ঢাকা বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

কারাগারে বন্দীর চাপ, চিকিৎসক-অ্যাম্বুলেন্স সংকট: প্রায় ৬ বছরে মৃত্যু ১,২৩৫

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ০৯:৪৭ এএম

কারাগারে বন্দীর চাপ, চিকিৎসক-অ্যাম্বুলেন্স সংকট: প্রায় ৬ বছরে মৃত্যু ১,২৩৫

ছবিঃ সংগৃহীত

কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই একের পর এক বন্দীর মৃত্যু হচ্ছে। আবার হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও মারা যাচ্ছেন অনেকে। উদ্বেগের বিষয়, তাদের একটি অংশের বয়সও খুব বেশি নয়। ফলে কারাবন্দীদের অকালমৃত্যু, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং জরুরি রোগী স্থানান্তর ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

কারা অধিদপ্তর ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর নয় মাসে দেশের কারাগারগুলোতে ১ হাজার ২৩৫ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা গেছেন অন্তত ৩০০ জন।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাতেও হাসপাতালে নেওয়ার পথে এক বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। মৃত বন্দীর নাম আবু তাহের (৩৪)। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক গোলাম ফারুকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-২ থেকে অসুস্থ অবস্থায় রাত সোয়া ৯টার দিকে আবু তাহেরকে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।

কারা অধিদপ্তরের জানুয়ারি-আগস্টের হিসাব এবং সেপ্টেম্বরের সংবাদ প্রতিবেদনভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের শুরু থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় নয় মাসে অন্তত ২৫১ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ চলতি বছরে মাসে গড়ে প্রায় ২৮ জন বন্দী মারা গেছেন। বিপরীতে ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৬৯ মাসের হিসাবে মাসিক গড় মৃত্যু প্রায় ১৮ জন।

এই হিসাবে চলতি বছর বন্দী মৃত্যুর হার আগের সামগ্রিক গড়ের তুলনায় বেশি।

‘ব্রট ইন ডেড’ নিয়ে কারা অধিদপ্তরের উদ্বেগ

কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে বন্দীর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে খোদ কারা অধিদপ্তর।

গত ২৫ জানুয়ারি দেশের সব জেল সুপারকে পাঠানো এক চিঠিতে কারা অধিদপ্তর জানায়, বিভিন্ন কারাগারে ‘ব্রট ইন ডেড’—অর্থাৎ হাসপাতালে নেওয়ার সময় বা হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই বন্দীকে মৃত অবস্থায় পাওয়ার ঘটনা—আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরেও এসেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

চিঠিতে এ ধরনের মৃত্যু কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

তবে এরপরও হাসপাতালে নেওয়ার পথে বন্দীর মৃত্যুর ঘটনা থামেনি। ফলে জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা, রোগী শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, দ্রুত স্থানান্তর এবং অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

কারাগারে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দী

বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে বন্দীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি।

দেশে মোট ৭৫টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি কেন্দ্রীয় এবং ৬০টি জেলা কারাগার। এসব কারাগারের মোট ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন।

অন্যদিকে কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে বন্দীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার।

অর্থাৎ কারাগারের নির্ধারিত ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দীর সংখ্যা দুই গুণেরও বেশি।

সাধারণ সময়ে দেশের কারাগারগুলোতে প্রায় ৮০ থেকে ৮২ হাজার বন্দী থাকেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এ সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। এর ফলে একই জায়গায় অতিরিক্ত বন্দী রাখার পাশাপাশি চিকিৎসা, খাবার, আবাসন, স্যানিটেশন এবং নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই চাপ বেড়েছে।

কারা অধিদপ্তরের ঘোষিত মিশনের মধ্যে রয়েছে বন্দীদের নিরাপদ আটক, কারাগারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, মানবিক আচরণ, যথাযথ বাসস্থান, খাদ্য ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং সমাজে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ দেওয়া।

কিন্তু ধারণক্ষমতার প্রায় আড়াই গুণ বন্দী থাকলে এসব সেবা বাস্তবে কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে বন্দীর সংখ্যা

ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশের কারাগারে বন্দী ছিলেন প্রায় ৬৫ হাজার ৬৬২ জন। এরপর বিভিন্ন সময়ে বন্দীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ২০২০ সালে তা প্রায় ৮৮ হাজারে পৌঁছায়।

২০০০ সাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর আগে দেশের কারাগারে বন্দীর সংখ্যা কখনো এক লাখ ছাড়ায়নি। কিন্তু ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বন্দীর সংখ্যা এক লাখের সীমা ছাড়িয়ে যায়।

