সচিবালয়ে দর্শনার্থীদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অতিরিক্ত দর্শনার্থীর ভিড়, বিভিন্ন ধরনের তদবির এবং অনুমোদনহীন ব্যক্তিদের অবাধ যাতায়াতের কারণে সরকারি দাপ্তরিক কাজে বিঘ্ন ঘটছে—এমন পরিস্থিতিতে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে নতুন করে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রোববার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সচিবালয়ের নিরাপত্তা ও দর্শনার্থী প্রবেশব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে সচিবালয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রে অনুমোদন যাচাই, গাড়িতে তল্লাশি এবং অননুমোদিত ব্যক্তিদের প্রবেশ ঠেকাতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে পৃথক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নজরে সচিবালয়ে অতিরিক্ত ভিড়
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সচিবালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, সাবেক আমলা, চাকরিপ্রার্থী, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং সাধারণ দর্শনার্থীর উপস্থিতি বেড়েছে।
তাদের অনেকেই চাকরি, বদলি, পদোন্নতি, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, বিভিন্ন সরকারি সুবিধা, স্থানীয় প্রকল্প কিংবা ইজারা পাওয়ার মতো নানা বিষয়ে তদবির করতে মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে আসছেন।
দর্শনার্থীদের এই বাড়তি চাপের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরেও এসেছে বলে সূত্র জানিয়েছে। বিষয়টি পর্যালোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবকে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
‘যৌক্তিক কারণে’ প্রবেশে আপত্তি নেই
বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব নাসিমুল গণি জানান, সচিবালয়ে দর্শনার্থীর আধিক্যের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এসেছে। অতিরিক্ত মানুষের যাতায়াতে মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের নিয়মিত দাপ্তরিক কাজে ব্যাঘাত ঘটছে।
তবে যৌক্তিক কারণে সভা, সেমিনার বা নির্ধারিত সরকারি কাজে সচিবালয়ে আসার ক্ষেত্রে আপত্তি নেই বলেও প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান তুলে ধরা হয়।
বৈঠকে একজন সচিব প্রশ্ন তোলেন, সচিবালয়ে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ কেন আসছেন এবং তারা কী উদ্দেশ্যে আসছেন—এ বিষয়েও প্রধানমন্ত্রী জানতে চেয়েছেন। পরে বিষয়টি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
গাড়ি প্রবেশেও কঠোর নিরাপত্তা
সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৈঠকে পুলিশকে একাধিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো গাড়িতে অননুমোদিত ব্যক্তি থাকলে তাকে সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া যাবে না। প্রতিটি গাড়ি ভালোভাবে তল্লাশি করার পরই প্রবেশের অনুমতি দিতে হবে।
রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, সংসদ সদস্য কিংবা সরকারি কর্মকর্তা—পরিচয় যা-ই হোক, প্রয়োজনীয় পাস বা অনুমোদন ছাড়া কাউকে গাড়িতে করে সচিবালয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না বলে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) জানান, পুলিশের কোনো সদস্য অনৈতিকভাবে কাউকে সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছেন—এমন তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে বসতে পারে পৃথক প্রবেশ মেশিন
সচিবালয়ের প্রবেশব্যবস্থাকে আরও নিয়ন্ত্রিত করতে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে পৃথক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ মেশিন বসানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে একজন দর্শনার্থী যে মন্ত্রণালয়ে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছেন, তার বাইরে অন্য মন্ত্রণালয়ে অবাধে যাতায়াতের সুযোগ সীমিত করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর হলে দর্শনার্থীদের গতিবিধি নজরদারি করা সহজ হবে এবং অপ্রয়োজনীয় তদবিরকারীদের আনাগোনাও কমানো সম্ভব হতে পারে।
গেটে গেটে কড়া পাহারা
বৈঠকের পরপরই সচিবালয় এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে দেখা গেছে। বিভিন্ন প্রবেশপথে অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থানে ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
সচিবালয়ে প্রবেশের সময় গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। পাস ও অনুমোদনের বিষয়েও যাচাই করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত পাঁচ মাসে অনিয়মের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সচিবালয়ে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে ১৫ জন পুলিশ সদস্যকে বদলি ও শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ে সার ডিলারশিপ ঘিরে তদবিরের চাপ
