ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

গ্যাস সংকটে নিটওয়্যার শিল্প, নিট ফেব্রিক্স আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ০৫:৫৭ পিএম

গ্যাস সংকটে নিটওয়্যার শিল্প, নিট ফেব্রিক্স আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ

ছবিঃ সংগৃহীত

তীব্র গ্যাস সংকটে দেশের রফতানিমুখী নিটওয়্যার শিল্পের উৎপাদন যখন ক্রমেই ব্যাহত হচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে নতুন আমদানি নীতিতে নিট ফেব্রিক্স আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। রফতানি আদেশ সময়মতো পূরণ করতে যেখানে অনেক কারখানাকে বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় ফেব্রিক্স সংগ্রহ করতে হচ্ছে, সেখানে নতুন নীতির কারণে সেই আমদানিও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

রফতানিমুখী নিটওয়্যার শিল্পের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) বলছে, বর্তমান বাস্তবতায় নিট ফেব্রিক্স আমদানির সুযোগ সীমিত বা বন্ধ করা হলে শুধু কারখানার উৎপাদনই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না; নির্ধারিত সময়ে রফতানি আদেশ পূরণ, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এ কারণে আমদানি নীতি ২০২৬-২০২৯-এর ধারা ২৫-এর উপধারা ১২-তে থাকা ‘নিট ফেব্রিক্স আমদানি যোগ্য হবে না’—এই বিধান স্থগিত অথবা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বাণিজ্যমন্ত্রীকে দেওয়া এক চিঠিতে এ দাবি জানান বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

গ্যাস সংকটে ব্যাহত নিটওয়্যার উৎপাদন

নিটওয়্যার শিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে ফেব্রিক্স তৈরি, ডাইং, ওয়াশিং ও বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাতকরণে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোথাও উৎপাদন কমাতে হচ্ছে, আবার কোথাও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখতে গিয়ে বাড়ছে ব্যয়।

এর ফলে দেশের অভ্যন্তরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ফেব্রিক্স উৎপাদন ও সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দেওয়া রফতানি আদেশের নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলতে হয় কারখানাগুলোকে। ফলে দেশীয় উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিলে বিকল্প হিসেবে বিদেশ থেকে ফেব্রিক্স আমদানি করতে হয় অনেক প্রতিষ্ঠানকে।

বিকেএমইএর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় ফেব্রিক্স আমদানির সুযোগ থাকাটা রফতানি শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী সব ফেব্রিক্স দেশে পাওয়া যায় না

রফতানিমুখী পোশাক শিল্পে কাঁচামালের ধরন অনেকাংশেই বিদেশি ক্রেতার চাহিদার ওপর নির্ভরশীল। একটি নির্দিষ্ট পোশাকের ক্ষেত্রে কাপড়ের মান, ওজন, রং, নকশা, গঠন, ফিনিশিং এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য ক্রেতা নির্ধারণ করে দিতে পারেন।

সব ধরনের ফেব্রিক্স সব সময় দেশীয় উৎস থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে বিশেষায়িত ফেব্রিক্স, নির্দিষ্ট মানের কাপড় বা ক্রেতার নির্ধারিত বিশেষ বৈশিষ্ট্যের ফেব্রিক্সের ক্ষেত্রে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়।

ফলে নিট ফেব্রিক্স আমদানির সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে নির্দিষ্ট ক্রেতার অর্ডার অনুযায়ী পোশাক তৈরি করাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।

নতুন আমদানি নীতিতে যে বিধান নিয়ে আপত্তি

সম্প্রতি প্রকাশিত আমদানি নীতি ২০২৬-২০২৯-এর ধারা ২৫-এর উপধারা ১২-তে নিট ফেব্রিক্স আমদানিকে অযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিকেএমইএর দাবি, রফতানিমুখী শিল্পের বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় এই বিধান কার্যকর হলে কাঁচামাল সংগ্রহে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সংগঠনটির মতে, দেশে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গ্যাস সংকটের কারণে অনেক কারখানা কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন করতে পারছে না। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্দিষ্ট চাহিদা পূরণে কিছু ফেব্রিক্স বিদেশ থেকে সংগ্রহ করা প্রয়োজন হয়। ফলে আমদানির পথ বন্ধ করা হলে রফতানি আদেশ পূরণে সরাসরি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পুরোনো এলসির পণ্য নিয়েও শঙ্কা

বিকেএমইএর চিঠিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, নতুন আমদানি নীতি প্রকাশের আগেই অনেক রফতানিকারক নিট ফেব্রিক্স আমদানির জন্য বিদেশি সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি করেছেন এবং ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণপত্র বা এলসি (Letter of Credit) খুলেছেন।

এসব এলসির বিপরীতে কিছু চালান ইতোমধ্যে দেশে এসে পৌঁছেছে। কোনো কোনো চালান আবার চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থান করছে। আরও কিছু চালানের আমদানি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

এ অবস্থায় নতুন নীতির বিধান কার্যকর হলে আগে থেকে এলসি খোলা পণ্য খালাস নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিকেএমইএ।

