ঢাকা সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

গাইবান্ধায় ৩ হাজার ৮৫১ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক, দুর্ভোগে লাখো মানুষ

গাইবান্ধা প্রতিনিধি:

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬, ১১:০২ এএম

গাইবান্ধায় ৩ হাজার ৮৫১ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক, দুর্ভোগে লাখো মানুষ

ছবিঃ সংগৃহীত

গাইবান্ধায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন ৩ হাজার ৮৫১ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক বছরের পর বছর ধরে জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে আছে। বর্ষা এলেই এসব সড়কের বড় অংশ পরিণত হয় হাঁটুসমান কাদায়, আর শুকনো মৌসুমে শুরু হয় ধুলোর দাপট। কোথাও কোথাও সড়কের একাংশ ভেঙে পুকুরে বিলীন হয়ে যাওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে স্থানীয়দের।

পাকা সড়কের অভাবে জেলার প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিপণ্য পরিবহন ও দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে রোগী, শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্কদের দুর্ভোগ চরমে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারাই চাঁদা তুলে ভাঙা ইট, খোয়া, বালি ও সুরকি ফেলে প্রতিবছর সড়ক সংস্কারের চেষ্টা করছেন।

গাইবান্ধায় কাঁচা সড়ক ৩ হাজার ৮৫১ কিলোমিটার

এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই পর্যন্ত গাইবান্ধার সাত উপজেলায় এলজিইডির আওতায় মোট ৫ হাজার ৮৫০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে এইচবিএস (কার্পেটিং), ডব্লিউবিএম (খোয়া), বিএফএস (সলিং), এইচবিবি, সিসি ও আরসিসিসহ বিভিন্ন ধরনের পাকা সড়ক রয়েছে ১ হাজার ৯৯৮ কিলোমিটার। বিপরীতে কাঁচা সড়কের পরিমাণ ৩ হাজার ৮৫১ কিলোমিটার।

অর্থাৎ জেলার এলজিইডির আওতাধীন সড়কের বড় একটি অংশ এখনো কাঁচা। এসব সড়কের অনেকগুলোই গ্রাম থেকে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও দীর্ঘদিন ধরে পাকাকরণের অপেক্ষায় রয়েছে।

উপজেলাভিত্তিক হিসাবেও কাঁচা সড়কের চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। গাইবান্ধা সদর উপজেলায় মোট ১ হাজার ২৪৬ দশমিক ০৯ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে কাঁচা ৯৩১ দশমিক ২৮ কিলোমিটার। সুন্দরগঞ্জে ৮৯৯ দশমিক ৭২ কিলোমিটারের মধ্যে কাঁচা ৫৮৪ দশমিক ৭২ কিলোমিটার।

সাদুল্লাপুরে মোট ৬৫৩ দশমিক ১৪ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে কাঁচা ৪২২ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। পলাশবাড়িতে ৮২৩ দশমিক ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কাঁচা ৬৩৭ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার। গোবিন্দগঞ্জে ১ হাজার ২৪৬ দশমিক ০৫ কিলোমিটারের মধ্যে কাঁচা ৬৮৯ দশমিক ১১ কিলোমিটার।

এ ছাড়া সাঘাটা উপজেলায় মোট ৬২১ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে কাঁচা ৩০৮ কিলোমিটার এবং ফুলছড়িতে ৩৫৯ দশমিক ৮৪ কিলোমিটারের মধ্যে কাঁচা সড়ক রয়েছে ২৭৭ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার।

১ হাজার ৩১৩ সড়ক পাঠানো হয়েছিল পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলার গুরুত্বপূর্ণ কাঁচা সড়কগুলো উন্নয়নের আওতায় আনতে সর্বশেষ ২০২২ সালের শেষের দিকে ১ হাজার ৩১৩টি সড়ক নতুন করে আইডিভুক্ত করার জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

