম্প্রতিক বন্যার প্রভাব কাটিয়ে সবজির সরবরাহ বাড়ায় কিছুদিন বাজারে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে শিম, বরবটি ও বেগুনের দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে এসব সবজি কিনতেও বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।

তবে সব সবজির দাম বাড়েনি। বাজারে সরবরাহ বাড়ায় পটল, ঢেঁড়স ও কাঁচা মরিচের দাম কিছুটা কমেছে। এতে কয়েকটি পণ্যে ক্রেতারা সামান্য স্বস্তি পেলেও অন্যান্য সবজির বাড়তি দাম সেই সুবিধাকে অনেকটাই ম্লান করে দিচ্ছে।

কেন বাড়ছে সবজির দাম?

বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবজির দাম মূলত সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। বন্যা, অতিবৃষ্টি বা পরিবহন সমস্যার কারণে কোনো এলাকায় উৎপাদন ব্যাহত হলে বাজারে সরবরাহ কমে যায়। তখন স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়।

আবার কোনো নির্দিষ্ট সবজির সরবরাহ বাড়লে তার দাম কমে যায়। বর্তমানে বাজারে পটল, ঢেঁড়স ও কাঁচা মরিচের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে শিম, বরবটি ও বেগুনের সরবরাহ তুলনামূলক কমে যাওয়ায় এসব পণ্যের দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

ক্রেতার আয় বাড়েনি, বাড়ছে বাজার খরচ

নিত্যপণ্যের বাজারে দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। আয় একই থাকলেও মাছ, সবজি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

একজন ক্রেতার জন্য একটি পণ্যের দাম ১০-২০ টাকা বাড়া হয়তো বড় মনে নাও হতে পারে। কিন্তু প্রতিদিনের বাজারে একাধিক পণ্যের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে মাস শেষে পরিবারের মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।

ফলে অনেক পরিবার এখন প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা ছোট করছে। কেউ মাছ বা মাংসের পরিমাণ কমাচ্ছেন, কেউ তুলনামূলক সস্তা সবজি বেছে নিচ্ছেন। এতে খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আসছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যুৎ সংকটে বেচাকেনাতেও প্রভাব

বিক্রেতাদের মতে, বাজারে পণ্যের দাম বাড়লেও বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে বেচাকেনা আগের তুলনায় কমেছে। ক্রেতাদের অনেকেই প্রয়োজনের বাইরে বাজার করছেন না। ফলে দোকান ও বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি থাকলেও কেনাকাটার পরিমাণ কমে গেছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাধারণ মানুষের হাতে খরচ করার মতো অর্থ কমে গেলে বাজারে পণ্যের চাহিদাও কমে যায়। এতে একদিকে ক্রেতারা বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হন, অন্যদিকে বিক্রেতারাও কম বিক্রির কারণে চাপে পড়েন।

এক পণ্যে স্বস্তি, অন্য পণ্যে অস্বস্তি

বর্তমান বাজার পরিস্থিতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—সব পণ্যের দাম একই দিকে যাচ্ছে না। কোনো পণ্যের সরবরাহ বাড়ায় দাম কমছে, আবার অন্য পণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বাড়ছে।

ফলে সামগ্রিক বাজারদর কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও ভোক্তার দৈনন্দিন বাজার খরচে স্বস্তি আসছে না। বিশেষ করে মাছ ও সবজির মতো নিয়মিত প্রয়োজনীয় পণ্যের দামে ওঠানামা সাধারণ মানুষের বাজেটকে অনিশ্চিত করে তুলছে।

বাজারে নজরদারি বাড়ানোর দাবি

ক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ ও উৎপাদনের প্রকৃত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজারদর নির্ধারণ এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে বাজার মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন।

তাদের মতে, উৎপাদক থেকে পাইকার এবং পাইকার থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত কোথায় অতিরিক্ত মূল্য যোগ হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা দরকার। একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা গেলে হঠাৎ করে কোনো পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রবণতাও কমানো সম্ভব।

সব মিলিয়ে, নিত্যপণ্যের বাজারে দীর্ঘদিনের উচ্চমূল্যের মধ্যে মাছ ও কয়েক ধরনের সবজির নতুন করে দাম বাড়া সাধারণ মানুষের জন্য নতুন অস্বস্তি তৈরি করেছে। সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, বাজার ব্যবস্থাপনায় নজরদারি বাড়ানো এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো না গেলে এই চাপ আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!