ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

আশির দশকের ছবির ট্রেন্ডে মেতেছে বাংলাদেশ, এআই ব্যবহারে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা

দৈনিক আজ ও আগামীকাল ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬, ০১:১৭ পিএম

আশির দশকের ছবির ট্রেন্ডে মেতেছে বাংলাদেশ, এআই ব্যবহারে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা

ছবিঃ সংগৃহীত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে এখন চোখে পড়ছে আশির দশকের আবহে তৈরি নানা ছবি ও ভিডিও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সাহায্যে নিজেদের বর্তমান ছবিকে চার দশক আগের সময়ের ফ্যাশন, পোশাক, পরিবেশ ও স্টাইলে রূপ দিচ্ছেন অনেকে। কেউ নিজেকে দেখছেন আশির দশকের গ্যাংস্টার লুকে, কেউ সঙ্গীর সঙ্গে তৈরি করছেন পুরোনো দিনের যুগল ছবি। আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বানিয়ে নিচ্ছেন নস্টালজিক পারিবারিক মুহূর্তের ছবি।

দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যেও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই রেট্রো ট্রেন্ড। বিশেষ করে চ্যাটজিপিটিসহ বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহার করে নিজেদের ছবি নতুনভাবে সাজিয়ে ফেসবুকের স্টোরি, রিলস এবং প্রোফাইল ছবিতে ব্যবহার করছেন অনেকেই। কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া পর্যন্ত ছবি, পোশাক, ব্যাকগ্রাউন্ড ও স্টাইলের নির্দেশনা পরিবর্তন করে বারবার চেষ্টা করছেন ব্যবহারকারীরা।

একদিকে এটি মানুষের মধ্যে পুরোনো সময়ের প্রতি আগ্রহ ও নস্টালজিয়া তৈরি করছে, অন্যদিকে ব্যক্তিগত ছবি এআই প্ল্যাটফর্মে আপলোডের কারণে তৈরি হতে পারে নানা ধরনের গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা তাই এই ট্রেন্ড উপভোগের পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।

কেন এত জনপ্রিয় আশির দশকের রেট্রো লুক?

আশির দশকের ফ্যাশন, চুলের স্টাইল, পোশাক, পুরোনো গাড়ি, সিনেমার আবহ কিংবা সেই সময়ের জীবনযাপনের দৃশ্যকে এআইয়ের মাধ্যমে নতুন করে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রযুক্তির সাহায্যে কয়েক দশক আগের পরিবেশে নিজেকে কল্পনা করার সুযোগ পাচ্ছেন ব্যবহারকারীরা।

কারও ছবিকে পুরোনো সিনেমার চরিত্রের মতো দেখানো হচ্ছে, আবার কারও ছবিতে যোগ করা হচ্ছে সেই সময়ের রাস্তা, বাড়িঘর, গাড়ি কিংবা পোশাক। ফলে বাস্তবে আশির দশক না দেখলেও নতুন প্রজন্ম এআইয়ের মাধ্যমে ওই সময়ের একটি কল্পিত অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

অনেকের কাছে এটি নিছক বিনোদন হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় এটি এখন একটি দৃশ্যমান ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে।

ছবি আপলোড করলেই কোথায় যাচ্ছে ব্যক্তিগত তথ্য?

বিশেষজ্ঞদের প্রধান উদ্বেগের জায়গা হলো ব্যক্তিগত ছবি এআই প্ল্যাটফর্মে আপলোড করার পর সেই ছবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ বা ব্যবহার করা হচ্ছে, তা অনেক ব্যবহারকারীরই পরিষ্কারভাবে জানা থাকে না।

একটি ছবি শুধু একজন ব্যক্তির চেহারাই প্রকাশ করে না। ছবির সঙ্গে অবস্থান, সময়, ডিভাইস-সংক্রান্ত তথ্য, গাড়ির নম্বরপ্লেট, বাসা বা কর্মস্থলের পরিচয় কিংবা আশপাশের পরিবেশের মতো তথ্যও যুক্ত থাকতে পারে। এসব তথ্য কোনোভাবে তৃতীয় পক্ষের হাতে গেলে তা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই টুল ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের প্রাইভেসি পলিসি ও ডেটা ব্যবহারের শর্ত সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি।

বায়োমেট্রিক তথ্য ব্যবহারের ঝুঁকি

মুখের ছবি বিশেষভাবে সংবেদনশীল, কারণ এটি একজন ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। এআই কোম্পানিগুলো ছবি প্রক্রিয়াকরণের সময় বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ বা সংরক্ষণ করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।

