ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

কর্মী সাড়ে ১০ হাজার, স্টাফ অ্যাকাউন্ট ১ লাখ ৭৬ হাজার! অগ্রণী ব্যাংকের সিস্টেমে ভয়াবহ অসঙ্গতি

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: আগস্ট ২৭, ২০২৬, ১০:১৪ এএম

কর্মী সাড়ে ১০ হাজার, স্টাফ অ্যাকাউন্ট ১ লাখ ৭৬ হাজার! অগ্রণী ব্যাংকের সিস্টেমে ভয়াবহ অসঙ্গতি

ছবিঃ সংগৃহীত

সিস্টেমের ত্রুটি, চার্জ আদায়ে দুর্বলতা এবং ব্যবস্থাপনার দীর্ঘস্থায়ী গাফিলতির কারণে প্রতি বছর প্রায় ১২৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক। এক-দুই বছর ধরে নয়, নিরীক্ষায় উঠে এসেছে—এই সমস্যা প্রায় ১৫ বছর ধরে চলে আসছে। ফলে দীর্ঘ সময়ে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।

শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে প্রকৃত কর্মীর তুলনায় অস্বাভাবিক সংখ্যক ‘স্টাফ অ্যাকাউন্ট’ চিহ্নিত হওয়া, গ্রাহকের কেওয়াইসি তথ্যের ঘাটতি এবং মোবাইল নম্বর সংক্রান্ত অসঙ্গতিও ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও তথ্যনিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

অগ্রণী ব্যাংকের আইটি অ্যান্ড এমআইএস ডিভিশনের ওপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বছরে ১২৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা হারাচ্ছে ব্যাংক

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে ১ কোটি ৪৮ লাখের বেশি সক্রিয় হিসাব রয়েছে। এসব হিসাব থেকে নিয়ম অনুযায়ী বার্ষিক হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ ফি এবং এসএমএস অ্যালার্ট চার্জ আদায়ের কথা থাকলেও বিপুলসংখ্যক হিসাব থেকে তা নিয়মিত আদায় হচ্ছে না।

দেশের ১০টি বড় শাখার নমুনা পর্যালোচনায় নিরীক্ষকরা দেখতে পান, সঞ্চয়ী হিসাবের প্রায় ১৩ শতাংশ এবং এসএমএস সেবার ক্ষেত্রে প্রায় ৩১ শতাংশ গ্রাহকের কাছ থেকে নির্ধারিত চার্জ আদায় করা হচ্ছে না।

অগ্রণী ব্যাংকের প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ সঞ্চয়ী হিসাবের মধ্যে প্রায় ১৮ লাখ হিসাব থেকে রক্ষণাবেক্ষণ ফি আদায় হচ্ছে না। এতে বছরে প্রায় ৬২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ব্যাংকটি।

অন্যদিকে প্রায় ৪৫ লাখ ৭০ হাজার গ্রাহকের হিসাব থেকে এসএমএস অ্যালার্ট চার্জ কাটা হচ্ছে না। এ খাতে বছরে সম্ভাব্য ক্ষতি প্রায় ৬৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

চলতি হিসাব, এসএনডি ও সুপার সেভিংসসহ অন্যান্য হিসাব থেকেও নিয়মিত চার্জ আদায় না হওয়ায় সব মিলিয়ে বছরে ব্যাংকের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১২৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

১৫ বছরে সম্ভাব্য ক্ষতি প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি

নিরীক্ষায় উঠে আসা সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর সমাধান হয়নি। একই ধরনের ক্ষতি প্রায় ১৫ বছর ধরে হয়ে থাকলে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা হতে পারে।

অর্থাৎ, একটি প্রযুক্তিগত ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা সময়ের সঙ্গে ছোটখাটো আয়হানির বিষয় না থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে—ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, আইটি ব্যবস্থাপনা, শাখা পর্যায়ের তদারকি এবং ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনার নজরদারি এত দীর্ঘ সময়েও কেন কার্যকর হয়নি।

চার্জ কাটার টাকা না থাকলে বকেয়া আদায় করে না সিস্টেম

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ ক্ষতির অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেম বা টি-২৪ সফটওয়্যারের চার্জ ব্যবস্থাপনার ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছে।

কোনো গ্রাহকের হিসাবে নির্ধারিত চার্জ কাটার সময় পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে সিস্টেম আংশিক টাকা কেটে নেয় অথবা কোনো টাকা কাটতে পারে না। পরবর্তী সময়ে ওই হিসাবে টাকা জমা হলেও পূর্বের বকেয়া চার্জ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদায় হচ্ছে না।

ফলে একবার চার্জ কাটা না হলে পরবর্তী সময়ে সেই অর্থ আদায়ের কার্যকর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা না থাকায় ব্যাংকের আয় হারিয়ে যাচ্ছে।

নিরীক্ষকদের মতে, সফটওয়্যারে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে বকেয়া চার্জ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদায়ের ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।