এর মধ্যে বিশেষ সুপারিশের ভিত্তিতে সুন্দরগঞ্জে ৮ কিলোমিটার এবং সাদুল্লাপুরে ৪ কিলোমিটারসহ মোট ১২ কিলোমিটার সড়ক ইতোমধ্যে আইডিভুক্ত হয়েছে। তবে বিপুলসংখ্যক সড়ক এখনো আইডিভুক্তির অপেক্ষায় থাকায় সেগুলোর পাকাকরণও অনিশ্চিত হয়ে আছে।

স্থানীয়দের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো দ্রুত আইডিভুক্ত করে পর্যায়ক্রমে পাকাকরণের আওতায় আনা হলে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।

সদরেই ৯৩১ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক

গাইবান্ধা সদর উপজেলার চিত্র আরও বেশি সংকটপূর্ণ। এ উপজেলায় এলজিইডির আওতায় থাকা ১ হাজার ২৪৬ দশমিক ০৯ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৯৩১ দশমিক ২৮ কিলোমিটারই কাঁচা।

বোয়ালী ইউনিয়নের এসকেএস মোড় থেকে রাধাকৃষ্ণপুর কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক এর অন্যতম উদাহরণ। এই সড়কের পশ্চিম পাশে রাধাকৃষ্ণপুর জামে মসজিদ এবং অপর প্রান্তে হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা নিয়মিত এই পথ ব্যবহার করেন।

এ ছাড়া বোয়ালীর সীমান্ত মোড় থেকে রামচন্দ্রপুরের গোপালপুরগামী সড়ক এবং তিনগাছতলা এলাকার আয়ান মিয়ার ইটভাটা থেকে পুরাতন বোর্ডবাজারগামী সড়কটিও স্থানীয়দের কাছে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ।

পুকুরে বিলীন হচ্ছে সড়কের একাংশ

সরেজমিনে এসকেএস মোড় থেকে রাধাকৃষ্ণপুর এলাকার সড়কের বিভিন্ন অংশে দেখা গেছে, দীর্ঘদিনের দুর্বল অবস্থার কারণে কোথাও কোথাও সড়কের অর্ধেক অংশ পর্যন্ত ভেঙে পাশের পুকুরে চলে গেছে।

এসকেএস মোড় থেকে পূর্ব রাধাকৃষ্ণপুর পর্যন্ত সড়কের পাশে অন্তত ছয়টি পুকুর রয়েছে। এসব পুকুরের কারণে কয়েকটি স্থানে সড়কের প্রস্থ কমে গেছে। আব্দুল কাফী শেখের বাড়ির সামনে মহুরির পুকুরে গাইডওয়াল থাকা সত্ত্বেও সড়কের একটি বড় অংশ ভেঙে গেছে। একইভাবে শাহারুল আলমের বাড়ির সামনে আব্দুল কাফী শেখের পুকুরসংলগ্ন অংশেও সড়ক ভেঙে পড়েছে।

স্থানীয়দের উদ্যোগে বিভিন্ন সময় সড়কে ভাঙা ইট ও খোয়া ফেলা হলেও বৃষ্টির পানিতে মাটি সরে গিয়ে সেগুলো উঁচু-নিচু হয়ে পড়েছে। এতে বিশেষ করে পায়ে হাঁটা মানুষের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে।

বর্ষায় হাঁটুসমান কাদা, শুকনায় ধুলোর ঝড়

সদরের বাদিয়াখালি ইউনিয়নের গোয়াইলবাড়ি (আমতলী) থেকে পলাশবাড়ী উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের কুমেদপুর বাজার পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার কাঁচা সড়কের অবস্থাও নাজুক।

সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে কয়েকটি অংশ হাঁটুসমান কাদায় পরিণত হয়েছে। ফলে পথচারীদের পাশাপাশি মোটরসাইকেল, ভ্যান, অটোরিকশাসহ অন্যান্য যানবাহন চলাচলেও সমস্যা হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষায় কাদা আর শুকনো মৌসুমে ধুলোর কারণে একই সড়ক দুই মৌসুমেই দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রতিবছর চাঁদা তুলে রাস্তা মেরামত

রাধাকৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, জেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এ সড়কটি তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। দুটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ প্রতিদিন এ পথে চলাচল করেন। অথচ জেলা শহর থেকে মাত্র প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরের এই এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক স্বাধীনতার এত বছর পরও পাকা হয়নি।