সংগঠনটির মতে, এসব পণ্য সময়মতো খালাস করতে না পারলে সংশ্লিষ্ট কারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে রফতানি আদেশের নির্ধারিত সময়সীমা মেনে চলাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

সময়মতো পণ্য সরবরাহ না হলে ঝুঁকিতে ক্রেতার আস্থা

আন্তর্জাতিক পোশাক ব্যবসায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ে অর্ডার সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে ক্রেতার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

একটি রফতানি আদেশের সঙ্গে শুধু একটি কারখানার উৎপাদন নয়, শ্রমিক, সরবরাহকারী, পরিবহন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও বৈদেশিক বাণিজ্যের একাধিক ধাপ জড়িত থাকে। ফলে কাঁচামাল আমদানিতে বাধা তৈরি হলে এর প্রভাব পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষ করে গ্যাস সংকটের কারণে যখন স্থানীয় উৎপাদন ইতোমধ্যে চাপে রয়েছে, তখন বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় ফেব্রিক্স সংগ্রহের সুযোগও সীমিত হয়ে গেলে রফতানিমুখী কারখানাগুলোর ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।

‘ভুলক্রমে’ বিধানটি যুক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছিল

বিকেএমইএর চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, আমদানি নীতির সংশ্লিষ্ট বিধান নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আগের এক আলোচনায় বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছিল। তখন বিধানটি ভুলক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল এবং তা সংশোধনের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল।

তবে গত ২৪ আগস্ট প্রকাশিত আমদানি নীতি ২০২৬-২০২৯-এর চূড়ান্ত সংস্করণেও নিট ফেব্রিক্স আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞার বিধানটি বহাল রাখা হয়েছে।

এতে উদ্যোক্তাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যে বিধান সংশোধনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, সেটি কেন চূড়ান্ত নীতিতে বহাল রাখা হলো—এ প্রশ্নও তুলেছে সংগঠনটি।

রফতানি শিল্পে সম্ভাব্য প্রভাব কী?

খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নিট ফেব্রিক্স আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে কয়েকটি ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হতে পারে।

প্রথমত, দেশীয় উৎপাদনে গ্যাস সংকটের কারণে যে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা বিদেশি উৎস থেকে পূরণ করা কঠিন হবে।

দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট মান ও বৈশিষ্ট্যের ফেব্রিক্সের প্রয়োজন হলে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পোশাক তৈরি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

তৃতীয়ত, আগে থেকে খোলা এলসির বিপরীতে আমদানি করা পণ্য খালাস নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে কারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে।

চতুর্থত, সময়মতো রফতানি আদেশ সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ অর্ডারের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

সবশেষে এর প্রভাব দেশের সামগ্রিক রফতানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ওপরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।

বিকেএমইএর দাবি—বিধান স্থগিত বা প্রত্যাহার

এই পরিস্থিতিতে রফতানিমুখী নিটওয়্যার শিল্পের উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে আমদানি নীতি ২০২৬-২০২৯-এর সংশ্লিষ্ট বিধানটি স্থগিত অথবা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বিকেএমইএ।

সংগঠনটির বক্তব্য, রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক ক্রেতার চাহিদা এবং বিদ্যমান বাণিজ্যিক চুক্তির বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বিশেষ করে নতুন নীতি কার্যকর হওয়ার আগে যেসব প্রতিষ্ঠান বৈধ প্রক্রিয়ায় এলসি খুলেছে এবং যেসব পণ্য ইতোমধ্যে দেশে এসেছে, সেগুলো যাতে আটকে না যায়—সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

চিঠির অনুলিপি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং বিজিএমইএ সভাপতির কাছেও দেওয়া হয়েছে।

যা বলছেন বিকেএমইএ সভাপতি

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, রফতানি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা ও নির্দেশনা অনুযায়ী দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয়।

তিনি বলেন, বিশেষ করে বর্তমান তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে দেশের রফতানিমুখী নিটওয়্যার শিল্প এবং ফেব্রিক্স উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

একই সঙ্গে বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা, নির্ধারিত মান ও নকশা, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রয়োজনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে ফেব্রিক্স আমদানি করা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

সামনে কী?

গ্যাস সংকটের মধ্যে উৎপাদন সচল রাখা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের রফতানি আদেশ সময়মতো পূরণ করা—এই দুই চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে দেশের নিটওয়্যার শিল্প। এর সঙ্গে নতুন আমদানি নীতির বিধিনিষেধ যুক্ত হওয়ায় উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

এখন সংশ্লিষ্টদের নজর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে। রফতানিমুখী শিল্পের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নিট ফেব্রিক্স আমদানির বিধান সংশোধন করা হবে কি না, নাকি বর্তমান নীতিই বহাল থাকবে—তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে আগামী দিনের কাঁচামাল সরবরাহ ও রফতানি উৎপাদনের পরিস্থিতি।

SEO কীওয়ার্ড: নিট ফেব্রিক্স আমদানি, নিটওয়্যার শিল্প, গ্যাস সংকট, আমদানি নীতি ২০২৬-২০২৯, বিকেএমইএ, তৈরি পোশাক রফতানি

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!