দেশে টানা অতিবৃষ্টি, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সরবরাহ সংকটের কারণে কাঁচামরিচের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বাজার স্থিতিশীল রাখতে ভারত থেকে কাঁচামরিচ আমদানি শুরু হয়েছে। সরকারের অনুমোদনের পর প্রথম চালানে ৯ টন ২০০ কেজি কাঁচামরিচ সোমবার (৩ আগস্ট) যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, পর্যায়ক্রমে আরও বড় পরিসরে আমদানি শুরু হলে বাজারে কাঁচামরিচের সরবরাহ বাড়বে এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে আমদানিকারকদের অভিযোগ, কাস্টমস প্রক্রিয়া, শুল্ক এবং বন্দর-সংক্রান্ত অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে প্রকৃত আমদানি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
প্রথম চালান ঢাকার পথে
বেনাপোল বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ভারতের একটি ট্রাকে করে আসা ৯.২ টন কাঁচামরিচ বন্দরের প্রয়োজনীয় কাস্টমস ও শুল্ক কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকার উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে।
এই চালানের আমদানিকারক শিমু এন্টারপ্রাইজ এবং খালাস কার্যক্রমে দায়িত্ব পালন করেছে শিমু শিপিং লাইন্স।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামিম হোসেন জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য হওয়ায় দ্রুততার সঙ্গে কাগজপত্র যাচাই করে চালান খালাস করা হয়েছে। সীমান্তের ওপারে আরও কয়েকটি মরিচবোঝাই ট্রাক বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে।

৬৯ ব্যবসায়ী পেলেন প্রায় ৩০ হাজার টন আমদানির অনুমতি
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাজারে কাঁচামরিচের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার ৬৯ জন আমদানিকারককে মোট ২৯ হাজার ৭১০ টন কাঁচামরিচ আমদানির অনুমতি (আইপি) দিয়েছে।
ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ, বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের নাসিক অঞ্চল থেকে এসব কাঁচামরিচ বাংলাদেশে আনা হচ্ছে। সোমবার থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে আমদানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
আমদানি বাড়লে কমবে দাম— আশা ব্যবসায়ীদের
আমদানিকারক শাহাজান জানান, কাঁচামরিচ আমদানিতে প্রতি কেজিতে তার মোট ব্যয় প্রায় ১৩৫ টাকা পড়েছে। অল্প লাভ রেখে বাজারে বিক্রি করা হবে।
তিনি বলেন,
"আমদানি বাড়লে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং কাঁচামরিচের দামও কমে আসবে।"
তবে তিনি অভিযোগ করেন, কাস্টমসের জটিলতা, অতিরিক্ত রাজস্ব এবং পণ্য ছাড়করণে সময়ক্ষেপণের কারণে আমদানিকারকদের ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
ঘোষিত মূল্য ও প্রকৃত ব্যয়ে বড় পার্থক্য
আমদানি নথিপত্র অনুযায়ী, প্রতি টন কাঁচামরিচের ঘোষিত মূল্য ২৩ হাজার ৮৭৫ টাকা, অর্থাৎ প্রতি কেজির মূল্য প্রায় ২৪ টাকা।
এর সঙ্গে সরকারকে কেজিপ্রতি প্রায় ৪৫ টাকা শুল্ক দিতে হচ্ছে। সে হিসাবে আমদানি ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৭৮ টাকা।
তবে আমদানিকারকদের দাবি, পরিবহন, বন্দর চার্জ, কাস্টমস, খালাস, শ্রমিক মজুরি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় যোগ হওয়ায় প্রকৃত খরচ ১৩৫ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।
এখনও বাজারে কেজি ৩০০ টাকা
সোমবার বেনাপোল বন্দরের কাঁচাবাজারে কাঁচামরিচ প্রতি কেজি ৩০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমানে সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম থাকায় দাম এখনও বেশি। তবে ভারত থেকে নিয়মিত চালান আসতে শুরু করলে কয়েক দিনের মধ্যেই বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অতিবৃষ্টি ও সরবরাহ সংকটে বেড়েছে দাম
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে কাঁচামরিচের উৎপাদন ও সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলে পাইকারি ও খুচরা— উভয় বাজারেই দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার জরুরি ভিত্তিতে ভারত থেকে কাঁচামরিচ আমদানির অনুমতি দেয়।
ক্রেতাদের স্বস্তি ফেরাতে নজরদারির দাবি
কাঁচামরিচের লাগামহীন দামে সাধারণ ভোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। তারা শুধু আমদানি নয়, বাজারে মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে নিয়মিত বাজার তদারকি এবং কার্যকর মনিটরিং জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে সরবরাহ বাড়বে, প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং কাঁচামরিচের দাম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

