ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

চেয়ার-সোফার পেছনে জাতীয় পতাকা নয়, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য হাইকোর্টের নির্দেশ

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: আগস্ট ২৬, ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম

চেয়ার-সোফার পেছনে জাতীয় পতাকা নয়, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য হাইকোর্টের নির্দেশ

ছবিঃ সংগৃহীত

সরকারি অফিস ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চেয়ার, সোফা কিংবা টেবিলের পেছনে আইনবহির্ভূতভাবে জাতীয় পতাকা প্রদর্শন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অফিসকক্ষে প্রচলিত পদ্ধতিতে জাতীয় পতাকা প্রদর্শন জাতীয় পতাকা বিধিমালা অনুযায়ী বৈধ কি না, তা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) এক আইনজীবীর করা রিটের শুনানি শেষে বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন।

রিটটি করেন আইনজীবী শরিফ সরকার। তার পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী।

চেয়ার-টেবিলের পেছনে পতাকা প্রদর্শন নিয়ে প্রশ্ন

রিটের পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী বলেন, সম্প্রতি সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তাদের টেবিল, চেয়ার কিংবা সোফার পেছনে জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পতাকা কর্মকর্তার আসনের পেছনে রেখে তার সামনে বসার দৃশ্যও দেখা যায়।

তার বক্তব্য, জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালা রয়েছে। কিন্তু অফিসকক্ষে চেয়ার বা টেবিলের পেছনে যেভাবে পতাকা রাখা হচ্ছে, সেই ধরনের প্রদর্শনের অনুমোদন জাতীয় পতাকা বিধিমালায় নেই।

ফলে রাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক হিসেবে জাতীয় পতাকার মর্যাদা, সঠিক ব্যবহার এবং বিধিমালা অনুসরণ নিশ্চিত করার বিষয়টি আদালতের সামনে আনা হয়েছে।

কারা জাতীয় পতাকা ব্যবহার করতে পারবেন?

রিটের শুনানিতে আইনজীবী আদালতকে জানান, জাতীয় পতাকা বিধিমালায় নির্দিষ্ট কয়েকটি শ্রেণির ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য জাতীয় পতাকা ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। তারা নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী দপ্তর, বাসভবন কিংবা সরকারি কাজে ব্যবহৃত গাড়িতে জাতীয় পতাকা প্রদর্শন করতে পারেন।

তবে সরকারি বিভিন্ন অধীনস্থ দপ্তর, করপোরেশন, কর্তৃপক্ষ ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত আসনের পেছনে নিয়মিতভাবে জাতীয় পতাকা প্রদর্শন করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা তার চেয়ার বা টেবিলের পেছনে পতাকা রাখছেন—এমন ব্যবহারের অনুমোদন বিধিমালায় স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়নি।

পতাকা প্রদর্শনের সময় নিয়েও রয়েছে বিধান

জাতীয় পতাকা বিধিমালায় পতাকা প্রদর্শনের সময় ও পদ্ধতি সম্পর্কেও নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে বলে আদালতে তুলে ধরা হয়।

আইনজীবী সানজিদ সিদ্দিকী বলেন, কোনো ভবনে জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তা প্রদর্শনের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় পতাকা যথাযথভাবে উত্তোলিত ও মুক্তভাবে উড়ন্ত অবস্থায় থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু অফিসকক্ষে চেয়ার বা টেবিলের পেছনে পতাকা রাখার ক্ষেত্রে সেটি অনেক সময় ভাঁজ হয়ে কিংবা বাঁকানো অবস্থায় থাকে। ফলে এ ধরনের প্রদর্শন জাতীয় পতাকার নির্ধারিত নিয়ম ও মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে।

তিন সদস্যের কমিটি গঠনের নির্দেশ

বিষয়টি শুধু আইনগত প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে সরকারি অফিসগুলোতে জাতীয় পতাকার ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে, তা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালত মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। কমিটিতে একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন প্রতিনিধি এবং একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে রাখার কথা বলা হয়েছে।

এই কমিটি সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের অফিসকক্ষে জাতীয় পতাকা যেভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছে, তা জাতীয় পতাকা বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা পর্যালোচনা করবে।

৬০ দিনের মধ্যে দিতে হবে প্রতিবেদন

হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, কমিটিকে ৬০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে হবে।

প্রতিবেদনে সরকারি অফিস ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের প্রচলিত পদ্ধতি, সংশ্লিষ্ট বিধিমালার সঙ্গে তার সামঞ্জস্য এবং কোথাও কোনো ব্যত্যয় হচ্ছে কি না—এসব বিষয় উঠে আসতে পারে।

অর্থাৎ, আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়িত হলে সরকারি অফিসকক্ষে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রচলিত রীতির পাশাপাশি আইন ও বিধিমালার বাধ্যবাধকতাও স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

পতাকার মর্যাদা রক্ষায় গুরুত্ব

জাতীয় পতাকা একটি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক। তাই এর ব্যবহার, প্রদর্শন ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

হাইকোর্টের এ আদেশের মধ্য দিয়ে সরকারি অফিসে জাতীয় পতাকার যথাযথ ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত পরিচয় কিংবা পদমর্যাদা প্রদর্শনের অংশ হিসেবে পতাকা ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, নাকি রাষ্ট্রীয় বিধানের আওতায় নির্ধারিত নিয়মেই তা প্রদর্শন করা হচ্ছে—এ বিষয়টি এখন পর্যালোচনার আওতায় আসছে।

রিটের শুনানিতে আদালত এ ধরনের ব্যবহার কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করেছেন।

আদালতের নির্দেশনা এক নজরে
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চেয়ার বা সোফার পেছনে আইনবহির্ভূতভাবে জাতীয় পতাকা প্রদর্শন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ।
সরকারি অফিসকক্ষে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের ধরন যাচাইয়ে তিন সদস্যের কমিটি গঠন।
কমিটিতে একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রতিনিধি ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক থাকবেন।
সরকারি অফিসে প্রচলিত পতাকা প্রদর্শন জাতীয় পতাকা বিধিমালা অনুযায়ী বৈধ কি না, তা যাচাই।
৬০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ।
চেয়ার বা টেবিলের পেছনে এ ধরনের পতাকা প্রদর্শন কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!