চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির দুর্গম পাহাড়ি ও বনাঞ্চলে সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে পুলিশ। অপরাধীদের আস্তানা শনাক্ত ও গতিবিধি নজরদারিতে অত্যাধুনিক সার্ভেইল্যান্স ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিসম্পন্ন ফেস ডিটেকশন ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ বলছে, দুর্গম পাহাড়, ঘন বনাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকায় প্রচলিত পদ্ধতিতে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে অপরাধীদের অবস্থান ও গতিবিধি সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ এবং দ্রুত অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়াতেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চারটি এপিবিএন ক্যাম্প স্থাপনের প্রস্তাব
দ্রুত সময়ে দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা বাড়াতে রাউজানের কদলপুর, রাঙ্গুনিয়ার সরভাট্টা ও বেতাগী এবং ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) চারটি ক্যাম্প স্থাপনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি ক্যাম্পে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত এক প্লাটুন করে পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ক্যাম্প চালু হলে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটলে দূরবর্তী থানা বা ক্যাম্প থেকে অতিরিক্ত ফোর্স আসার অপেক্ষা না করে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে পুলিশ।
চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, এপিবিএনের সদস্যরা ভারী অস্ত্র ব্যবহারে প্রশিক্ষিত এবং তাদের সেমি-মিলিটারি বা প্যারামিলিটারি ধরনের প্রশিক্ষণ রয়েছে। ফলে দুর্গম এলাকায় দ্রুত অভিযান পরিচালনায় তাদের মোতায়েন করা গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হবে।
পাহাড়-বনাঞ্চলে নজরদারিতে থার্মাল ড্রোন
পুলিশের পরিকল্পনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সংযোজন হচ্ছে থার্মাল প্রযুক্তিসম্পন্ন সার্ভেইল্যান্স ড্রোন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও ঘন বনাঞ্চলে সাধারণভাবে মানুষের চলাচল শনাক্ত করা কঠিন হলেও থার্মাল প্রযুক্তির মাধ্যমে তাপের উৎস শনাক্ত করে নির্দিষ্ট এলাকায় মানুষের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ড্রোনের মাধ্যমে দূর থেকে উচ্চ রেজুলেশনে পাহাড় ও বনাঞ্চলের বিভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণ করা যাবে। ফলে কোনো এলাকায় সন্দেহজনক ব্যক্তিদের অবস্থান, চলাচল বা সম্ভাব্য আস্তানা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
অভিযানে যাওয়ার আগে ড্রোনের মাধ্যমে সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ঝুঁকি কমানো এবং অভিযানকে আরও পরিকল্পিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে পুলিশ।
২০ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে শতাধিক এআই ক্যামেরা
শুধু দুর্গম এলাকায় ড্রোন ব্যবহার নয়, সন্ত্রাসীদের চলাচল শনাক্ত করতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ফটিকছড়ির ডেভিড ইমন, রাউজানের রাইহানসহ রাঙ্গুনিয়ার কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যদের তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করা হয়েছে।
চিহ্নিত এসব ব্যক্তির গতিবিধির ওপর নজরদারি বাড়াতে তিন উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ২০টি পয়েন্টে শতাধিক এআই ফেস ডিটেকশন ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে পুলিশ।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, চিহ্নিত কোনো ব্যক্তি ক্যামেরার আওতায় এলে এআইভিত্তিক সফটওয়্যার তার মুখের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে পূর্বে সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে। সম্ভাব্য মিল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের কাছে ছবি ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য পাঠানোর ব্যবস্থা থাকবে।
পুলিশের আশা, এ ধরনের প্রযুক্তি চালু হলে কোনো চিহ্নিত সন্ত্রাসী এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলে গেলেও তার গতিবিধি শনাক্ত করা সহজ হবে। একই সঙ্গে অপরাধীদের অবস্থান সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পাওয়ায় গ্রেপ্তার অভিযানও আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
২৪ আগস্টের পর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
পুলিশ জানিয়েছে, গত ২৪ আগস্টের পর রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির দুর্গম পাহাড়ি ও বনাঞ্চলে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বেড়েছে। এসব এলাকায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনা ঘটছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি।
অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বাধা ও হামলার মুখে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে দুর্গম এলাকাগুলোতে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের মতে, পাহাড় ও বনাঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সেখানে অপরাধীদের লুকিয়ে থাকা বা দ্রুত স্থান পরিবর্তনের সুযোগ থাকে। ফলে শুধু জনবলনির্ভর অভিযান পরিচালনা করলে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হয়। এ কারণে ড্রোন, এআই ক্যামেরা ও গোয়েন্দা তথ্যকে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তি ব্যবহারে কমবে অভিযানের ঝুঁকি
চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, পাহাড়ি ও বনাঞ্চলে নজরদারি বাড়াতে থার্মাল প্রযুক্তিসম্পন্ন অত্যাধুনিক সার্ভেইল্যান্স ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। দূর থেকে উচ্চ রেজুলেশনে এসব এলাকার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
তার মতে, অভিযান শুরুর আগে সন্দেহভাজনদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা বাড়বে এবং অভিযান আরও পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, এআই সফটওয়্যারের মাধ্যমে চিহ্নিত ব্যক্তিদের গতিবিধি ও বিভিন্ন কার্যক্রম শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এর ফলে সন্ত্রাসীদের ওপর নজরদারি আরও কার্যকর হবে বলে আশা করছে পুলিশ।
স্থানীয় নিরাপত্তায় কী পরিবর্তন আনতে পারে
পুলিশের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড় ও বনাঞ্চলে অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত করা, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও প্রবেশপথে নজরদারি বাড়ানো এবং দ্রুত অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এআইভিত্তিক ফেস ডিটেকশন ক্যামেরা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্যের সঠিকতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সংগৃহীত তথ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভুল শনাক্তকরণ এড়াতে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক যাচাই ও আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও জরুরি।
সব মিলিয়ে, সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়িতে পুলিশের এই প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুর্গম এলাকায় নজরদারি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা বাড়বে বলে আশা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

