ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

হত্যা মামলায় সাংবাদিক আসামি, বাদীর দাবি ‘চিনি না’

সিয়াম সিদ্দিকী, নওগাঁ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬, ১০:০৮ এএম

হত্যা মামলায় সাংবাদিক আসামি, বাদীর দাবি ‘চিনি না’

ছবিঃ সংগৃহীত

নওগাঁর বদলগাছীতে সরকারি অর্পিত (ভিপি) জমির দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় স্থানীয় এক সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। তবে ওই সাংবাদিকের দাবি, সংঘর্ষের সময় তিনি ঘটনাস্থলেই ছিলেন না। আরও বিস্ময়করভাবে মামলার বাদী নিহতের ছোট ভাই রিফাত হোসেনও বলেছেন, মামলায় ১৫ নম্বর আসামি হিসেবে থাকা সাংবাদিক রাসেল রানাকে তিনি চেনেন না।

এ ঘটনায় হত্যা মামলায় সাংবাদিককে আসামি করার প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিক মহলসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বাদী নিজেই যখন সংশ্লিষ্ট আসামিকে চেনেন না বলে দাবি করছেন, তখন তাঁর নাম মামলায় কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হলো—তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

ভিপি জমির দখল নিয়ে সংঘর্ষ, নিহত ১

ঘটনাটি ঘটে গত ১০ সেপ্টেম্বর নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার বালুভরা ইউনিয়নের বারাতৈল গ্রামের খোর্দ্দ ভূবন মৌজায়। সেখানে সরকারি অর্পিত (ভিপি) জমির দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ থেকে ১২ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে মাসুদ রানা (৩৫) গুরুতর অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে ১৫ সেপ্টেম্বর সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

নিহত মাসুদ রানা বালুভরা ইউনিয়নের আফজাল হোসেনের ছেলে।

মাসুদের মৃত্যুর পর ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে বদলগাছী থানায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেন তাঁর ছোট ভাই রিফাত হোসেন।

মামলায় সাংবাদিক রাসেল রানা

মামলার ১৫ নম্বর আসামি করা হয়েছে টাইমস টুডে ও জাতীয় অর্থনীতি পত্রিকার নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি রাসেল রানাকে।

রাসেল রানার দাবি, সংঘর্ষের সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তাঁর বাড়ি থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্বও প্রায় ১৫ কিলোমিটার। তিনি আরও দাবি করেন, বিভিন্ন সময়ে বালুভরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আল এমরানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের কারণে তাঁকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হত্যা মামলায় আসামি করা হয়ে থাকতে পারে।

তবে সাংবাদিকের এ দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তদন্ত-সিদ্ধান্ত এখনো পাওয়া যায়নি।

‘মামলার ১৫ নম্বর আসামিকে আমি চিনি না’

হত্যা মামলায় রাসেল রানাকে আসামি করার কারণ জানতে চাইলে মামলার বাদী রিফাত হোসেন বলেন, “মামলার ১৫ নম্বর আসামিকে আমি চিনি না।”

ঘটনার সময় তাঁর ভাইকে কারা মারধর করেছিল—এ প্রশ্নের জবাবে রিফাত বলেন, “আমার সামনেই আমার ভাইকে চারজন মিলে মারছে। তাদের মধ্যে রাজা, জাহাঙ্গীর, কুদ্দুস ও ফটিক—এরা মারছে। আমি সাংবাদিক রাসেল রানাকে চিনি না।”

বাদীর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে তাঁর ভাইকে মারধরকারী কয়েকজনের নাম তিনি জানেন। কিন্তু মামলার আসামিদের তালিকায় সাংবাদিক রাসেল রানার নাম কীভাবে এলো, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টতা নেই।

‘নাম কে দিল, আমি জানি না’

সাংবাদিক রাসেল রানা ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলে তাঁর নাম হত্যা মামলায় কীভাবে এল—এ বিষয়ে জানতে চাইলে রিফাত হোসেন বলেন, “আমাদের সঙ্গে বালুভরার এমরান চেয়ারম্যান ও আমার চাচা ভুট্টু ছিলেন। মামলায় ওই সাংবাদিকের নাম কে দিল, আমি জানি না।”