কারা সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার বেড়েছে। মাদক, ছিনতাই, সাইবার অপরাধসহ বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলার আসামিরাও কারাগারে রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

একই সময়ে কারাগারে থাকা অনেক বন্দী দীর্ঘদিন জামিন না পাওয়ায় কারাগারের ওপর চাপ আরও বাড়ছে বলে সূত্রগুলোর দাবি।

তবে বন্দীর সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি কারাগারের চিকিৎসা অবকাঠামো ও জনবল একই অনুপাতে বাড়েনি।

৭৫ কারা হাসপাতালের জন্য স্থায়ী চিকিৎসক মাত্র দুজন

কারাগারের চিকিৎসা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি চিকিৎসক সংকট।

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৫টি কারা হাসপাতালের জন্য অনুমোদিত চিকিৎসকের পদ রয়েছে ১৪৮টি। অথচ স্থায়ী চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র দুজন। তাঁদের একজন মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারে এবং অন্যজন রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কর্মরত।

অবশিষ্ট কারাগারগুলোর চিকিৎসা কার্যক্রম অনেকাংশে সংশ্লিষ্ট জেলার সিভিল সার্জনের দপ্তর থেকে অস্থায়ীভাবে পাঠানো চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীল।

কারা সূত্র অনুযায়ী, এভাবে ১০১ জন চিকিৎসক বিভিন্ন কারাগারে অস্থায়ী ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁরা দিনে কয়েক ঘণ্টা কারাগারের হাসপাতালে থাকেন।

ফলে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর কোনো বন্দী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাৎক্ষণিক চিকিৎসক পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

কারাগারে থাকা গুরুতর অসুস্থ বন্দীর ক্ষেত্রে কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার বিলম্বও কখনো জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে।

অ্যাম্বুলেন্স আছে ২৭টি, কারাগার ৭৫টি

চিকিৎসকের পাশাপাশি বড় সংকট রয়েছে জরুরি রোগী পরিবহনে।

দেশের ৭৫টি কারা হাসপাতালের জন্য অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ২৭টি।

ফলে কোনো কারাগারে বন্দী গুরুতর অসুস্থ হলে তাকে দ্রুত বাইরের হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও অনেক সময় নির্ধারিত অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না। তখন বিকল্প যানবাহন ব্যবহার করতে হয়।

কারা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব বিকল্প যানবাহনে অনেক ক্ষেত্রে অক্সিজেন দেওয়ার সুবিধাও থাকে না।

ফলে শ্বাসকষ্ট, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক কিংবা অন্যান্য গুরুতর অবস্থায় থাকা বন্দীকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার সময় পথেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে।

ঢাকার যানজটও হয়ে উঠছে মৃত্যুঝুঁকির কারণ

ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল বলেছেন, কারাগারে বন্দীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। তিনি কারা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও অ্যাম্বুলেন্স সংকটের কথা স্বীকার করেছেন।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অস্থায়ী ভিত্তিতে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসকেরা অনেক সময় দুই ঘণ্টার বেশি কারা হাসপাতালে থাকেন না। আবার প্রয়োজনের সময় যানবাহন ভাড়া করে বন্দী রোগীকে বাইরের হাসপাতালে পাঠাতে গিয়ে দেরি হয়।

কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে গুরুতর অসুস্থ বন্দীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে যানজটের কারণে কয়েক ঘণ্টা লেগে যেতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে গুরুতর অসুস্থ বন্দীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু প্রথমে জেলা বা কেন্দ্রীয় কারাগার, এরপর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এবং সেখান থেকে নির্দিষ্ট বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ হলে রোগীর সংকট আরও বাড়তে পারে।

কারা মহাপরিদর্শকের বক্তব্য অনুযায়ী, কারা হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো গেলে কিছু ক্ষেত্রে বন্দীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।

সেপ্টেম্বরে একের পর এক মৃত্যু

সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতির গুরুত্ব সামনে এনেছে।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মাত্র ৪০ মিনিটের ব্যবধানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দুই বন্দীর মৃত্যু হয়। তাঁরা হলেন পরশ তালুকদার (৩৫) ও স্বপন চন্দ্র দাস (৫৯)। তাঁদের মধ্যে একজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত ঘোষণা করা হয়।

