ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

কৃষি ঋণে বড় সুখবর, ৩ হাজার কোটি টাকার তহবিলের ঋণে সুদ সর্বোচ্চ ৭%

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ০১:৩৫ পিএম

কৃষি ঋণে বড় সুখবর, ৩ হাজার কোটি টাকার তহবিলের ঋণে সুদ সর্বোচ্চ ৭%

ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং কৃষি ও কৃষিনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যে অর্থায়ন বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ উদ্যোগের আওতায় ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে বিতরণ করা ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদ বা মুনাফা নির্ধারণ করা হয়েছে।

রোববার (৩০ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগ-১ থেকে এ বিষয়ে একটি সংশোধিত নির্দেশনা জারি করা হয়। এতে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোর জন্য পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার সুদের হার, গ্রাহক পর্যায়ের ঋণের সর্বোচ্চ সুদ বা মুনাফা, ঋণের মেয়াদ এবং গ্রেস পিরিয়ডসহ বিভিন্ন শর্ত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এই তহবিলের আওতায় অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩ শতাংশ সুদ বা মুনাফা হারে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পাবে।

অন্যদিকে ওই অর্থে ব্যাংকগুলো যে ঋণ গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করবে, সেই ঋণের সুদ বা মুনাফার হার কোনোভাবেই ৭ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।

অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩ শতাংশ হারে অর্থ নিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করতে হবে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোকে।

শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। এসব ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে ৭ শতাংশের বেশি মুনাফা নিতে পারবে না।

ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৩৬ মাস

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশোধিত নির্দেশনায় ঋণের মেয়াদ ও গ্রেস পিরিয়ডের বিষয়টিও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু খাতে বিতরণ করা ঋণের সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ১৮ মাস। এসব ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া যাবে।

অন্যদিকে নির্ধারিত অন্যান্য খাত ও প্রকল্পের ক্ষেত্রে ঋণের সর্বোচ্চ মেয়াদ হবে ৩৬ মাস। এসব ঋণের ক্ষেত্রে তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

গ্রেস পিরিয়ডের অর্থ হলো, ঋণ পাওয়ার পর নির্ধারিত একটি সময় পর্যন্ত গ্রাহককে মূল ঋণ পরিশোধ থেকে বিরতি দেওয়া। কৃষি ও কৃষিভিত্তিক প্রকল্পে উৎপাদন শুরু ও আয় তৈরি হতে সময় লাগে—এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এ সুবিধা রাখা হয়েছে।

৭ শতাংশের বেশি সুদ নিলে ব্যাংকের জরিমানা

গ্রাহকদের জন্য নির্ধারিত সুদ বা মুনাফার সীমা যাতে ব্যাংকগুলো অতিক্রম করতে না পারে, সে বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক যদি গ্রাহকের কাছ থেকে ৭ শতাংশের বেশি সুদ আদায় করে, অথবা ঋণের অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যে যথাযথভাবে ব্যবহার না করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ২ শতাংশ অতিরিক্ত সুদ জরিমানা হিসেবে পরিশোধ করতে হবে।

অর্থাৎ ঋণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রাহক পর্যায়ে নির্ধারিত সুদহার মানার বিষয়টিও ব্যাংকগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

নির্ধারিত সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করতে হবে

পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা নেওয়া ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফেরত দিতে হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, পুনঃঅর্থায়ন গ্রহণের তারিখ থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে ঋণের আসল অর্থ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ৩ শতাংশ সুদ পরিশোধ করতে হবে।

ফলে তহবিল থেকে অর্থ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণের পর ব্যাংকগুলোকে ঋণ আদায় ও নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ ফেরতের বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

এই বিশেষ ঋণ সুবিধা সম্পর্কে কৃষক, উদ্যোক্তা ও সম্ভাব্য গ্রাহকদের অবহিত করতে ব্যাংকগুলোর শাখায় দৃশ্যমান স্থানে ব্যানার স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এর মাধ্যমে তহবিলের আওতায় ঋণ পাওয়ার সুযোগ, সুদের সর্বোচ্চ হার এবং অন্যান্য শর্ত সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানানো হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ উদ্যোগের ফলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ব্যবসা ও সংশ্লিষ্ট উৎপাদন কার্যক্রমে তুলনামূলক কম সুদে অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই কৃষিনির্ভর। ধান, গম, ভুট্টা, আলু, সবজি, ফলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি এসব পণ্যের সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও বিপণনের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়িত।

কিন্তু কৃষিপণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি আধুনিক সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কৃষিপণ্যভিত্তিক ব্যবসা এবং সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে বড় অঙ্কের অর্থায়ন প্রয়োজন। তুলনামূলক কম সুদের এ তহবিল সেই অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে কৃষিপণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনমূলক শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগও বাড়তে পারে।

বর্তমান সময়ে ব্যাংকঋণের সুদহার ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য বড় একটি ব্যয়ের বিষয়। এ অবস্থায় সর্বোচ্চ ৭ শতাংশ সুদ বা মুনাফায় ঋণ পাওয়ার সুযোগ কৃষি ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হতে পারে।

তবে এই সুবিধা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে ব্যাংক পর্যায়ে স্বচ্ছ ঋণ বিতরণ, প্রকৃত উদ্যোক্তা নির্বাচন, ঋণের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার এবং নিয়মিত তদারকি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশোধিত নির্দেশনার মাধ্যমে একদিকে যেমন কম সুদে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে নির্ধারিত সুদের সীমা অমান্য করলে ব্যাংকের ওপর জরিমানার বিধান রেখে গ্রাহকের স্বার্থও সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এখন এ তহবিলের অর্থ প্রকৃত কৃষক ও কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তাদের কাছে কতটা দ্রুত ও সহজ শর্তে পৌঁছায়, তার ওপরই উদ্যোগটির সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!