গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে করতোয়া নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা ইয়াসমিন সুলতানাসহ ভ্রাম্যমাণ আদালতের সদস্যরা হামলার শিকার হয়েছেন। অভিযানের সময় বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের সদস্যরা অভিযানকারী দলকে লক্ষ্য করে ঢিল ও গাছের ডাল নিক্ষেপ করে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ড্রেজার ধ্বংসের কাজে নিয়োজিত রাজু শেখ নামে এক শ্রমিক গুরুতর আহত হয়েছেন।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী ও দরবস্ত ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় করতোয়া নদীতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত চারটি ড্রেজার মেশিন ধ্বংস করা হয়েছে।
যেসব এলাকায় অভিযান
ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে জানা যায়, করতোয়া নদীতে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
সোমবার বিকেল থেকে ফুলবাড়ী ও দরবস্ত ইউনিয়নের কাটাখালি, হাতিয়াদহ, শাকপালা, বিশ্বনাথপুর, চকরহিমাপুর, চাঁদপুর, খলসী, বোয়ালিয়া ও সমসপাড়া এলাকায় অভিযান চালানো হয়।
অভিযানের সময় নদীতে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ড্রেজার মেশিন শনাক্ত করে সেগুলো অকার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে চারটি ড্রেজার মেশিন ধ্বংস করা হয় বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।

হঠাৎ ঢিল ও গাছের ডাল নিক্ষেপ
অভিযান চলাকালে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বিশ্বনাথপুর এলাকায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রের ভাষ্য, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত একটি ড্রেজার মেশিন ধ্বংসের কাজ চলছিল। এ সময় হঠাৎ নদীর বাঁধের ওপর থেকে ইউএনওসহ অভিযানে থাকা সদস্যদের লক্ষ্য করে ঢিল ও গাছের ডাল নিক্ষেপ করা হয়।
হঠাৎ এমন হামলায় অভিযানে থাকা সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। পরিস্থিতির কারণে কিছু সময়ের জন্য অভিযান কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
এ সময় ড্রেজার মেশিন ধ্বংসের কাজে নিয়োজিত শ্রমিক রাজু শেখ গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে এসি ল্যান্ড
হামলার খবর পেয়ে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তামশিদ ইরাম খান অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
পুলিশের উপস্থিতিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। পরে ইউএনও ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ ভ্রাম্যমাণ আদালতের সদস্যদের নিরাপদে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময় এ ধরনের হামলার ঘটনা প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সরকারি দায়িত্ব পালনে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে।
ইউএনওর বক্তব্য
সোমবার রাতে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দা ইয়াসমিন সুলতানা বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবেই ওই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল।
তিনি জানান, অভিযান চলাকালে অভিযানে থাকা সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
পুলিশের ভাষ্য
গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক জানান, হামলার খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে ইউএনওসহ ভ্রাম্যমাণ আদালতের সদস্যদের নিরাপদে উদ্ধার করে নিয়ে আসা হয়।
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় রাতে গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে মামলায় কতজনকে আসামি করা হয়েছে কিংবা কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে অভিযান অব্যাহত
স্থানীয়ভাবে নদী থেকে অনুমোদন ছাড়া বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তীর ও আশপাশের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ, তীরবর্তী কৃষিজমি ও বসতভিটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
এ কারণে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গোবিন্দগঞ্জে সর্বশেষ অভিযানে চারটি ড্রেজার মেশিন ধ্বংসের পাশাপাশি অভিযানকারী দলের ওপর হামলার ঘটনা নতুন করে স্থানীয় প্রশাসনের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় কর্মকর্তাদের ওপর হামলার অভিযোগটি এখন আইনগতভাবে কীভাবে এগোয় এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

