পাবনায় সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় প্রধান শিক্ষক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। জেলার ১ হাজার ১৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬১৬টিতেই নেই নিয়মিত প্রধান শিক্ষক। অর্থাৎ জেলার প্রায় ৫৪ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই পদগুলো শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম, পাঠদান, উন্নয়নকাজ, শিক্ষক ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
একদিকে বিপুলসংখ্যক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই, অন্যদিকে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত শিখনফল অর্জনে ব্যর্থতার অভিযোগে জেলার ৩৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষককে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। গত ২০ থেকে ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে এসব নোটিশ দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের দাবি, শোকজ পাওয়া বিদ্যালয়গুলোর বড় একটি অংশেই দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
১১৩৬ বিদ্যালয়ের ৬১৬টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই
পাবনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার নয়টি উপজেলায় মোট ১ হাজার ১৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৫২২টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন। বিপরীতে ৬১৬টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য।
হিসাব অনুযায়ী, জেলার মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৫৪ দশমিক ২ শতাংশ বিদ্যালয়েই বর্তমানে নিয়মিত প্রধান শিক্ষক নেই। ফলে অর্ধেকের বেশি বিদ্যালয়কে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে পরিচালনা করতে হচ্ছে।
সাঁথিয়ায় সবচেয়ে বেশি শূন্য পদ
উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পাবনার সাঁথিয়া উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের সংকট সবচেয়ে বেশি। উপজেলার ১৭৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৮৪টিতে প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন। অর্থাৎ ৯৪টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য।
সুজানগরের ১৪৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫২টিতে প্রধান শিক্ষক থাকলেও ৯৩টি পদ শূন্য। চাটমোহরের ১৫৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৫টিতে প্রধান শিক্ষক আছেন, বিপরীতে ৯০টি পদ শূন্য। বেড়ার ১১২টি বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৩৮টিতে প্রধান শিক্ষক কর্মরত; ৭৪টি বিদ্যালয়ে পদটি শূন্য।
এ ছাড়া পাবনা সদরের ১৮৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১১৪টিতে প্রধান শিক্ষক আছেন এবং ৭১টি পদ শূন্য। ভাঙ্গুড়ার ৯৯টির মধ্যে ৪৫টিতে প্রধান শিক্ষক থাকলেও ৫৪টি পদ শূন্য। ঈশ্বরদীর ১০০টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫১টিতে প্রধান শিক্ষক আছেন, ৪৯টি পদ শূন্য।
ফরিদপুর উপজেলার ৮৪টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৬টিতে প্রধান শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন, ৪৮টি পদ শূন্য। আর আটঘরিয়ার ৭৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৭টিতে প্রধান শিক্ষক আছেন এবং ৪১টি পদ শূন্য।
মামলা জটিলতায় আটকে আছে পদোন্নতি
বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন করে জাতীয়করণ করা বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশ নিজেদের জ্যেষ্ঠ দাবি করে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ বা পদোন্নতির দাবিতে মামলা করেছেন। এসব মামলার কারণে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে বলে দাবি করছেন শিক্ষকরা।
তাদের ভাষ্য, মামলাজনিত জটিলতার কারণে অনেক বিদ্যালয়ে বছরের পর বছর প্রধান শিক্ষক নিয়োগ বা পদোন্নতি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করতে হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা জানান, যেসব জেলায় এ ধরনের মামলা নেই, সেসব এলাকায় শূন্য পদ পূরণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলছে বিদ্যালয়
প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষকদের কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক নেতৃত্ব নিয়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ শিক্ষকদের।
শিক্ষকদের ভাষ্য, একটি বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমন্বয়, দাপ্তরিক নথিপত্র, বিভিন্ন সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রধান শিক্ষকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নিয়মিত প্রধান শিক্ষক না থাকায় এসব কাজের অনেক ক্ষেত্রেই সমন্বয়হীনতা দেখা দিচ্ছে।
এ ছাড়া প্রধান শিক্ষক না থাকায় নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ পাওয়ার সুযোগও সীমিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা। তাদের দাবি, প্রধান শিক্ষক পদে না থাকলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অনেক প্রশাসনিক প্রশিক্ষণেও অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকে না। এতে দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যালয় পরিচালনার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা, পাঠদানে প্রভাব