স্থানীয়রা জানান, বর্ষা এলে রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ হয় যে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সরকারি উদ্যোগের অপেক্ষায় না থেকে প্রতিবছর এলাকাবাসী চাঁদা তুলে ভাঙা ইট, বালি, সুরকি, খোয়া ও রাবিশ ফেলে সাময়িকভাবে সড়কটি চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা করেন।

চিকিৎসা ও শিক্ষায় বড় বাধা

স্থানীয় কলেজ শিক্ষক আমিনুল ইসলাম কামাল বলেন, “কেবল রাস্তাটিই আমাদের পিছিয়ে রেখেছে। আধুনিক যুগে এসেও আমরা সনাতন পদ্ধতিতে বসবাস করছি। শহরতলীর একটি সড়ক এখনো কাঁচা। প্রতিবছর এলাকাবাসী চাঁদা তুলে রাস্তাটি মেরামত করে চলাচল করতে হয়।”

তিনি দ্রুত সড়কটি পাকাকরণের দাবি জানান। একই দাবি জানিয়েছেন সাবেক পুলিশ সদস্য সফিউল ইসলাম মন্ডলও।

হরিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মনিরুজ্জামান বলেন, বর্ষাকালে এ পথে কোনো যানবাহনই সহজে চলাচল করতে চায় না। শুকনো মৌসুমেও খানাখন্দের কারণে যানবাহন চালকেরা আসতে অনীহা দেখান। ফলে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

কলেজ শিক্ষার্থী পারভেজ বলেন, কোনো মানুষ অসুস্থ হলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে প্রসূতি নারীকে হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। বর্ষায় কাদায় পিছলে শিক্ষার্থীদের পোশাক নষ্ট হয়, অনেক সময় জুতা হাতে নিয়ে চলতে হয়।

প্রতিদিন শত শত মানুষের চলাচল

বাদিয়াখালীর গোয়াইলবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আতিকুর রহমান আতিক বলেন, কুমেদপুর বাজার থেকে আমতলী পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন এই পথে যানবাহনসহ প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মানুষ চলাচল করেন। বর্ষায় খানাখন্দ ও কাদায় সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

তার দাবি, সড়কটি দ্রুত পাকাকরণের আওতায় আনা হলে কয়েকটি এলাকার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহনেও সুবিধা হবে।

জনপ্রতিনিধিদেরও দ্রুত উদ্যোগের দাবি

প্রেসক্লাব গাইবান্ধার সাংগঠনিক সম্পাদক ও স্থানীয় বাসিন্দা রজতকান্তি বর্মন বলেন, কোনো সড়ক পাকাকরণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও চেয়ারম্যানদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। দীর্ঘদিনেও সড়কটি পাকা না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও দায় রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচা সড়কগুলো দ্রুত পাকাকরণের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

৮ নম্বর বোয়ালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম সাবু বলেন, তিনগাছতলা থেকে পূর্ব রাধাকৃষ্ণপুরগামী সড়কটি বোয়ালী ইউনিয়নের অতি পুরোনো ও জনগুরুত্বপূর্ণ একটি রাস্তা। এটি পাকাকরণ করা অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

বরাদ্দ পেলেই পাকাকরণের উদ্যোগ: এলজিইডি

গাইবান্ধা স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আজিজ বলেন, নতুন অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে আইডিভুক্ত সড়কগুলো পাকাকরণের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এলজিইডির এই বক্তব্যে আশার কথা থাকলেও স্থানীয়দের প্রশ্ন—দীর্ঘদিন ধরে কাঁচা থাকা হাজার হাজার কিলোমিটার সড়কের কতগুলো কবে নাগাদ পাকাকরণের আওতায় আসবে?

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জনসংখ্যা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষিপণ্য পরিবহন ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে অগ্রাধিকারভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো পাকাকরণ করা হবে। এতে বর্ষায় কাদা ও শুকনো মৌসুমে ধুলোর দুর্ভোগ থেকে মুক্তির পাশাপাশি জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায়ও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!