ব্যক্তিগত ছবি ভবিষ্যতে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে, কতদিন সংরক্ষণ করা হবে কিংবা অন্য কোনো সেবা বা এআই মডেলের উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে কি না—এসব বিষয় ব্যবহারকারীর আগে জেনে নেওয়া উচিত।

বিশেষ করে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব এমন ছবি নির্বিচারে বিভিন্ন অপরিচিত বা তৃতীয় পক্ষের অ্যাপে আপলোড না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

এআই ছবি থেকে তৈরি হতে পারে ডিপফেক ও প্রতারণা

উচ্চ রেজল্যুশনের এআই-নির্মিত ছবি এখন এতটাই বাস্তবসম্মত হতে পারে যে অনেক ক্ষেত্রে আসল ও কৃত্রিম ছবির পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে সাইবার অপরাধীরা।

ব্যক্তির মুখের ছবি সংগ্রহ করে ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট তৈরি, পরিচয় জালিয়াতি কিংবা ডিপফেক ছবি ও ভিডিও তৈরির মতো অপরাধে তা ব্যবহার করা সম্ভব। এসব কনটেন্ট ব্যবহার করে পরিচিতজনদের কাছে প্রতারণামূলক বার্তা পাঠানো বা আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে।

তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ছবি প্রকাশের ক্ষেত্রেও ব্যবহারকারীদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

ছবির মেটাডেটাও হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ

গোপনীয়তার ঝুঁকি শুধু ছবির দৃশ্যমান অংশে সীমাবদ্ধ নয়। ডিজিটাল ছবির সঙ্গে কখনো কখনো অবস্থান, সময়, ডিভাইস বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য যুক্ত থাকতে পারে। এসব তথ্যকে সাধারণভাবে মেটাডেটা বলা হয়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, কোনো ছবি এআই টুলে আপলোড করার আগে প্রয়োজন হলে সংবেদনশীল মেটাডেটা সরিয়ে নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে ছবিতে গাড়ির নম্বরপ্লেট, বাসার ঠিকানা, অফিসের পরিচয়পত্র, শিশুদের স্কুলের তথ্য বা ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সহায়ক অন্য কোনো তথ্য দৃশ্যমান আছে কি না, তা দেখে নেওয়া প্রয়োজন।

অবশ্যই কি এআই রেট্রো ছবি তৈরি করা যাবে না?

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতার অর্থ এই নয় যে এআইয়ের রেট্রো ট্রেন্ড পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে হবে। বরং ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ব্যবহারকারীরা চাইলে কম সংবেদনশীল ছবি ব্যবহার করতে পারেন। ছবি আপলোডের আগে সংশ্লিষ্ট এআই প্ল্যাটফর্ম কীভাবে ব্যবহারকারীর ডেটা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ব্যবহার করে, তা দেখে নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে অপরিচিত বা সন্দেহজনক তৃতীয় পক্ষের অ্যাপে ব্যক্তিগত ছবি আপলোড না করাই নিরাপদ।

‘নিখুঁত’ এআই ছবি নিয়েও মানসিক চাপের আশঙ্কা

এআইয়ের তৈরি ছবিগুলো শুধু গোপনীয়তার ঝুঁকিই তৈরি করছে না; এর সামাজিক ও মানসিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এআইয়ের মাধ্যমে মানুষের চেহারা, ত্বক, শরীর ও পোশাককে প্রায় নিখুঁত করে উপস্থাপন করা সম্ভব।

ফলে ব্যবহারকারীরা বাস্তব জীবনের নিজের চেহারার সঙ্গে এআইয়ের তৈরি ‘নিখুঁত’ সংস্করণের তুলনা করতে পারেন। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এ ধরনের তুলনা আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।

নস্টালজিয়ার সঙ্গে সচেতনতাও জরুরি

সব মিলিয়ে আশির দশকের এআই রেট্রো ট্রেন্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন ধরনের বিনোদন ও সৃজনশীলতার সুযোগ তৈরি করেছে। পুরোনো সময়ের ফ্যাশন ও সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও এটি ভূমিকা রাখছে।

তবে প্রযুক্তির এই আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য, মুখের ছবি ও পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্যের নিরাপত্তা যেন উপেক্ষিত না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। ছবি তৈরির আগে কী তথ্য শেয়ার করা হচ্ছে এবং সেই তথ্য কোথায় যেতে পারে—এই দুটি বিষয় সম্পর্কে সচেতন থাকলেই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!