বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের মৌলিক অধিকার, ন্যায়বিচার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা সুরক্ষায় কার্যকর আইনগত কাঠামো প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। একই সঙ্গে আদালতের রায় তৈরিতে সরাসরি এআই ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেছেন, এআই দিয়ে রায় লেখা অনুচিত। এতে বিচারিক সিদ্ধান্তের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও ন্যায়বিচারের মূলনীতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) এশিয়াটিক সোসাইটি ফর বাংলাদেশের এআই গভর্নেন্স সামার স্কুলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি এসব কথা বলেন।
প্রধান বিচারপতি বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। তবে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি আইনগত, নৈতিক ও মানবিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে এআইয়ের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির মৌলিক অধিকার যাতে ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
এআই ব্যবহারে প্রয়োজন আইনগত কাঠামো
বিচারকদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে এআই ব্যবহারের জন্য একটি সুস্পষ্ট আইনগত ও নীতিগত কাঠামো থাকা প্রয়োজন। প্রযুক্তির ব্যবহার যেন বিচারিক স্বাধীনতা, মানুষের অধিকার এবং আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তার বক্তব্যে উঠে আসে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য বিশ্লেষণ, নথি পর্যালোচনা কিংবা গবেষণার মতো কাজে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু বিচারকের নিজস্ব বিচারবোধ, আইন ব্যাখ্যার ক্ষমতা এবং মামলার পারিপার্শ্বিকতা মূল্যায়নের বিকল্প হিসেবে এআইকে ব্যবহার করা উচিত নয়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এআই দিয়ে রায় লেখা অনুচিত। কারণ কোনো মামলার রায় শুধু তথ্য বা পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে তৈরি হয় না; এর সঙ্গে বিচারকের স্বাধীন বিবেচনা, সাক্ষ্য-প্রমাণের মূল্যায়ন, আইনগত ব্যাখ্যা এবং ন্যায়বিচারের বিষয় জড়িত। ফলে এআইয়ের তৈরি কোনো তথ্য বা বিশ্লেষণ যাচাই ছাড়া বিচারিক সিদ্ধান্তে ব্যবহার করলে ভুল বা অনাকাঙ্ক্ষিত ফল তৈরি হতে পারে।
ভুল তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের ঝুঁকি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারলেও এর তৈরি তথ্য সবসময় নির্ভুল হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। এআই ব্যবস্থায় ভুল তথ্য, অসম্পূর্ণ তথ্য কিংবা পক্ষপাতদুষ্ট ডেটার প্রভাব থাকতে পারে। বিচারিক ক্ষেত্রে এ ধরনের ভুলের প্রভাব একজন ব্যক্তির স্বাধীনতা, সম্পদ, মর্যাদা কিংবা অন্যান্য মৌলিক অধিকারের ওপর পড়তে পারে।
এ কারণে বিচারব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানবিক তদারকি, তথ্য যাচাই, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন প্রধান বিচারপতি।
তিনি বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের কল্যাণে হতে হবে। প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি এর সম্ভাব্য অপব্যবহার এবং নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কেও সতর্ক থাকতে হবে।
দৈনন্দিন জীবনে বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার
বর্তমানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন, গণমাধ্যম, গবেষণা ও আইনসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। তথ্য খোঁজা, নথি তৈরি, অনুবাদ, তথ্য বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা এবং বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদানে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে প্রযুক্তির এই বিস্তারের সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, বৈষম্য, ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়া এবং স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তের দায়বদ্ধতার মতো নতুন নতুন প্রশ্নও সামনে আসছে। এসব বিষয়ে যথাযথ নীতিমালা ও আইন না থাকলে এআইয়ের অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এআই গভর্নেন্সে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি এর ঝুঁকি মোকাবিলায় আইনজীবী, বিচারক, শিক্ষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ, নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও এর প্রভাব নিয়ে বক্তব্য দেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হক। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ডিনসহ আইন, প্রযুক্তি ও এআই গভর্নেন্স সংশ্লিষ্ট বক্তারা বক্তব্য রাখেন।
বক্তারা এআইয়ের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে কার্যকর এআই গভর্নেন্স ব্যবস্থা, নৈতিক নির্দেশনা, তথ্য সুরক্ষা এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
মানবাধিকার সুরক্ষাই হতে হবে এআই ব্যবহারের মূলনীতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে বিচার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত ও দক্ষ করতে সহায়তা করতে পারে। তবে প্রযুক্তিকে মানুষের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করাই নিরাপদ পথ।
প্রধান বিচারপতির বক্তব্যেও সেই বিষয়টিই গুরুত্ব পেয়েছে—এআই যতই উন্নত হোক, মানুষের মৌলিক অধিকার, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের ঊর্ধ্বে প্রযুক্তির অবস্থান হতে পারে না।
বাংলাদেশে এআই ব্যবহারের পরিধি আরও বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর আইনগত ও নৈতিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বিচারব্যবস্থার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারে স্পষ্ট নীতিমালা, মানবিক তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

