ঢাকা রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

তিন পাসপোর্টে ২৫ বিদেশযাত্রার অভিযোগ, দুদকের অভিযোগের পর কাস্টমস কর্মকর্তা আইয়ুব প্রত্যাহার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ০৪:২৪ পিএম

তিন পাসপোর্টে ২৫ বিদেশযাত্রার অভিযোগ, দুদকের অভিযোগের পর কাস্টমস কর্মকর্তা আইয়ুব প্রত্যাহার

ছবিঃ সংগৃহীত

কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, গাজীপুরের সহকারী কমিশনার মো. আইয়ুবের বিরুদ্ধে তিনটি সচল পাসপোর্ট ব্যবহার করে আট বছরে অন্তত ২৫ বার বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগ উঠেছে। এসব বিদেশযাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহার, ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগের সঙ্গে অর্থপাচারের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—তা তদন্তের দাবি জানিয়ে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

দুদকে অভিযোগ দাখিলের কয়েক দিনের মধ্যেই মো. আইয়ুবকে তাঁর কর্মস্থল গাজীপুর থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাঁকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে (আইআরডি) ‘বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা’ (ওএসডি) হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে দুদকে করা অভিযোগে উত্থাপিত বিষয়গুলোর সত্যতা এখনো তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে মো. আইয়ুবের বক্তব্যও এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

তিন পাসপোর্টে ২৫ বিদেশ ভ্রমণের তথ্য

প্রাপ্ত নথি ও তথ্য অনুযায়ী, মো. আইয়ুবের নামে তিনটি পাসপোর্ট ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে BP03795 নম্বরের পাসপোর্টটি সবচেয়ে পুরোনো। এই পাসপোর্ট ব্যবহার করে ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারতে সাতবার ভ্রমণের রেকর্ড পাওয়া গেছে।

এরপর A033271 নম্বরের পাসপোর্ট ব্যবহার করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। এই পাসপোর্টের মাধ্যমে ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারত, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ১০টি বিদেশ ভ্রমণের তথ্য রয়েছে।

সর্বশেষ A091834 নম্বরের পাসপোর্ট ব্যবহার করে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত থাইল্যান্ড, চীন ও সিঙ্গাপুরে আরও আটটি বিদেশ ভ্রমণের রেকর্ড পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ তিনটি পাসপোর্ট মিলিয়ে ২০১৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অন্তত ২৫টি বিদেশ ভ্রমণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, এই সময়ে মো. আইয়ুব ভারত, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর—এই ছয় দেশে অন্তত ২৫ বার ভ্রমণ করেছেন। দেশভিত্তিক হিসাবে ভারতে ১২ বার, থাইল্যান্ডে সাতবার, সংযুক্ত আরব আমিরাতে দুইবার, চীনে দুইবার এবং মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে একবার করে ভ্রমণের তথ্য রয়েছে।

বর্তমান পাসপোর্ট ‘সাধারণ’ হিসেবে উল্লেখ

সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, মো. আইয়ুবের বর্তমান A091834 নম্বরের পাসপোর্টটি ‘সাধারণ’ পাসপোর্ট হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। পাসপোর্টটি ১৩ নভেম্বর ২০২৪ ইস্যু করা হয় এবং এর মেয়াদ ১১ নভেম্বর ২০৩৪ পর্যন্ত।

সম্প্রতি বিশ্ব মাস্টার্স অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার জন্য এনবিআরের অনুমোদনসংক্রান্ত একটি চিঠিতেও তাঁর এই পাসপোর্ট নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে। ওই চিঠিতে আগের পাসপোর্ট নম্বর হিসেবে A033271-এর তথ্য দেওয়া হয়।

তবে প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর আগে BP03795 নম্বরের আরেকটি পাসপোর্টও তিনি ব্যবহার করেছেন বলে ভ্রমণসংক্রান্ত রেকর্ডে উল্লেখ রয়েছে। ফলে একই ব্যক্তির নামে একাধিক পাসপোর্ট ব্যবহারের বিষয়টি কীভাবে হয়েছে, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