এর আগে ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের আরও দুই বন্দী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁরা হলেন তোফাজ্জল ওরফে পলাশ (৩৮) ও ইফতেখার মাহমুদ (৩৬)।

দুজনের বয়সই ছিল ৪০ বছরের নিচে।

২৪ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর জেলা কারাগারের বন্দী আসাদুজ্জামান শেখ (৪২) ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন ওয়ার্ডে মারা যান।

এ ছাড়া ঢাকার জাতীয় হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কিশোরগঞ্জের কার্যক্রম নিষিদ্ধ স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা খাইরুল আমিন রুহুল সরকার (৫০)।

তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, কারাগারে থাকাকালে কয়েক দিন ধরে তিনি বুকে ব্যথার কথা জানিয়েছিলেন। পরিবারের দাবি, যথাসময়ে যথাযথ চিকিৎসা পেলে পরিস্থিতি এতটা সংকটাপন্ন নাও হতে পারত। এই অভিযোগের স্বতন্ত্র তদন্ত বা চিকিৎসা নথির ভিত্তিতে কারণ নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, তা এখানে নিশ্চিত নয়।

কারাগারে কোন রোগে বেশি ভুগছেন বন্দীরা?

কারা অধিদপ্তর ও কারা হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, বন্দীদের মধ্যে হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও লিভারের জটিলতা, ডায়াবেটিস, চর্মরোগ ও দাঁতের বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।

অনেক বন্দী কারাগারে যাওয়ার আগেই বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছিলেন। আবার কারাগারের অতিরিক্ত ভিড়, মানসিক চাপ, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবনযাপনের সীমাবদ্ধতা তাঁদের শারীরিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

এ ধরনের রোগীর জন্য নিয়মিত পরীক্ষা, ওষুধ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু বর্তমান অবকাঠামো ও জনবল দিয়ে সেই সেবা কতটা দেওয়া সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাড়ে ১৩ হাজার বন্দী

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের চিকিৎসক বিনীতা রায়ের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার বন্দী রয়েছেন।

এই কারা হাসপাতালে সাতজন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে তিনি নিজেসহ দুজন চিকিৎসক সংযুক্ত আছেন।

তিনি জানান, কারা হাসপাতালে বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। গুরুতর বা বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে বন্দীদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজিসহ বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।

কারা হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম থাকলেও পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় সেগুলোর ব্যবহার সীমিত বলে তিনি জানান।

নারী বন্দীদের জন্যও রয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি

কারাগারের চিকিৎসাব্যবস্থায় শুধু সাধারণ চিকিৎসক নয়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরও সংকট রয়েছে।

নিয়মানুযায়ী প্রতিটি কারাগারে একজন মানসিক চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে এ সুবিধা নেই।

এ ছাড়া দেশের কারাগারগুলোতে নারী বন্দীর সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার হলেও নারী বন্দীদের জন্য প্রয়োজনীয় গাইনি চিকিৎসক নেই বলে কারা সূত্র জানিয়েছে।

নারী বন্দীদের গর্ভাবস্থা, প্রজনন স্বাস্থ্য, মাসিক-সংক্রান্ত জটিলতা কিংবা অন্যান্য নারীস্বাস্থ্য সমস্যার ক্ষেত্রে বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রয়োজন হলেও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকলে তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।

একজন অস্থায়ী চিকিৎসককে দেখতে হয় শত শত রোগী

কারা হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকারী অস্থায়ী চিকিৎসকদের ভাষ্য, অনেক সময় দিনে তিন থেকে চার শ বন্দীকে চিকিৎসা দিতে হয়।

এত বিপুলসংখ্যক রোগীর তুলনায় চিকিৎসক কম থাকায় প্রত্যেক বন্দীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কঠিন।

এর পাশাপাশি কারা হাসপাতালে চিকিৎসকদের পদোন্নতি, চাকরির সুযোগ-সুবিধা ও কর্মপরিবেশ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। ফলে অনেক চিকিৎসক দীর্ঘমেয়াদে কারা হাসপাতালে কাজ করতে আগ্রহী হন না।

চিকিৎসক সংকটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নার্স, টেকনিশিয়ান, ওষুধ, পরীক্ষাগার ও জরুরি পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।

অতিরিক্ত বন্দী ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভিযোগ

বন্দীদের স্বজনদের অভিযোগ, অনেক কারাগারে ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দী থাকায় গাদাগাদি করে থাকতে হয়। পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে বন্দীরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।

