বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য দীর্ঘদিন স্থগিত থাকা অভিবাসী ভিসা (Immigrant Visa) দেওয়ার প্রক্রিয়া আবারও চালু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ফেডারেল আদালতের এক আদেশের পর নির্দিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যু স্থগিত রাখার নীতি বাতিল করা হয়েছে।
এর ফলে এখন থেকে প্রচলিত মার্কিন অভিবাসন আইন ও ভিসা প্রক্রিয়ার অন্যান্য শর্ত পূরণ সাপেক্ষে তালিকাভুক্ত ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া আবার এগিয়ে নেওয়া যাবে। এই ভিসার মাধ্যমে যোগ্য আবেদনকারীরা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার পথে এগোতে পারেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে ২৮ আগস্ট হালনাগাদ করা তথ্যে বলা হয়েছে, আগে জারি করা ওই স্থগিতাদেশ এখন আর কার্যকর নেই।
কেন অভিবাসী ভিসা স্থগিত করা হয়েছিল?
চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বিশ্বের ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে স্থগিত করে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর কোনো কোনো আবেদনকারী সরকারি সুযোগ-সুবিধা বা জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন কি না—তা যাচাই করা। অভিবাসী ভিসার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়া যায়। ফলে আবেদনকারীদের আর্থিক সক্ষমতা ও সম্ভাব্য সরকারি সুবিধা-নির্ভরতার বিষয়টি যাচাইয়ের অংশ হিসেবে ওই নীতি নেওয়া হয়েছিল।
তবে এই সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আইনি চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়।
ক্যাথলিক লিগ্যাল ইমিগ্রেশন নেটওয়ার্ক (CLINIC) একটি মামলা দায়ের করে। মামলায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টের জেলা আদালতে বিষয়টি উত্থাপিত হয়।
মামলাটির শুনানি শেষে মার্কিন জেলা বিচারক জিনেট ভার্গাস অভিবাসী ভিসা স্থগিত রাখার নীতির বিষয়ে রায় দেন। এরপর গত ২১ আগস্ট ওই নীতি বাতিলের পথ তৈরি হয়।
আদালতের যুক্তি ছিল, শুধুমাত্র কোনো ব্যক্তির জাতীয়তার ভিত্তিতে অভিবাসী ভিসা প্রত্যাখ্যান করা ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের আওতায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমার বাইরে পড়ে।
আদালতের এই সিদ্ধান্তের পর সংশ্লিষ্ট ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যু স্থগিত রাখার নীতি আর কার্যকর থাকল না। বাংলাদেশিদের জন্য কী অর্থ বহন করছে?
নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী ভিসা ইস্যুর প্রক্রিয়া আবার স্বাভাবিক নিয়মে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে তালিকাভুক্ত দেশগুলোর প্রত্যেক আবেদনকারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা পাবেন। আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত অভিবাসন আইন, যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, নিরাপত্তা যাচাই এবং অন্যান্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে।
অর্থাৎ স্থগিতাদেশ উঠে যাওয়ায় ভিসা দেওয়ার ওপর নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞাটি সরেছে, কিন্তু অভিবাসী ভিসা পাওয়ার সাধারণ যোগ্যতা ও যাচাই-বাছাইয়ের নিয়ম বহাল থাকবে।
আগে আবেদন ও সাক্ষাৎকার দেওয়া ব্যক্তিদের কী হবে?স্থগিতাদেশ চলাকালে যেসব আবেদনকারী আবেদন জমা দিয়েছিলেন এবং সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, তাদের ক্ষেত্রে মূলত চূড়ান্ত ভিসা ইস্যুর পর্যায়ে স্থগিতাদেশের প্রভাব পড়েছিল।
এখন স্থগিতাদেশ উঠে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীদের অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া প্রচলিত নিয়মে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগে দেওয়া ভিসার ওপর ওই স্থগিতাদেশের কোনো প্রভাব পড়েনি।
দ্বৈত নাগরিকদের ক্ষেত্রে কী নিয়ম ছিল?
যেসব ব্যক্তির দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে এবং তালিকাভুক্ত ৭৫ দেশের বাইরে অন্য কোনো দেশের বৈধ পাসপোর্ট ছিল, তারা ওই নির্দিষ্ট স্থগিতাদেশের আওতার বাইরে ছিলেন।
এ ছাড়া প্রেসিডেন্সিয়াল প্রোক্লেমেশন ১০৯৯৮-এর আওতায় বিশেষ ছাড় পাওয়া কিছু আবেদনকারীও এই নীতির বাইরে ছিলেন। এর মধ্যে মার্কিন পরিবারগুলোর দত্তক নেওয়া শিশুরাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পর্যটন ও শিক্ষার্থী ভিসায় কি প্রভাব পড়েছিল?
না। এই নির্দিষ্ট স্থগিতাদেশ অভিবাসী ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল। পর্যটক, শিক্ষার্থী কিংবা অস্থায়ী কর্মীদের মতো অ-অভিবাসী ভিসা এই স্থগিতাদেশের আওতায় ছিল না।
ফলে সংশ্লিষ্ট ৭৫ দেশের নাগরিকদের অ-অভিবাসী ভিসার ওপর এই নির্দিষ্ট নীতির সরাসরি প্রভাব পড়েনি।
যে ৭৫ দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা স্থগিত ছিল
স্থগিতাদেশের আওতায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে ছিল—
বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, অ্যান্টিগুয়া ও বার্বুডা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহামা, বার্বাডোস, বেলারুশ, বেলিজ, ভুটান, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, ব্রাজিল, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, কেপ ভার্দে, কলম্বিয়া, কোত দিভোয়ার, কিউবা, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ডোমিনিকা, মিসর, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, ফিজি, গাম্বিয়া, জর্জিয়া, ঘানা, গ্রানাডা, গুয়াতেমালা, গিনি, হাইতি, ইরান, ইরাক, জ্যামাইকা, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, কুয়েত, কিরগিজ প্রজাতন্ত্র, লাওস, লেবানন, লাইবেরিয়া, লিবিয়া, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টিনিগ্রো, মরক্কো, নেপাল, নাইজেরিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া, পাকিস্তান, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, রাশিয়া, রুয়ান্ডা, সেন্ট কিটস ও নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট ও দ্য গ্রেনাডিন্স, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, টোগো, তিউনিশিয়া, উগান্ডা, উরুগুয়ে, উজবেকিস্তান ও ইয়েমেন।
স্থগিতাদেশ উঠে যাওয়ার পর কী পরিবর্তন হলো?
সার্বিকভাবে আদালতের সিদ্ধান্তের ফলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়ায় একটি বড় বাধা দূর হলো। আগে যেখানে আবেদনকারীদের আবেদন ও সাক্ষাৎকারের পরও চূড়ান্ত ভিসা ইস্যু স্থগিত ছিল, এখন সেই নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা আর কার্যকর নেই।
তবে ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা, অভিবাসন আইনের শর্ত, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং মার্কিন কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের জন্য এই সিদ্ধান্ত তাই যুক্তরাষ্ট্রে পরিবারভিত্তিক অভিবাসন, স্থায়ী বসবাস এবং গ্রিন কার্ডের পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে সুযোগ তৈরি করেছে। তবে আবেদনকারীদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত অভিবাসন আইন ও সংশ্লিষ্ট ভিসা কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের ওপর।

