কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার আপিল শুনানি শেষ হয়েছে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চে মামলাটির শুনানি শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে।
আদালতে আসামিপক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান ও শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুহাম্মদ আবদুল জব্বার ভুঞা।
শুনানি শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, মামলায় আসামিদের সাজা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই। তার দাবি, রাজনৈতিক স্বার্থে মূল আসামিদের বাদ দিয়ে প্রতিপক্ষকে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
তিনি বলেন, মামলায় এমন কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী নেই, যিনি সরাসরি হত্যাকাণ্ডটি দেখেছেন। এ ছাড়া মৃত্যুকালীন জবানবন্দি গ্রহণের ক্ষেত্রে যাকে সাক্ষী হিসেবে দেখানো হয়েছে, তিনি জীবিত থাকায় ওই জবানবন্দির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব কারণে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে আসামিদের খালাস দেওয়া হবে বলে তারা আশা করছেন।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য ও মামলার নথিপত্রের চূড়ান্ত মূল্যায়ন শেষে আপিল বিভাগ কী সিদ্ধান্ত দেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
যেভাবে হত্যা করা হয় আহসান উল্লাহ মাস্টারকে
আহসান উল্লাহ মাস্টার ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক ও শ্রমিকনেতা। তিনি গাজীপুর-২ আসন থেকে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০০৪ সালের ৭ মে গাজীপুরের নোয়াগাঁও এম এ মজিদ মিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে একটি সমাবেশ চলাকালে প্রকাশ্যে গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় করা হয় হত্যা মামলা। হত্যাকাণ্ডটি সে সময় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে এবং দ্রুত বিচার আইনে মামলাটির বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
২০০৫ সালে নিম্ন আদালতের রায়
মামলাটির বিচার শেষে ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল রায় ঘোষণা করেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। রায়ে বিএনপি নেতা নূরুল ইসলাম সরকারসহ ২২ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে দুজন মারা যান। নিম্ন আদালতের রায়ের পর মামলাটির ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের জেল আপিল হাইকোর্টে যায়। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরাও নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন।
২০১৬ সালে হাইকোর্টের রায়
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ১৫ জুন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ মামলার রায় ঘোষণা করেন। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের বেঞ্চের দেওয়া ওই রায়ে নিম্ন আদালতের রায়ে পরিবর্তন আনা হয়।
হাইকোর্ট ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং দুজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখেন। একই সঙ্গে সাতজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। পাশাপাশি যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামিকেও খালাস দেন হাইকোর্ট।
এরপর হাইকোর্টের রায়ে দণ্ডিত আসামিদের পক্ষ থেকে আপিল করা হয়। সেই আপিলের শুনানিই শেষ হয়েছে আজ।
যাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছিল হাইকোর্ট
হাইকোর্টের রায়ে যে ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছিল, তারা হলেন—নূরুল ইসলাম সরকার, নূরুল ইসলাম দীপু, মাহবুবুর রহমান মাহবুব, শহীদুল ইসলাম শিপু, হাফিজ ওরফে কানা হাফিজ এবং সোহাগ ওরফে সরু।
তবে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা আসামিদের একজন শহীদুল ইসলাম শিপু পরে কারাগারে মারা যান। তিনি ৪ জানুয়ারি কাশিমপুর কারাগারে মারা যান বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া টিপু ও নুরুল আমিনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখে হাইকোর্ট।
সাতজনের মৃত্যুদণ্ড কমে যাবজ্জীবন
হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরও সাত আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তারা হলেন—মো. আলী, সৈয়দ আহমেদ হোসেন মজনু, আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু, রতন মিয়া ওরফে বড় মিয়া রতন, জাহাঙ্গীর ওরফে ছোট জাহাঙ্গীর, আবু সালাম ওরফে সালাম এবং মশিউর রহমান ওরফে মনু।
অন্যদিকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আমির হোসেন, জাহাঙ্গীর ওরফে বড় জাহাঙ্গীর, ফয়সাল, রনি মিয়া ওরফে রনি ফকির, খোকন, লোকমান ও দুলাল মিয়াকে খালাস দেন হাইকোর্ট।
যাবজ্জীবন থেকে খালাস চারজন
হাইকোর্ট একই রায়ে নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া চার আসামিকেও খালাস দেন। তারা হলেন—মনির, রকিব উদ্দিন সরকার ওরফে পাপ্পু, আইয়ুব আলী ও জাহাঙ্গীর।
এরপর হাইকোর্টের রায়ে দণ্ডিত আসামিরা আপিল বিভাগে আপিল করেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে সোমবার এসব আপিলের শুনানি শেষ হলো।
এখন আপিল বিভাগের রায়ের অপেক্ষা
আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে নিম্ন আদালত, হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগ—তিন পর্যায়েই দীর্ঘ সময় ধরে আইনি কার্যক্রম চলছে। নিম্ন আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর হাইকোর্টে বিভিন্ন আসামির সাজা পরিবর্তন ও খালাসের মধ্য দিয়ে মামলাটির চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
এখন আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে দণ্ডিত আসামিদের পরবর্তী আইনি অবস্থান। সোমবার শুনানি শেষে আদালত রায় ঘোষণার জন্য মামলাটি অপেক্ষমাণ রাখায় পরবর্তী সময়ে আপিল বিভাগের রায় ঘোষণা করা হবে।
আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলার আপিলের রায় কী হবে—এখন সেই সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন মামলার আসামিপক্ষ, রাষ্ট্রপক্ষ এবং সংশ্লিষ্টরা।