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক বলেন, দীর্ঘদিন পদোন্নতি না হওয়ায় অনেক শিক্ষকের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যালয়ের কর্মপরিবেশ ও পাঠদানে।
তারা অভিযোগ করেন, কোথাও কোথাও শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে না আসা, সময়ের আগেই বিদ্যালয় ত্যাগ করা কিংবা পাঠদানে অনাগ্রহ দেখানোর মতো ঘটনাও ঘটছে। কেউ কেউ শিক্ষকতার পাশাপাশি ব্যবসা বা কৃষিকাজে যুক্ত হওয়ায় বিদ্যালয়ে তাদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনে প্রভাব পড়ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো বিদ্যালয় বা শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট সূত্রে স্পষ্ট করা হয়নি।
উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়েও ক্ষোভ
প্রধান শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়েও শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাদের দাবি, দুই বছর আগে বিদ্যালয় উন্নয়নের জন্য বছরে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হলেও গত দুই বছর ধরে অনেক ক্ষেত্রে তা কমে প্রায় ১৫ হাজার টাকায় নেমে এসেছে।
শিক্ষকদের মতে, একটি বিদ্যালয়ের ছোটখাটো মেরামত, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, আনুষঙ্গিক কাজসহ বিভিন্ন খাতে এই অর্থ ব্যয় করতে হয়। বরাদ্দ কমে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রধান শিক্ষক না থাকা এবং সীমিত বরাদ্দ—দুই কারণে অনেক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে তারা জানান।
অভিভাবকদেরও উদ্বেগ
বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কয়েকজন অভিভাবক।
তাদের অভিযোগ, অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা সময়মতো আসছেন না এবং শিক্ষার্থীদের ওপর প্রয়োজনীয় তদারকি ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসার আগ্রহও কমে যাচ্ছে।
অভিভাবকদের মতে, প্রাথমিক স্তরেই শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে ভিত্তি শক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও নিয়মিত তদারকি দুর্বল হলে এর সরাসরি প্রভাব শিক্ষার্থীদের শেখার ওপর পড়তে পারে। তাই দ্রুত শূন্য পদ পূরণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
‘প্রধান শিক্ষক না থাকলে বিদ্যালয়ের পরিবেশ থাকে না’
পাবনা সদরের দাশপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আতিয়ার হোসেন বলেন, “একটা বিদ্যালয়ের অভিভাবক হলেন প্রধান শিক্ষক। বাড়ির যদি অভিভাবকই না থাকেন, তাহলে ওই বাড়িটির কী অবস্থা হবে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ে পড়াশোনার কোনো পরিবেশই থাকে না।”
তিনি আরও বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকলে শিক্ষকরা যার যার মতো করে পাঠদান করেন এবং অনেক সময় দায়সারাভাবে দায়িত্ব শেষ করেন। দ্রুত প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি ও নিয়োগ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
‘২০১৭ সাল থেকে প্রধান শিক্ষক নেই’
পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর ইউনিয়নের দিঘিগোহাইলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ফারুক হোসেন বলেন, “বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় ব্যাপক ভোগান্তি হচ্ছে। পড়াশোনা থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন—সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষকদের মধ্যেও এর প্রভাব পড়ছে।”
তিনি বলেন, “আমার বিদ্যালয়ে ২০১৭ সাল থেকে প্রধান শিক্ষক নেই। এই গ্রামের নাম দাশপাড়া হলেও বিদ্যালয়ের নাম দিঘিগোহাইলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় করা হয়েছে। এই জটিলতা ঠিক করতে প্রধান শিক্ষক ছাড়া সম্ভব নয়। নাম সংশোধনের কাজ করতেও নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।”
দ্রুত শূন্য পদ পূরণের তাগিদ
পাবনা জেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা আতাউর রহমান বলেন, বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, “শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা প্রয়োজন। বর্তমান বিদ্যালয়গুলোর জন্য বিষয়টি অনেকটাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক থাকা জরুরি।”
শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয় হচ্ছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের ভিত্তি গড়ে তোলার প্রধান প্রতিষ্ঠান। তাই এই স্তরে দীর্ঘদিন নেতৃত্বের সংকট থাকা শিক্ষার মান ও বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য উদ্বেগের বিষয়। একদিকে শত শত বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই, অন্যদিকে শত শত বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত শিখনফল অর্জন না করার অভিযোগে শোকজ—দুই বিষয়কে আলাদা করে না দেখে সমন্বিতভাবে কারণ অনুসন্ধান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
দীর্ঘদিনের শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ, মামলা ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত জটিলতার নিষ্পত্তি এবং বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক তদারকি জোরদার করা গেলে পাবনার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