তাঁদের আরও অভিযোগ, কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের অনেকেই আগে থেকেই অসুস্থ থাকেন। কিন্তু যথাসময়ে চিকিৎসা বা বিশেষজ্ঞ পরামর্শ না পাওয়ায় তাঁদের শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়।

তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ক্ষেত্রে মৃত্যুর সরাসরি কারণ হিসেবে কারাগারের পরিবেশ বা চিকিৎসা অবহেলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পৃথক চিকিৎসা ও তদন্ত প্রয়োজন।

মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি

একজন বন্দী কারাগারে মারা গেলে তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হলে আরও কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে—কখন অসুস্থতা শনাক্ত হয়েছিল, কখন চিকিৎসককে জানানো হয়েছিল, কখন হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, কখন কারাগার থেকে গাড়ি বের হয়েছিল এবং কতক্ষণ পর হাসপাতালে পৌঁছানো হয়েছে।

একই সঙ্গে মৃত্যুর আগে বন্দী কী ধরনের চিকিৎসা পেয়েছিলেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ বা অক্সিজেন দেওয়া হয়েছিল কি না এবং হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিলম্ব হয়েছিল কি না—এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।

স্বচ্ছ তদন্ত ও নথিভিত্তিক পর্যালোচনা ছাড়া প্রতিটি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা কঠিন।

চিকিৎসা অবকাঠামো শক্তিশালী না হলে ঝুঁকি কমবে না

কারাগারে বন্দীর সংখ্যা যখন ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি, তখন শুধু নতুন ভবন তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সামগ্রিক কারা স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার।

প্রথমত, অনুমোদিত চিকিৎসক পদে দ্রুত স্থায়ী নিয়োগ প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি কারাগারে ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স ও অক্সিজেন সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।

চতুর্থত, হৃদ্‌রোগ, কিডনি, ডায়াবেটিস, মানসিক স্বাস্থ্য এবং নারীস্বাস্থ্যের মতো ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, কারাগার থেকে বিশেষায়িত হাসপাতালে বন্দী স্থানান্তরের জন্য দ্রুত ও নির্ধারিত রেফারেল ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

এর পাশাপাশি কারা হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়মিত ব্যবহারযোগ্য রাখা, প্রয়োজনীয় ওষুধের মজুত নিশ্চিত করা এবং জরুরি রোগীর জন্য প্রশিক্ষিত নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্ন শুধু মৃত্যুর সংখ্যা নয়, প্রতিরোধের সক্ষমতা কতটা

২০২১ সাল থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ১ হাজার ২৩৫ বন্দীর মৃত্যু এবং এর মধ্যে অন্তত ৩০০ জনের হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুর তথ্য কারা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর গুরুতর চাপের চিত্র তুলে ধরে।

চলতি বছরের মাত্র প্রায় নয় মাসেই অন্তত ২৫১ বন্দীর মৃত্যুর হিসাব পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজন তৈরি করেছে।

কারাগারে থাকা একজন ব্যক্তি বিচারাধীন আসামি হোন বা সাজাপ্রাপ্ত—কারাগারে প্রবেশের পর তাঁর নিরাপত্তা ও চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাই অসুস্থ বন্দীকে যথাসময়ে শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া এবং জরুরি অবস্থায় দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া কারা ব্যবস্থাপনার মৌলিক দায়িত্বের অংশ।

কারাগারে মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনা বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নাও হতে পারে, কারণ বন্দীদের একটি অংশ গুরুতর ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত থাকেন। কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু, চিকিৎসা পেতে বিলম্ব এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো সম্ভব কি না—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কারাগারের ধারণক্ষমতা, চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা, অ্যাম্বুলেন্স, জরুরি চিকিৎসা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা এবং রোগী স্থানান্তর ব্যবস্থার ঘাটতি যদি একই সঙ্গে থাকে, তাহলে শুধু বন্দীর মৃত্যুর সংখ্যা গুনে পরিস্থিতি বদলাবে না। প্রয়োজন হবে প্রতিটি মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখা এবং যেসব ঘাটতি থেকে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু ঘটতে পারে, সেগুলো দ্রুত দূর করা।

কারাগার কোনো ব্যক্তির মৌলিক চিকিৎসার অধিকার কেড়ে নেওয়ার জায়গা নয়। বরং স্বাধীনতা সীমিত হলেও জীবন ও চিকিৎসার অধিকার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যেই সুরক্ষিত থাকার কথা। তাই বন্দী মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়—এটি কারা স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা ও জবাবদিহিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!