ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

বেতন বাড়ল সরকারি চাকরিজীবীদের, বেসরকারি খাতে বাড়ছে চাপ!

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬, ০৯:৫৬ এএম

বেতন বাড়ল সরকারি চাকরিজীবীদের, বেসরকারি খাতে বাড়ছে চাপ!

ছবিঃ সংগৃহীত

সরকারি কর্মচারীদের নতুন জাতীয় বেতনস্কেলে বড় মাত্রায় বেতন বাড়ানোর ফলে বেসরকারি খাতেও বেতন ও মজুরি কাঠামো পুনর্বিন্যাসের চাপ তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারি পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একই হারে বেতন বাড়ানোর সক্ষমতা অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নেই। ফলে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বেতন ব্যবধান, দক্ষ কর্মী ধরে রাখা এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরি সমন্বয়—এই তিন দিকেই নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সরকারি পে-স্কেল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তবে সরকারি চাকরিতে বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে একই যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার কর্মীদের মধ্যে বেতন তুলনার বিষয়টি সামনে আসে। এতে বিশেষ করে দক্ষতাভিত্তিক পেশায় কর্মী ধরে রাখতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেতন-ভাতা পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি বিবেচনা করতে হতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সাধারণত সরকারি পে-স্কেল পুনর্নির্ধারণ হলে বেসরকারি খাতেও এর একটি চাপ তৈরি হয়। পরে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী মজুরি বা বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে।

তবে তাঁর মতে, এবার সরকারি কর্মচারীদের বেতন যে মাত্রায় বাড়ানো হয়েছে, বেসরকারি খাতের জন্য তা পুরোপুরি অনুসরণ করা কঠিন।

সরকারি-বেসরকারি বেতনের ব্যবধান বাড়ার আশঙ্কা

নতুন বেতনস্কেলে সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন গ্রেডে মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। ৯ম গ্রেডে মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪৪ হাজার টাকা এবং ১০ম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকা থেকে ৩২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর ফলে বিশেষ করে নিচের গ্রেডের বেতন কাঠামো বেসরকারি খাতের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় পর নিচের গ্রেডগুলোতে বেতন বাড়ানোর যে যৌক্তিকতা ছিল, তা থাকলেও ওপরের গ্রেডগুলোতে এত বড় মাত্রায় বেতন বৃদ্ধি বেসরকারি খাতের পক্ষে অনুসরণ করা কঠিন।

ফলে সরকারি চাকরি ও বেসরকারি চাকরিতে একই ধরনের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার কর্মীদের বেতন ব্যবধান নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।

নিচের গ্রেড হতে পারে বেসরকারি খাতের বেঞ্চমার্ক

সরকারি পে-স্কেলের পুরো কাঠামো অনুসরণ করা সম্ভব না হলেও নিচের গ্রেডের বেতন বেসরকারি খাতের নিম্ন আয়ের কর্মীদের জন্য একটি মানদণ্ড বা বেঞ্চমার্ক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে মনে করেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

বিশেষ করে ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণকে বেসরকারি খাতের নিম্ন আয়ের কর্মীদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি রেফারেন্স হিসেবে দেখা যেতে পারে।

তাঁর মতে, এ ধরনের বেঞ্চমার্ক বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি খাতের কর্মী ও শ্রমিকেরা মজুরি পুনর্নির্ধারণের দাবি তুলতে পারেন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের মজুরি বোর্ডের কাছেও যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে সরকারি পে-স্কেলের পুরো মাত্রার বেতন কাঠামো বেসরকারি খাতের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী কমবেশি সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে।

বেসরকারি খাতে বেতন বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে দেশের শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সীমিত। নতুন বিনিয়োগও প্রত্যাশিত মাত্রায় হচ্ছে না। একই সঙ্গে রপ্তানি বাজারের পরিস্থিতি, উৎপাদন ব্যয় এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের চাপ রয়েছে।

এ অবস্থায় সরকারি পে-স্কেলের পুরোটা অনুসরণ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেতন বাড়ানো অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হতে পারে।

কারণ বেতন বাড়ানো মানে শুধু কর্মীর হাতে বাড়তি অর্থ দেওয়া নয়। এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের মোট শ্রমব্যয়ও বাড়ে। পাশাপাশি বাড়তে পারে কর্মী-সুবিধা, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়।

ফলে বেতন পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদনশীলতা, মুনাফা, বাজার প্রতিযোগিতা, পণ্যের মূল্য এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক সক্ষমতার বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।

বড় ও ছোট প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন প্রভাব

নতুন সরকারি পে-স্কেলের প্রভাব বেসরকারি খাতে সব প্রতিষ্ঠানে একই রকম হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

বড় ও তুলনামূলকভাবে লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মী ধরে রাখতে বেতন, বোনাস ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে সক্ষম হতে পারে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকের পক্ষে একই হারে বেতন বাড়ানো কঠিন হতে পারে।

ফলে কোথাও মূল বেতন বাড়তে পারে, কোথাও বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট বা অন্যান্য সুবিধা বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মীদের ধরে রাখার চেষ্টা হতে পারে। আবার আর্থিকভাবে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যমান বেতন কাঠামো অপরিবর্তিতও থাকতে পারে।