বর্তমানে সচিবালয়ে দর্শনার্থীদের একটি বড় অংশের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়ে। নতুন সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে সেখানে তদবিরকারীদের চাপ বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সরকারদলীয় নেতা-কর্মী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনেকে ডিলারশিপ পাওয়ার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংসদ সদস্যদেরও নিয়মিত কৃষি মন্ত্রণালয়ে যাতায়াত করতে দেখা যাচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে বিপুলসংখ্যক সংসদ সদস্য মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। গত কয়েকটি কর্মদিবসে মন্ত্রীর ওয়েটিং রুমের পাশাপাশি করিডরেও অসংখ্য মানুষের উপস্থিতি দেখা গেছে।
প্রতি ইউনিয়নে একজন সার ডিলার
প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতি ইউনিয়নের জন্য তিনজন যোগ্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করেছে উপজেলা পর্যায়ের কমিটি। পরে এসব তথ্য জেলা পর্যায় হয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিটি ইউনিয়নে ওই তালিকা থেকে একজনকে চূড়ান্তভাবে ডিলার হিসেবে নির্বাচন করবে মন্ত্রণালয়।
কৃষিসচিব মো. সেলিম খান জানিয়েছেন, এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সার ডিলারশিপ চূড়ান্ত হতে পারে। তবে ডিলারশিপ নিয়ে তদবিরের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে স্বাস্থ্য—সবখানেই তদবির
শুধু কৃষি মন্ত্রণালয় নয়, সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়েই এখন নানা ধরনের তদবির নিয়ে মানুষের উপস্থিতি বাড়ছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের একটি অংশ মামলা থেকে নিজেদের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়ে তদবির করতে যাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দ ও পছন্দের প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) পাওয়ার জন্য তদবিরের চাপ রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদায়ন ও অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয় ঘিরে উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিকিৎসকদের অনেকে পছন্দের হাসপাতাল বা ঢাকায় পদায়নের জন্য তদবির করছেন।
ফলে মন্ত্রী, সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়মিত দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তদবির সামলাতে হচ্ছে।
সরকারি কাজে গতিশীলতা ফেরাতেই প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ
সচিবালয় সরকারের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রীয় স্থান। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, সচিবসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা সেখানে নিয়মিত দাপ্তরিক কাজ করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অতিরিক্ত দর্শনার্থী এবং অনিয়ন্ত্রিত তদবিরের চাপ বাড়লে মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সময়ের অপচয় হয়। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও ফাইল নিষ্পত্তির কাজেও বিঘ্ন ঘটতে পারে।
এ কারণে নিরাপত্তার পাশাপাশি সরকারি কাজে গতি ও শৃঙ্খলা ফেরানোও দর্শনার্থী প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
‘তদবিরবাজদের নিয়ন্ত্রণে হার্ডলাইন প্রয়োজন’
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, সব সরকারের সময়ই তদবিরকারীদের তৎপরতা দেখা যায়। অনেকেই সকালে সচিবালয়ে এসে একের পর এক মন্ত্রণালয় ঘুরে বেড়ান।
তার মতে, সরকার এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিলে এবং প্রবেশব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে সচিবালয়ে অপ্রয়োজনীয় ভিড় ও তদবিরের প্রবণতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
প্রবেশে কড়াকড়ির পাশাপাশি দরকার স্বচ্ছ সেবা ব্যবস্থা
সচিবালয়ে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্তকে সরকারি কাজে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখা হলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়ন ব্যবস্থার ওপর।
যৌক্তিক প্রয়োজনে যারা সচিবালয়ে আসবেন, তাদের জন্য স্বচ্ছ ও সহজ অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা প্রবেশব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে একদিকে নিরাপত্তা বজায় রাখা সম্ভব হবে, অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকদের বৈধ সরকারি সেবা পাওয়ার পথও বাধাগ্রস্ত হবে না।
বিশেষ করে ডিজিটাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট, নির্দিষ্ট সাক্ষাৎ সময়, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক প্রবেশ অনুমতি এবং দর্শনার্থীর গতিবিধি নথিভুক্ত করার মতো ব্যবস্থা চালু হলে সচিবালয়ের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা—দুই দিকেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হতে পারে।
সরকারি দপ্তরে তদবিরের চাপ কমিয়ে মন্ত্রণালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম গতিশীল করাই এখন নতুন সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য। এ সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে সচিবালয়ে দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে কি না।