বাদীর এই বক্তব্যের পরই মামলায় রাসেল রানার নাম অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সাংবাদিকের অভিযোগ

রাসেল রানার দাবি, বালুভরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আল এমরানের নির্দেশেই তাঁকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশের কারণে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। সেই বিরোধের জেরেই তাঁকে হত্যা মামলায় জড়ানো হয়ে থাকতে পারে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান আল এমরান।

‘আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না’: চেয়ারম্যান

চেয়ারম্যান আল এমরান বলেন, ভিপি জমি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়েছে। উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হন এবং গুরুতর আহত মাসুদ রানা পরে মারা যান।

সাংবাদিক রাসেল রানাকে তাঁর নির্দেশে হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। কে কাকে আসামি করেছে, তা আমার জানা নেই।”

মামলার বাদীকে নিয়ে থানায় যাওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।

প্রায় ১৪ বিঘা সরকারি জমি নিয়ে বিরোধ

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বারাতৈল গ্রামের খোর্দ্দ ভূবন মৌজায় প্রায় ১৪ বিঘা সরকারি অর্পিত জমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মামলার কয়েকজন আসামি ওই জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ করে আসছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান।

চলতি বছর নিহত মাসুদ রানা, তাঁর বাবা আফজাল হোসেন ও ভাই রিফাত হোসেনের পক্ষ থেকেও ওই জমি লিজ নেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়। তবে চলতি বছর কোনো পক্ষই জমির লিজ পায়নি বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

এ অবস্থায় আগের চাষাবাদের সূত্র ধরে মামলার আসামিপক্ষের কয়েকজন জমিতে ফসল আবাদ করছিলেন। পরে জমির দখল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে জমিতে থাকা ফসল নষ্ট করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত ১০ সেপ্টেম্বর সকালে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে তারা।

আসামিপক্ষের বক্তব্য

মামলার কয়েকজন আসামির বাড়িতে গিয়ে তাঁদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাঁদের পাওয়া যায়নি। তবে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, সংঘর্ষের সময় সাংবাদিক রাসেল রানা ঘটনাস্থলে ছিলেন না। এমনকি তাঁকে তাঁরা ব্যক্তিগতভাবেও চেনেন না বলে জানান।

তবে হত্যা মামলার তদন্ত চলমান থাকায় সংঘর্ষে কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণের বিষয়।

তদন্তের ওপর গুরুত্ব পুলিশের

বদলগাছী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, এ ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে এবং আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

হত্যা মামলায় একজন সাংবাদিককে কীভাবে আসামি করা হলো—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “মামলাটি তদন্তাধীন। এ বিষয়ে বাদী ভালো বলতে পারবেন।”

ওসি আরও বলেন, তদন্তে সাংবাদিক রাসেল রানার বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না পাওয়া গেলে চার্জশিটে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হতে পারে।

প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্তে

একদিকে সাংবাদিক রাসেল রানার দাবি, তিনি সংঘর্ষের সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন না এবং সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে তাঁকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে মামলার বাদী নিজেই বলছেন, তিনি রাসেল রানাকে চেনেন না এবং তাঁকে ঘটনাস্থলে দেখেছেন বলেও দাবি করছেন না। আবার চেয়ারম্যান আল এমরান সাংবাদিককে মামলায় জড়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ফলে হত্যা মামলায় রাসেল রানার নাম অন্তর্ভুক্তির পেছনে কী তথ্য বা অভিযোগ রয়েছে, তা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইনগতভাবে মামলায় আসামি হওয়া মানেই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। তদন্তে প্রত্যেক আসামির ভূমিকা, ঘটনাস্থলে উপস্থিতি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাইয়ের পরই প্রকৃত দায় নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে। এখন পুলিশের তদন্তেই স্পষ্ট হবে, সাংবাদিক রাসেল রানার বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় কি না।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!