ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

এক ছবিতেই শনাক্ত, মুহূর্তে অ্যালার্ট: বিমানবন্দরে এআইয়ের অদৃশ্য নজরদারি

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: আগস্ট ১২, ২০২৬, ১২:২৮ পিএম

এক ছবিতেই শনাক্ত, মুহূর্তে অ্যালার্ট: বিমানবন্দরে এআইয়ের অদৃশ্য নজরদারি

ছবিঃ সংগৃহীত

গুরুতর অপরাধ করে দেশ ছাড়ার চেষ্টা কিংবা বিদেশ থেকে অপরাধ করে দেশে ফেরার ক্ষেত্রে এখন প্রযুক্তির নজর এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে কোনো সন্দেহভাজন বা আসামির ছবি থাকলে তা ব্যবহার করে বিমানবন্দরের নজরদারি ব্যবস্থায় তাকে শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধ মালামাল ও সোনা চোরাচালান ঠেকাতেও যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত সিসিটিভি, ফেসিয়াল রিকগনিশন এবং বিভিন্ন ধরনের উন্নত ডিটেকশন প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে।

তবে প্রযুক্তির সক্ষমতা নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি না করে সংশ্লিষ্টদের মতে, ফেসিয়াল রিকগনিশন মূলত বিদ্যমান ডাটাবেস বা ওয়াচলিস্টের সঙ্গে মুখমণ্ডলের মিল খুঁজে সম্ভাব্য শনাক্তকরণে সহায়তা করে। চূড়ান্তভাবে কাউকে আটক বা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে মানবিক যাচাই ও আইনগত প্রক্রিয়াই অনুসরণ করতে হয়।

এক ছবির সূত্র ধরে নজরদারিতে সন্দেহভাজন

নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কোনো মামলার আসামি বা গুরুতর অপরাধে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তি ভিন্ন পরিচয় ব্যবহার করে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করলে তার ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থার কাছে দেওয়া যেতে পারে।

এরপর নির্দিষ্ট ওয়াচলিস্ট বা শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় তথ্য যুক্ত করা হলে বিমানবন্দরের বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপিত ক্যামেরা সম্ভাব্য মুখের মিল শনাক্ত করতে পারে। কোনো ম্যাচ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কাছে অ্যালার্ট পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

বিমানবন্দরের অ্যারাইভাল ও ডিপার্চার টার্মিনাল, ইমিগ্রেশন এলাকা, বোর্ডিং ব্রিজ, কার্গো ভিলেজসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।

ফলে কোনো ব্যক্তি পরিচয় গোপন করে বা ভিন্ন পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ভ্রমণের চেষ্টা করলে তার গতিবিধি শনাক্ত করার সুযোগ বাড়ছে।

অস্বাভাবিক আচরণ ও পরিত্যক্ত বস্তুও নজরদারিতে

শুধু অপরাধী শনাক্ত করাই নয়, আধুনিক এআই-ভিত্তিক ভিডিও অ্যানালিটিকস ব্যবস্থার মাধ্যমে বিমানবন্দরের অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ড শনাক্ত করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কোনো নির্দিষ্ট স্থানে দীর্ঘ সময় অস্বাভাবিকভাবে অবস্থান, সন্দেহজনক চলাচল কিংবা কোনো পরিত্যক্ত ব্যাগ বা বস্তু পড়ে থাকার মতো ঘটনা শনাক্ত হলে নিরাপত্তাকর্মীদের সতর্ক করার সক্ষমতা এসব ব্যবস্থার রয়েছে।

বিমানবন্দরের মতো উচ্চঝুঁকির স্থাপনায় এ ধরনের প্রযুক্তি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নজরদারি সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোনা চোরাচালান ঠেকাতে বাড়ছে প্রযুক্তির ব্যবহার

দেশের বিমানবন্দরগুলোতে সোনা চোরাচালান দীর্ঘদিনের বড় সমস্যা। চোরাকারবারিরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে কখনো লাগেজের ভেতরে, কখনো পোশাকের আড়ালে আবার কখনো শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্বর্ণ লুকিয়ে পাচারের চেষ্টা করে থাকে।

এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে প্রচলিত নিরাপত্তা তল্লাশির পাশাপাশি আধুনিক এক্স-রে স্ক্যানিং, ধাতু শনাক্তকরণ এবং অন্যান্য বিশেষায়িত ডিটেকশন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

শাহজালাল বিমানবন্দরে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারের ফলে চোরাচালান শনাক্ত ও প্রতিরোধে সক্ষমতা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক যাচাইও গুরুত্বপূর্ণ

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই বা ফেসিয়াল রিকগনিশন কোনো ব্যক্তিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করে না। প্রযুক্তি মূলত সম্ভাব্য মিল বা সন্দেহজনক পরিস্থিতি শনাক্ত করে নিরাপত্তাকর্মীদের সতর্ক করে।

এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, পাসপোর্ট, ভ্রমণসংক্রান্ত তথ্য, মামলার নথি ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির পাশাপাশি তথ্যের নির্ভুলতা, ওয়াচলিস্টের নিয়মিত হালনাগাদ এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

‘অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সাফল্য’

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর আসিফ ইকবাল বলেন, বিমানবন্দরে কর্মরত সরকারি সংস্থাগুলো নিজ নিজ ব্যবস্থাপনায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। পাশাপাশি বেবিচকের নিজস্ব এভিয়েশন সিকিউরিটিও সতর্ক রয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের ব্যবহার বাড়ানোর ফলে গত কয়েক বছরে অপরাধ ও চোরাচালান প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ বলেন, অপরাধী ও চোরাকারবারীদের শনাক্ত করতে বিমানবন্দরে নিয়োজিত সংস্থাগুলো হাইটেক সরঞ্জামের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

দেশের অন্যান্য কেপিআইতেও প্রযুক্তি বিস্তারের দাবি

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ রাসেল সরকার মনে করেন, অপরাধীরা প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে আগের তুলনায় বেশি সচেতন হওয়ায় বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সময়ের দাবি।

তার মতে, দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনাতেও এ ধরনের প্রযুক্তি ধীরে ধীরে বিস্তৃত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে তথ্য সুরক্ষা ও যথাযথ আইনি কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।

নিরাপত্তায় নতুন মাত্রা, সামনে আরও চ্যালেঞ্জ

দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা এখন জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধী, মানবপাচারকারী, মাদক ও স্বর্ণ চোরাকারবারি এবং বিভিন্ন মামলার পলাতক আসামিদের চলাচল ঠেকাতে প্রযুক্তির ব্যবহার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে শুধু ক্যামেরা বা ডিটেকশন প্রযুক্তি স্থাপন করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। এসব প্রযুক্তির তথ্য বিশ্লেষণ, ওয়াচলিস্ট হালনাগাদ, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত ও সংশোধনের সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, মানবিক দক্ষতা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। এতে একদিকে পলাতক আসামি শনাক্তকরণ সহজ হবে, অন্যদিকে চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতাও বাড়বে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!