চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকির উদ্দেশ্যে পণ্য আমদানির প্রবণতা বেড়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মিথ্যা ঘোষণা সন্দেহে ৪৬৭টি আমদানি চালান জব্দ করেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। এসব ঘটনায় ২৭০টি মামলা করা হয়েছে। জব্দ করা চালানগুলোর অনিয়ম শনাক্তের পর রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ আদায় হয়েছে ৫৮ কোটি ২ লাখ টাকা।
কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জব্দ করা চালানের সংখ্যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে মামলা এবং রাজস্ব-জরিমানা আদায়ের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, শুল্ক কম দিতে আমদানিকারকদের একটি অংশ পণ্যের প্রকৃত পরিচয়, পরিমাণ কিংবা মূল্য গোপন করে নতুন নতুন কৌশলে পণ্য খালাসের চেষ্টা করছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অডিট, ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ (এআইআর) শাখার তৎপরতায় এসব অনিয়ম শনাক্ত হচ্ছে। তবে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির প্রবণতা বাড়তে থাকায় বন্দরে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
তিন মাসে জব্দ ৪৬৭ চালান, মামলা ২৭০টি
কাস্টমসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাস জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৪৬৭টি আমদানি চালান জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ২৭০টি মামলা হয়েছে। রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ আদায় হয়েছে ৫৮ কোটি ২ লাখ টাকা।
এর আগের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে ৩৬১টি চালান জব্দ করে ১৯৯টি মামলা করা হয়েছিল। তখন রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ আদায়ের পরিমাণ ছিল ৩১ কোটি ৭ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ১৬৭টি চালান জব্দ এবং ২২৮টি মামলা করেছিল কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। ওই সময়ে রাজস্ব ও জরিমানা বাবদ আদায় হয়েছিল ২৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
তিন অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জব্দ হওয়া চালানের সংখ্যা ছিল ১৬৭টি। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬১টিতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই জব্দ করা হয়েছে ৪৬৭টি চালান। অর্থাৎ, দুই বছরের ব্যবধানে মিথ্যা ঘোষণা সন্দেহে জব্দ করা চালানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
শুধু সেপ্টেম্বরেই ৮৪ চালানে অনিয়ম
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্র জানায়, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মোট ১৬৮টি আমদানি চালান জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ১৩৯টি চালানে শতভাগ কায়িক পরীক্ষা চালানো হয়। পরীক্ষায় ৫৫টি চালানে ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের মিল পাওয়া গেলেও বাকি ৮৪টি চালানে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম শনাক্ত হয়।
কায়িক পরীক্ষায় ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে বাস্তবে আমদানি করা পণ্যের অমিল, পণ্যের পরিমাণ ও মূল্যসংক্রান্ত অসংগতি এবং শুল্ক নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন তথ্য সামনে আসে। এসব অনিয়মের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার ও মুখপাত্র মোহাম্মদ শরীফ আল আমিন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি বেড়েছে। এ কারণে এ ধরনের চালান শনাক্ত করতে তদারকি জোরদার করা হয়েছে।
এক বছরে রাজস্ব ও জরিমানা আদায় ১১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা
কাস্টমস সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এআইআর শাখা মোট ১ হাজার ৪৫১টি আমদানি চালান জব্দ করে। এর মধ্যে ৮৪৩টি চালানে অনিয়ম শনাক্ত হওয়ায় মামলা করা হয়।
ওই অর্থবছরে এসব ঘটনায় ৫২ কোটি ৮ লাখ টাকা রাজস্ব এবং ৫৯ কোটি ৬৩ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা শনাক্ত করে কাস্টমসের অভিযান থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আদায় হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে এ ধরনের অনিয়মের ঘটনা অব্যাহত থাকায় আমদানি পর্যায়ে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
যেসব কৌশলে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা
কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কয়েকটি কৌশল বেশি ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ভুল ট্যারিফ ক্লাসিফিকেশন, পণ্যের প্রকৃত পরিমাণ ও মূল্য কম দেখানো এবং কম শুল্কের পণ্যের ঘোষণার আড়ালে বেশি শুল্কযুক্ত পণ্য আমদানি।
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরে যেসব অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—
স্ক্র্যাপ ঘোষণায় যন্ত্রপাতি ও বিলাসবহুল গাড়ি: স্ক্র্যাপ বা পরিত্যক্ত পণ্যের ঘোষণা দিয়ে এর আড়ালে মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির চেষ্টা।
মডেলিং ক্লের ঘোষণায় প্রসাধনসামগ্রী: কম শুল্কের পণ্য হিসেবে ঘোষণা দিয়ে প্রকৃতপক্ষে প্রসাধনসামগ্রী আমদানি।
অন্য পণ্যের আড়ালে মোবাইল ফোন: ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে মোবাইল ফোন লুকিয়ে এনে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা।
ভুল ঘোষণায় কাপড় আমদানি: কাপড়ের ধরন, পরিমাণ কিংবা শ্রেণিবিন্যাসে অসংগতি দেখিয়ে কম শুল্ক দেওয়ার চেষ্টা।
কর্মকর্তাদের মতে, এসব কৌশলের মাধ্যমে আমদানিকারকেরা প্রকৃত শুল্কের তুলনায় কম অর্থ পরিশোধ করে পণ্য খালাসের চেষ্টা করেন। ফলে সরকার রাজস্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে। একই সঙ্গে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনাকারী আমদানিকারকেরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন।
সংঘবদ্ধ চক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক ও চট্টগ্রাম কাস্টম অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য মো. ইসমাইল খান বলেন, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির পেছনে কখনো কখনো সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকে। ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে শুল্ক ফাঁকির চেষ্টা করা আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, অনিয়ম ঠেকাতে অতিরিক্ত কড়াকড়ি করতে গিয়ে যেন বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। আমদানি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনাকারীদের জন্য স্বাভাবিক পণ্য খালাসের পরিবেশ বজায় রাখাও জরুরি।
ডিজিটাল নজরদারি ও গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার
মোহাম্মদ শরীফ আল আমিন জানান, মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি প্রতিরোধে কাস্টমস বিভাগ ডিজিটাল পদ্ধতিতে নজরদারি বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ও জোরদার করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের এআইআর শাখার পাশাপাশি শুল্ক গোয়েন্দা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা ইউনিটও এ ধরনের চালান শনাক্তে কাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধে শুধু চালান জব্দ বা জরিমানা আদায়ই যথেষ্ট নয়। এর পেছনে জড়িত আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং সংঘবদ্ধ চক্রের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ চালান শনাক্তে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা নজরদারি এবং আন্তসংস্থার সমন্বয় বাড়ানো গেলে রাজস্ব ফাঁকি কমানো সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। এ বন্দরের মাধ্যমে পণ্য আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা ও শুল্ক ফাঁকির প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সরকারের রাজস্ব আদায় যেমন বাধাগ্রস্ত হবে, তেমনি বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