মাস্টার্স অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে অনুমতি

বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের মনোনয়নে দক্ষিণ কোরিয়ার দেগুতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ওয়ার্ল্ড মাস্টার্স অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিতে এনবিআরের দুই সহকারী কমিশনারকে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের একজন মো. আইয়ুব।

রাজস্ব ভবন থেকে গত ৩ আগস্ট জারি করা এক চিঠিতে বলা হয়, ২০ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেগুতে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে মো. আইয়ুব এবং ঢাকা (দক্ষিণ) কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের সহকারী কমিশনার মো. শফিকুল ইসলামকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ওই চিঠিতে মো. আইয়ুবের বর্তমান পাসপোর্ট নম্বর A091834 উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে আগের পাসপোর্ট নম্বর হিসেবে A033271-এর তথ্যও দেওয়া হয়েছে।

সরকারি চাকরিজীবীদের ব্যক্তিগত বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি, ছুটি এবং ক্ষেত্রবিশেষে সরকারি আদেশের প্রয়োজন হয়। তবে দুদকে দেওয়া অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, মো. আইয়ুব তাঁর একাধিক বিদেশ ভ্রমণের আগে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় অনুমতি গ্রহণ করেননি।

অভিযোগকারীর দাবি, সরকারি দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে অনুমোদন ছাড়া একাধিক বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগ গুরুতরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। এসব ভ্রমণের খরচ কীভাবে বহন করা হয়েছে, ভ্রমণের সময় তাঁর কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না এবং বিদেশে কোনো সম্পদ অর্জন বা অর্থ স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনার আবেদন জানানো হয়েছে।

পেশা হিসেবে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখের অভিযোগ

দুদকে দেওয়া অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মো. আইয়ুব সরকারি চাকরিতে থাকা সত্ত্বেও তাঁর ব্যক্তিগত পাসপোর্টে পেশা হিসেবে ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ করা হয়েছে।

একজন সরকারি কর্মকর্তার পাসপোর্টে পেশাগত পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য কীভাবে দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নথিতে তথ্যের কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না—তা যাচাইয়ের দাবিও জানানো হয়েছে।

সম্পদ ও অর্থপাচারের অভিযোগ তদন্তের দাবি

মো. আইয়ুবের বিরুদ্ধে একাধিক বিদেশ ভ্রমণের পাশাপাশি বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও দুদকে দেওয়া আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সম্পদের উৎস, বিদেশ ভ্রমণের ব্যয়ের উৎস এবং বিদেশে কোনো আর্থিক লেনদেন বা সম্পদ অর্জনের সঙ্গে তাঁর বিদেশযাত্রার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী।

তবে অভিযোগে উত্থাপিত সম্পদ অর্জন বা অর্থপাচারের বিষয়টি এখনো প্রমাণিত নয়। দুদক তদন্ত করলে নথিপত্র, ব্যাংক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী, পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন রেকর্ডসহ সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ হতে পারে।

দুদকে অভিযোগের পর কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার

এদিকে দুদকে অভিযোগ দাখিলের কয়েক দিনের মধ্যেই মো. আইয়ুবকে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, গাজীপুর থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাঁকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে।

তবে তাঁকে কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহারের সঙ্গে দুদকে করা অভিযোগের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে মো. আইয়ুবের বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।

এখন প্রশ্ন হলো—একই কর্মকর্তার নামে তিনটি পাসপোর্ট ব্যবহারের তথ্য কীভাবে তৈরি হয়েছে, এসব পাসপোর্টের বৈধতা ও ব্যবহারসংক্রান্ত নথি কী বলছে, ২০১৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত অন্তত ২৫টি বিদেশ ভ্রমণের প্রতিটির জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না এবং বিদেশ ভ্রমণের ব্যয় ও সম্পদ অর্জনের উৎস কী—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ে কীভাবে উঠে আসে। দুদকে করা অভিযোগের তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!