ঋণপত্র বা লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) না খুলেই কেবল ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির ভিত্তিতে পণ্য আমদানির সুযোগ পেলেন দেশের ব্যবসায়ীরা। ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট-১ এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোতে পাঠিয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট মূল্যসীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতের আমদানিযোগ্য পণ্য চুক্তির ভিত্তিতে আমদানির সুযোগ তৈরি হলো।
এর আগে গত ২৪ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’ জারি করে। নতুন নীতিমালার আলোকে বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে এলসির পাশাপাশি আরও নমনীয় পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এলসি ছাড়াই আমদানির সুযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সার্কুলার অনুযায়ী, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে আমদানিযোগ্য সব ধরনের পণ্য কোনো মূল্যসীমা ছাড়াই কেবল ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির ভিত্তিতে আমদানি করা যাবে। অর্থাৎ আমদানিকারক ও বিদেশি সরবরাহকারীর মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির ভিত্তিতেই পণ্য আনার সুযোগ থাকবে।
এ ক্ষেত্রে প্রচলিত এলসি খোলার বাধ্যবাধকতা থাকছে না। ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে একটি বিকল্প লেনদেন কাঠামো তৈরি হলো।
বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিদেশি সরবরাহকারীদের সঙ্গে নিয়মিত ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে, তাদের জন্য এ ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনায় বাড়তি নমনীয়তা তৈরি করতে পারে।
‘ওপেন অ্যাকাউন্ট’ পদ্ধতিতেও মূল্য পরিশোধ
নতুন নির্দেশনায় আমদানি করা পণ্যের মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে ‘উন্মুক্ত হিসাব’ বা ওপেন অ্যাকাউন্ট (Open Account) পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
ওপেন অ্যাকাউন্ট পদ্ধতিতে সাধারণত পণ্য সরবরাহের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমদানিকারক মূল্য পরিশোধ করেন। ফলে আমদানিকারকের জন্য পণ্য সংগ্রহ ও অর্থ পরিশোধের সময়ের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের সুবিধা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থপ্রবাহ বা ক্যাশ ফ্লো ব্যবস্থাপনা সহজ করতে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এতে তুলনামূলকভাবে নমনীয়ভাবে অর্থের ব্যবহার ও পরিশোধের সময় নির্ধারণ করতে পারবে।
বৈদেশিক মুদ্রার নিয়ম মানতেই হবে
তবে এলসি ছাড়াই পণ্য আমদানির সুযোগ পাওয়া গেলেও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রচলিত সব বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে বলে স্পষ্ট করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
অর্থাৎ এলসি না খোলার সুযোগকে বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত অন্যান্য নিয়ম থেকে অব্যাহতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট এডি ব্যাংককে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, আমদানি-সংক্রান্ত নথিপত্র এবং অন্যান্য প্রযোজ্য বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
এডি ব্যাংকের ওপর বাড়তি দায়িত্ব
নতুন ব্যবস্থায় অনুমোদিত ডিলার বা এডি ব্যাংকগুলোর দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। আমদানি করা পণ্য এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের উপকরণ সংগ্রহসংক্রান্ত লেনদেন নিষ্পত্তির সময় ব্যাংকগুলোকে আমদানি নীতি আদেশের বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।
ফলে এলসি ছাড়া আমদানির ক্ষেত্রে চুক্তিপত্র, আমদানির ধরন, মূল্য পরিশোধের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের বিধিবিধান যথাযথভাবে যাচাই করে লেনদেন সম্পন্ন করতে হবে।
রপ্তানিমুখী শিল্পেও বাড়তি সুবিধা
নতুন আমদানি নীতিমালায় রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন উপকরণ আমদানি ও স্থানীয় উৎস থেকে সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সুবিধা রাখা হয়েছে।
নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ব্যবহারের মাধ্যমে স্থানীয় উৎস থেকে দেশীয় মুদ্রায় উৎপাদন উপকরণ সংগ্রহ করতে পারবে। পাশাপাশি ‘ফ্রি-অব-কস্ট’ বা বিনামূল্যে উৎপাদনের কাঁচামাল সংগ্রহের সুযোগও রাখা হয়েছে।
এর সঙ্গে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায় কী প্রভাব পড়তে পারে
এলসি ছাড়াই চুক্তির ভিত্তিতে আমদানির সুযোগ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যুক্ত ব্যবসায়ীদের জন্য লেনদেন প্রক্রিয়া আরও নমনীয় করতে পারে। প্রচলিত এলসি ব্যবস্থার বাইরে চুক্তিভিত্তিক আমদানির সুযোগ থাকায় নির্দিষ্ট ধরনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পণ্য সংগ্রহ ও মূল্য পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে একই বিদেশি সরবরাহকারীর সঙ্গে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের চুক্তি ও অর্থপ্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা করতে পারবে। এতে ব্যবসার কার্যকর মূলধন ব্যবস্থাপনায় কিছুটা সুবিধা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে এই সুবিধার কার্যকর ব্যবহার নির্ভর করবে আমদানিকারক, বিদেশি সরবরাহকারী এবং এডি ব্যাংকের মধ্যে যথাযথ নথিপত্র ও বৈদেশিক মুদ্রা বিধি পরিপালনের ওপর।
কতদিন কার্যকর থাকবে নতুন ব্যবস্থা?
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন আমদানি নীতি আদেশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিধান আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এই সময়ের মধ্যে নতুন কোনো নির্দেশনা বা আদেশ জারি না হলে বর্তমান বিধানই বহাল থাকবে।
সামগ্রিকভাবে নতুন নির্দেশনার ফলে এলসি নির্ভরতার বাইরে চুক্তিভিত্তিক আমদানি এবং ওপেন অ্যাকাউন্ট পদ্ধতিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ পেলেন ব্যবসায়ীরা। তবে সুবিধাটির পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা ও আমদানি-সংক্রান্ত বিদ্যমান বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

