রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজকে ঘিরে মহাখালী এলাকায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশীয় অস্ত্র হাতে কয়েকজন তরুণের ছবি ছড়িয়ে পড়ায় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশের সঙ্গে স্থানীয় যুবকদের বিরোধের জেরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর অস্ত্র হাতে তোলা ছবিটি সামনে আসায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দেশীয় অস্ত্রের উপস্থিতির অভিযোগ কীভাবে তৈরি হলো, কারা এসব অস্ত্র বহন করেছে এবং ঘটনার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
শিক্ষার্থীকে হেনস্থার অভিযোগ, এরপর উত্তেজনা
ঘটনার সূত্রপাত গত রবিবার রাতে। রাজধানীর মহাখালী ওয়্যারলেস গেট এলাকায় সরকারি তিতুমীর কলেজের এক শিক্ষার্থীকে স্থানীয় কয়েকজন যুবক হেনস্থা করেছেন—এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে।
খবরটি কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে কয়েকজন শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান। একপর্যায়ে স্থানীয় যুবকদের সঙ্গে তাদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়।
এ ঘটনায় মহাখালী এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা উত্তেজনার কারণে ওই এলাকায় যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।
অস্ত্র হাতে ছবি ছড়িয়ে পড়ায় নতুন প্রশ্ন
ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
ভাইরাল হওয়া ছবিতে কয়েকজন তরুণের হাতে রামদা ও লাঠিসোটার মতো দেশীয় অস্ত্র দেখা যায়। ছবিটির সঙ্গে দেওয়া ক্যাপশনে লেখা ছিল—‘তিতুমীরের শিক্ষার্থীদের প্রশ্নে আমরা আপোষহীন।’
ছবিটি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ফেসবুক গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। মহাখালীভিত্তিক একটি ফেসবুক গ্রুপে ছবিটি শেয়ার করে প্রশ্ন তোলা হয়—‘শিক্ষার্থীর নামে দেশীয় অস্ত্র হাতে এরা কারা?’
তবে ছবিতে থাকা ব্যক্তিরা কারা, তারা তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী কি না এবং ছবিটি ঠিক কখন বা কোথায় তোলা হয়েছে—এসব বিষয়ে এখনো পুলিশের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
শিক্ষার্থীদের একাংশের প্রতিক্রিয়া নিয়েও আলোচনা
ছবিটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের মন্তব্য দেখা গেছে। সাধারণ ব্যবহারকারীদের কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে অস্ত্র থাকার অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আবার কেউ কেউ দাবি করেছেন, শিক্ষার্থীর ওপর হামলা বা হেনস্থার ঘটনা ঘটলে তার প্রতিক্রিয়াও তৈরি হতে পারে।
ভাইরাল পোস্টের মন্তব্যে তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেওয়া আবির রহমান লিখেছেন, ‘আমার ক্যাম্পাসের ভাইকে মারলে আমি যাব না? আসেন আপনাকে আমরা অযথা মারি, পরে দেখি আপনার ভাই, বন্ধু বা পরিবারের মানুষ কেমন রিয়্যাকশন দেয়।’
তার এই মন্তব্য নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। তবে একটি ব্যক্তিগত মন্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দিয়ে পুরো শিক্ষার্থীসমাজের অবস্থান নির্ধারণ করা যায় না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্যাম্পাসে অস্ত্র কীভাবে আসে, প্রশ্ন অভিভাবকদের
ঘটনার পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে বা শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল, মেস কিংবা অন্যান্য অবস্থানস্থলে দেশীয় অস্ত্র পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে কীভাবে।
অভিভাবকদের অনেকে মনে করছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে শুধু ঘটনার পর পুলিশ মোতায়েন করাই যথেষ্ট নয়; ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় নিয়মিত নজরদারি এবং বহিরাগতদের চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কোনো শিক্ষার্থী বা বহিরাগত অস্ত্র বহন বা ব্যবহার করলে প্রমাণের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
পুলিশের নজরদারি বাড়ানোর কথা
বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম বলেন, রবিবার রাতের ঘটনার খবর পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অস্ত্র হাতে ছবিটির বিষয়টিও পুলিশের নজরে এসেছে বলে জানান তিনি। ছবিতে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
ওসি বলেন, ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
তদন্তের কথা জানিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ
সরকারি তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. ছদরুদ্দীন আহমদ বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা কলেজ কর্তৃপক্ষের প্রধান অগ্রাধিকার। তবে কোনো অবস্থাতেই অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়া সমর্থনযোগ্য নয়।
তিনি জানান, রবিবারের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবির বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য একটি অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
ঘটনার পেছনে বহিরাগত কারও ভূমিকা রয়েছে কি না এবং কেউ শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করছে কি না—সেটিও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান তিনি।
নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবি
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সংঘাত, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া কিংবা অস্ত্র প্রদর্শনের মতো ঘটনা শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে ব্যাহত করতে পারে। ফলে ঘটনার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা এবং জড়িতদের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষাবিদদের মতে, কোনো বিরোধ বা হেনস্থার অভিযোগ থাকলেও তার সমাধান আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মাধ্যমে হতে পারে না। ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহনশীলতা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং আইন মেনে চলার পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।
এদিকে পুলিশ ও কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তদন্তের কথা জানানো হয়েছে। ফলে ভাইরাল ছবির সত্যতা, ছবিতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয়, অস্ত্রের উৎস এবং রবিবার রাতের সংঘর্ষের সঙ্গে তাদের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই স্পষ্ট হবে।

