জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর-সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যদের আয়, হিসাব ও সম্পদের বিবরণী প্রকাশ নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান ও জবাবদিহিতামূলক উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি।
কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানো, কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে এ সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে করদাতাদের তথ্য যাচাই ও সম্পদের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে ব্যাংক, জাতীয় পরিচয়পত্র, ভূমি, বিআরটিএ ও সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন সরকারি তথ্যভাণ্ডারকে এনবিআরের ডেটাবেইজের সঙ্গে যুক্ত করার সুপারিশ করেছে কমিটি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকের কার্যবিবরণীতে এসব সুপারিশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রোববার অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে দ্বিতীয় বৈঠকের ওই কার্যবিবরণী অনুমোদন দেওয়া হয়।
এনবিআর কর্মকর্তা ও পরিবারের সম্পদের হিসাব চায় কমিটি
গত ২৩ আগস্ট সংসদ ভবনে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশের রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, এনবিআরের সাংগঠনিক কাঠামো এবং কর্মনীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে কমিটির সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এনবিআরের কর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, এনবিআর চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের নিজস্ব ও পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব ও সম্পদ বিবরণী ঘোষণার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার প্রস্তাব দেন।
আলোচনায় তিনি কর ফাঁকি রোধের পাশাপাশি কর প্রশাসনের ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। পরে বিষয়টি কমিটির সুপারিশ হিসেবে কার্যবিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
কমিটির মতে, কর প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে কর ব্যবস্থাপনায় জনগণের আস্থা বাড়বে এবং সম্ভাব্য অনিয়ম বা স্বার্থের সংঘাত শনাক্ত করাও সহজ হবে।
‘দৃশ্যমান ও জবাবদিহিতামূলক উদ্যোগ’ নেওয়ার সুপারিশ
কমিটির সুপারিশে শুধু সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার কথা বলা হয়নি; বরং এ বিষয়ে ‘দৃশ্যমান ও জবাবদিহিতামূলক উদ্যোগ’ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদ বিবরণী ঘোষণার ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও নজরদারির আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
কর প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আয় ও সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হলে অবৈধ সম্পদ অর্জন কিংবা আয় গোপনের মতো অনিয়ম শনাক্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বাড়তে পারে।
রাজস্ব বাড়াতে ডিজিটাল ব্যবস্থায় জোর
স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান বৈঠকের পর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছিলেন, বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি এনবিআরের ডিজিটাল ব্যবস্থা সম্প্রসারণে জোর দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে হবে। তা না হলে সরকারের ব্যয় নির্বাহে বাইরের উৎসের ওপর নির্ভরতা থাকবে। এনবিআরকে নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কার্যকরভাবে কাজ করতে হবে।
ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রসারের ফলে করদাতা ও এনবিআর কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগ কমানো সম্ভব হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অনলাইনে করসেবা বাড়লে কমবে সরাসরি যোগাযোগ
কমিটির আলোচনায় কর ব্যবস্থাপনায় ডিজিটালাইজেশনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনলাইনে কর প্রদান এবং আয়কর রিটার্ন জমার সুযোগ যত বাড়বে, করদাতাদের এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তত কমবে বলে মনে করছে কমিটি।
এর ফলে একদিকে করদাতাদের জন্য সেবা গ্রহণ সহজ হবে, অন্যদিকে কর প্রশাসনে অনিয়ম ও দুর্নীতির সম্ভাব্য সুযোগও কমানো সম্ভব হবে।
বিশেষ করে কর নির্ধারণ, রিটার্ন যাচাই, নথি জমা, কর পরিশোধ ও বিভিন্ন অনুমোদন প্রক্রিয়া যত বেশি স্বয়ংক্রিয় হবে, ততই ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ কমবে বলে সংশ্লিষ্টদের মত।
কর-জিডিপি অনুপাত এখন ৬ দশমিক ৮ শতাংশ
স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এনবিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
এ অনুপাত ২০২৬ সালে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ, মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই অনুপাতে কর আহরণ না বাড়লে সরকারের উন্নয়ন ও জনসেবা খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণে নতুন করদাতা শনাক্ত, করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি কমানো এবং বিদ্যমান করদাতাদের কাছ থেকে কার্যকরভাবে রাজস্ব সংগ্রহের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
