পাবনার সদর উপজেলায় ১০ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার প্রধান আসামির বাড়িতে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) জুমার নামাজের পর উপজেলার কুলুনিয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় দুইতলা বাড়ির দরজা, জানালা ও গ্রিল ভাঙচুর করে ভেতরে প্রবেশ করে বিক্ষুব্ধ জনতার একটি অংশ। বাড়ির আসবাবপত্র ও ভাঙা জানালার গ্রিলের কিছু অংশও নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই এলাকায় ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছিল। শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজ শেষে শত শত মানুষ মিছিল নিয়ে মামলার প্রধান আসামি মোস্তফা কামালের (৫৫) বাড়ির সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বাড়িটিতে হামলা চালানো হয়।
শত শত মানুষের মিছিল, ভাঙচুর বাড়িতে
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুমার নামাজ শেষে বিভিন্ন বয়সী মানুষ মিছিল নিয়ে মোস্তফা কামালের বাড়ির দিকে যান। সেখানে পৌঁছে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং একপর্যায়ে বাড়ির দরজা ও জানালায় ভাঙচুর শুরু করেন।
বিক্ষুব্ধ জনতার একটি অংশ দুইতলা বাড়ির দেয়াল, দরজা ও জানালার গ্রিল ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। বাড়ির ভেতরের বিভিন্ন আসবাবপত্রও ভাঙচুর করা হয়। পরে ভাঙা জানালার গ্রিলসহ কিছু মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দা পারভেজ বলেন, আগের দিন থেকেই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকটি গাড়ি অবস্থান করছিল। শুক্রবারও তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তবে বিপুলসংখ্যক মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনাস্থলে পুলিশ, তবু নিয়ন্ত্রণে আসেনি পরিস্থিতি
পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনার আশঙ্কায় ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। বিক্ষুব্ধ জনতাকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ওই বাড়ির মালামাল আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করেছে।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া নিয়ে উদ্বেগ
শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে এলাকায় যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা স্বাভাবিক হলেও হামলা ও ভাঙচুরের মাধ্যমে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডিফেন্ডার পাবনা জেলার সদস্য সচিব আব্দুর রব মন্টু বলেন, আইন, বিচারব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতার জায়গা থেকে মানুষ অনেক সময় আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাও এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য দায়ী হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এটি কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে। প্রতিবাদের নামে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, তা সবার জন্য উদ্বেগজনক।’
যেভাবে নিখোঁজ হয় ১০ বছরের শিশুটি
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কেনাকাটা করতে গিয়ে নিখোঁজ হয় ১০ বছরের ওই শিশু। এরপর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। শিশুটির সন্ধান না পাওয়ায় বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়।

নিখোঁজের পর পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধারে অনুসন্ধান শুরু করে। কয়েক দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে স্থানীয় একটি পরিত্যক্ত ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি ঘিরে কুলুনিয়া এলাকায় শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শিশুটিকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত—তা জানতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে।
পুলিশের তদন্তে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ
পুলিশের তদন্তে প্রাথমিকভাবে যে তথ্য উঠে এসেছে, সে অনুযায়ী মোস্তফা কামাল ও তার ভাড়াটিয়া ইয়াছিন আলী (২১) শিশুটিকে ফুসলিয়ে একটি মুদি দোকানের পেছনের কক্ষে নিয়ে যায়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই কক্ষেই শিশুটিকে ধর্ষণের পর পরিচয় গোপন রাখার উদ্দেশ্যে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহটি বস্তাবন্দি করে প্রথমে খাটের নিচে রাখা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে সেটি স্থানীয় একটি পরিত্যক্ত ডোবায় ফেলে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তবে এসব তথ্য পুলিশের তদন্তে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে বলা হচ্ছে; মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে।
দুই আসামি গ্রেফতার
এ ঘটনায় মোস্তফা কামাল ও তার ভাড়াটিয়া ইয়াছিন আলীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন থেকে উদ্ধার করা তথ্য ও ছবিতেও পূর্বপরিকল্পিতভাবে অপরাধ সংঘটনের আলামত পাওয়া গেছে। এসব তথ্য তদন্তের অংশ হিসেবে যাচাই করা হচ্ছে।
শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের পর থেকে তদন্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
বিচার দাবিতে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী
শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগের ঘটনায় দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবিতে ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই এলাকায় এ নিয়ে আলোচনা ও ক্ষোভ ছিল। শুক্রবার জুমার নামাজের পর সেই ক্ষোভ প্রকাশ পায় বিক্ষোভ ও মিছিলের মধ্য দিয়ে।
তবে বিক্ষোভের একপর্যায়ে আসামির বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা নতুন করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও আদালতের। তাই ক্ষোভ থাকলেও কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয়।
এদিকে শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগের তদন্ত এবং গ্রেফতার হওয়া আসামিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি কার্যক্রমের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয়রা।