১০ হাজার কর্মীর বিপরীতে ‘স্টাফ অ্যাকাউন্ট’ ১ লাখ ৭৬ হাজার

অগ্রণী ব্যাংকের নিরীক্ষায় আরেকটি বড় অসঙ্গতি ধরা পড়েছে ‘স্টাফ অ্যাকাউন্ট’ নিয়ে।

ব্যাংকের সিস্টেমে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩৪টি হিসাব স্টাফ অ্যাকাউন্ট হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। অথচ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা মাত্র ১০ হাজার ৪৫০ জন।

অর্থাৎ প্রকৃত কর্মীর তুলনায় স্টাফ অ্যাকাউন্ট হিসেবে চিহ্নিত হিসাবের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি।

নিরীক্ষক দল এসব হিসাব যাচাই করে প্রকৃত কর্মী ছাড়া অন্যদের কাছ থেকে নিয়ম অনুযায়ী প্রযোজ্য চার্জ আদায়ের সুপারিশ করেছে।

এই বিপুল সংখ্যক স্টাফ অ্যাকাউন্ট কীভাবে তৈরি হলো, কারা এসব হিসাব ব্যবহার করছেন এবং কোন সময় থেকে এগুলো স্টাফ ক্যাটাগরিতে রয়েছে—এসব বিষয়ও যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গ্রাহকের তথ্য নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন

অগ্রণী ব্যাংকের সমস্যা শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গ্রাহকদের তথ্যনিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিরীক্ষকরা।

নিরীক্ষায় দেখা গেছে, অনেক গ্রাহকের কেওয়াইসি ফরমে মোবাইল নম্বর নেই। আবার কোথাও ল্যান্ডফোন নম্বর দেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে গ্রাহকের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর পুরোনো বা ভুল থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে।

এতে গ্রাহকরা নিয়মিত এসএমএস অ্যালার্ট বা ওটিপি না পাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। ব্যাংকিং লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা গ্রাহকের কাছে না পৌঁছালে অননুমোদিত লেনদেন শনাক্ত করতে দেরি হতে পারে।

ফলে শুধু গ্রাহকের সেবা ব্যাহত নয়, ভবিষ্যতে জালিয়াতি, অননুমোদিত লেনদেন কিংবা অর্থ আত্মসাতের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চায় বাংলাদেশ ব্যাংক

অগ্রণী ব্যাংকের আইটি বিভাগের ওপর পরিদর্শনে অনিয়মের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।

তিনি জানিয়েছেন, ব্যাংকটির উচিত অনিয়মের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকও তার আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।

অন্যদিকে সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, নির্ধারিত চার্জ আদায় না হওয়ার বিষয়টি যোগ্যতার ঘাটতি নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে, তা আগে বের করা দরকার। যদি দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা থাকে, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত; আর যদি দক্ষতার ঘাটতি হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের বক্তব্য

অভিযোগ ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেছেন, বিষয়টি তার জানা নেই এবং তাকে সম্ভবত ভুল তথ্য দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

ক্ষতি বন্ধে পাঁচ দফা সুপারিশ

অর্থের এই ক্ষতি বন্ধ এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে নিরীক্ষক দল পাঁচ দফা সুপারিশ করেছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

টি-২৪ সফটওয়্যার আপগ্রেড করে বকেয়া চার্জ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদায়ের ব্যবস্থা করা;
১ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি স্টাফ অ্যাকাউন্ট যাচাই করা;
প্রতি তিন মাসে চার্জ আদায়ে ব্যর্থতার কারণ উল্লেখ করে প্রতিবেদন তৈরি করা;
কোন হিসাব থেকে কেন চার্জ আদায় হয়নি, তার অডিট ট্রেইল সংরক্ষণ করা;
গত ১৫ বছর ধরে সমস্যাগুলো সমাধানে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় বড় প্রশ্ন

অগ্রণী ব্যাংকের এই নিরীক্ষা প্রতিবেদন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

একদিকে ব্যাংকের কোটি কোটি টাকার সম্ভাব্য আয় নিয়মিতভাবে আদায় হচ্ছে না, অন্যদিকে সিস্টেমে প্রকৃত কর্মীর তুলনায় বহুগুণ বেশি স্টাফ অ্যাকাউন্ট এবং গ্রাহকের কেওয়াইসি তথ্যের ঘাটতি—সব মিলিয়ে বিষয়গুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত ও সংশোধনের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতার জন্য প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গ্রাহকের তথ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেওয়াইসি তথ্য হালনাগাদ এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

অগ্রণী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এখন মূল প্রশ্ন—বছরের পর বছর যে ১২৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকার সম্ভাব্য ক্ষতি হয়ে আসছে, তা বন্ধে ব্যবস্থা কবে কার্যকর হবে এবং দীর্ঘদিনের এই অনিয়মের জন্য দায় নির্ধারণ করা হবে কি না।

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!