রাজস্ব আদায়ে ‘থ্রি-আর’ কৌশল
রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বাড়াতে বৈঠকে এনবিআরের পক্ষ থেকে ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’ বা ‘থ্রি-আর’ কৌশল গ্রহণের কথা জানানো হয়।
এই কৌশলের মাধ্যমে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান দুর্বলতা কাটিয়ে সক্ষমতা পুনরুদ্ধার, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়।
একই সঙ্গে পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও বাজেট প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্নির্ধারণের বিষয়েও আলোচনা হয়।
এক ডেটাবেইজে ব্যাংক, এনআইডি ও ভূমির তথ্য
কর ফাঁকি শনাক্ত এবং করদাতাদের প্রকৃত আয় ও সম্পদের চিত্র বের করতে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য এক প্ল্যাটফর্মে আনার সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি।
কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, ব্যাংক, জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি, ভূমি, বিআরটিএ, সঞ্চয়পত্রসহ বিভিন্ন উৎসের তথ্য এপিআইয়ের মাধ্যমে এনবিআরের ডেটাবেইজের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
এর ফলে একজন করদাতার আয়, সম্পদ, ব্যাংক লেনদেন, জমি বা অন্যান্য সম্পদের তথ্য বিভিন্ন উৎস থেকে মিলিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা চালু হলে করদাতার ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের কোনো অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা তুলনামূলক সহজ হবে।
করদাতা শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের প্রস্তাব
কর প্রশাসনে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারেরও সুপারিশ করেছে কমিটি।
সমন্বিত তথ্যভাণ্ডারের ওপর ভিত্তি করে সম্ভাব্য করদাতা শনাক্ত এবং তাদের আয় ও সম্পদের প্রোফাইলিং করার উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা কার্যকর হলে করের আওতার বাইরে থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চিহ্নিত করা এবং তাদের কর ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি, আয় ও সম্পদের অসামঞ্জস্য কিংবা কর বিবরণীতে তথ্য গোপনের সম্ভাব্য ঘটনাগুলোও ঝুঁকি বিশ্লেষণের মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
‘অ্যান্ড-টু-অ্যান্ড’ অটোমেশনের ওপর গুরুত্ব
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে সমন্বিত ডেটাবেইজ তৈরির পাশাপাশি অ্যান্ড-টু-অ্যান্ড অটোমেশন চালুর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।
অর্থাৎ করদাতা শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে কর নির্ধারণ, রিটার্ন দাখিল, তথ্য যাচাই, কর পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় পরবর্তী কার্যক্রম পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর করার লক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে।
কমিটির মতে, এতে কর ব্যবস্থাপনায় মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমবে এবং একই সঙ্গে সেবা প্রদানের গতি ও স্বচ্ছতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
নিয়মিত করদাতারা যেন হয়রানির শিকার না হন
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পাশাপাশি নিয়মিত করদাতাদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়েছে সংসদীয় কমিটি।
কমিটি বলেছে, কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে কাজ করতে হবে। তবে নিয়মিত করদাতারা যাতে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি বা জটিলতার মুখে না পড়েন, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
কারণ করের আওতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একদিকে নতুন করদাতা শনাক্ত করা যেমন জরুরি, অন্যদিকে যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন তাদের জন্য সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ নিশ্চিত করার সুপারিশ, সরকারি বিভিন্ন তথ্যভাণ্ডারকে একীভূত করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং অ্যান্ড-টু-এন্ড অটোমেশনের উদ্যোগ—সব মিলিয়ে কর প্রশাসনে কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি দিক নির্দেশ করছে সংসদীয় কমিটির সুপারিশগুলো।
বিশেষ করে কর প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ ও পরিবারের সম্পদের হিসাব ঘোষণার বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন গড়ে উঠলে করদাতা ও কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে সেবা সহজ করা এবং দুর্নীতির সুযোগ সংকুচিত করার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
তবে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর নীতিমালা, তথ্যের নিরাপত্তা, আন্তঃসংস্থার সমন্বয় এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি করদাতার আস্থা ও কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারলেই এসব উদ্যোগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া সম্ভব হবে।