দক্ষ কর্মী ধরে রাখায় বাড়তে পারে চাপ

সরকারি চাকরিতে বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দক্ষ কর্মী ধরে রাখার বিষয়টি নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, হিসাবরক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যবস্থাপনার মতো দক্ষতাভিত্তিক পেশায় কর্মীরা বিভিন্ন চাকরির সুযোগ তুলনা করতে পারেন।

তবে কর্মীদের চাকরি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত শুধু মূল বেতনের ওপর নির্ভর করে না। বোনাস, স্বাস্থ্যসুবিধা, অবসর সুবিধা, কর্মঘণ্টা, পদোন্নতির সুযোগ, কর্মপরিবেশ এবং চাকরির নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি মজুরি সমন্বয় না করে, তাহলে দক্ষ কর্মী ধরে রাখাও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এর প্রভাব উৎপাদন খাতেও পড়তে পারে।

তবে দেশে নতুন কর্মসংস্থান তুলনামূলকভাবে কম থাকায় শুধু বেতন না বাড়ানোর কারণে কর্মীরা ব্যাপকভাবে চাকরি ছেড়ে দেবেন—এমন পরিস্থিতি এখনই তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন না তিনি। অনেক কর্মীর জন্য বর্তমান চাকরি ধরে রাখাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজন

সরকারি পে-স্কেলের প্রভাবের বাইরেও বেসরকারি খাতে মজুরি সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে কর্মীদের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

সাধারণত আনুষ্ঠানিক খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে ইনক্রিমেন্ট দেয়। কিন্তু মূল্যস্ফীতির মাত্রা বেশি হলে শুধু নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট কর্মীদের প্রকৃত আয় ধরে রাখতে যথেষ্ট নাও হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে কিছু প্রতিষ্ঠানে শুধু ইনক্রিমেন্ট নয়, পুরো বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

সরকারি পে-স্কেল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক নয়

নতুন জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রযোজ্য। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বর জারি করা ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’-এর মাধ্যমে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছে।

তবে বাড়তি বেতনের পুরো অর্থ একবারে দেওয়ার পরিবর্তে ধাপে ধাপে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৯ম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব গ্রেডে বেতনবৃদ্ধির পার্থক্যের ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে ৫০ শতাংশ দেওয়ার কথা রয়েছে।

২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত তা যথাক্রমে ৭০ শতাংশ ও ৭৫ শতাংশে উন্নীত হওয়ার কথা। এরপর ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে বার্ষিক বেতনবৃদ্ধিসহ পূর্ণ বেতন কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে সরকারি চাকরির এই বেতন কাঠামো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। ফলে বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট কোনো হারে বাড়বে না।

বেসরকারি খাতে বেতন নির্ধারণে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা, শিল্পের ধরন, কর্মীর দক্ষতার চাহিদা, শ্রমবাজারের অবস্থা এবং বাজার প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাড়তি সরকারি আয় ভোগব্যয় বাড়াতে পারে

সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে তাদের ভোগব্যয়ও বাড়তে পারে। এতে পণ্য ও সেবার চাহিদায় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

যদি বাড়তি চাহিদার সঙ্গে পণ্য ও সেবার সরবরাহ একই হারে না বাড়ে, তাহলে কিছু ক্ষেত্রে দামের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতার ওপরও পড়তে পারে।

অর্থাৎ সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও বেসরকারি চাকরিজীবীদের হাতে সরাসরি বাড়তি অর্থ যাবে না। তবে শ্রমবাজারে বেতন প্রতিযোগিতা, দক্ষ কর্মী ধরে রাখার ব্যয়, পণ্য ও সেবার দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের মাধ্যমে এর পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে।

বেসরকারি খাতে একই হারে বেতন বাড়ার নিশ্চয়তা নেই

সব মিলিয়ে নতুন জাতীয় বেতনস্কেলের প্রভাব বেসরকারি খাতে সরাসরি বা একই হারে পড়বে না। সরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধি বিধিবদ্ধভাবে কার্যকর হলেও বেসরকারি খাতে বেতন সমন্বয় নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও শ্রমবাজারের চাহিদার ওপর।

যেসব প্রতিষ্ঠান দক্ষ কর্মীর ওপর বেশি নির্ভরশীল এবং আর্থিকভাবে শক্তিশালী, তারা কর্মী ধরে রাখতে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একই মাত্রার সমন্বয় কঠিন হতে পারে।

ফলে নতুন পে-স্কেল বেসরকারি খাতে মূলত তিন ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে—দক্ষ কর্মী ধরে রাখার জন্য বেতন প্রতিযোগিতা, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে প্রকৃত মজুরি সমন্বয় এবং সরকারি-বেসরকারি চাকরির বেতন ব্যবধান কমানোর দাবি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি পে-স্কেলের পুরো কাঠামো বেসরকারি খাতে প্রয়োগের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা ও শ্রমবাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বেতন সমন্বয় করাই হবে মূল বিষয়।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!