ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

পাবনায় বিধবার ১৪ শতক জমি দখলের অভিযোগ, আদালতের রায়ের পরও মিলছে না প্রতিকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম

পাবনায় বিধবার ১৪ শতক জমি দখলের অভিযোগ, আদালতের রায়ের পরও মিলছে না প্রতিকার

ছবিঃ সংগৃহীত

পাবনা সদর উপজেলার ভজেন্দ্রপুর গ্রামে ১৪ শতক জমি জবরদখল করে টিনের ঘর নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে। ৭৫ বছর বয়সী বিধবা হাসনাহেনার দাবি, স্বামীর নামে কেনা ও দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে থাকা ওই জমিতে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঘর নির্মাণ করে দখল নেওয়া হয়েছে। জমির মালিকানা নিয়ে আদালতের রায় এবং ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তদন্ত প্রতিবেদন নিজের পক্ষে পাওয়ার পরও তিনি জমিটি দখলমুক্ত করতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।

হাসনাহেনার অভিযোগ, বয়স ও অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে একটি পক্ষ তার জমি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে। জমি ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাকে একাধিকবার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। এ কারণে তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন।

যেভাবে জমির মালিকানা

পারিবারিক ও নথিসূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালের ১৪ জানুয়ারি ৩৯৮ নম্বর দলিলের মাধ্যমে পাবনা সদর উপজেলার আরএস ২৭৩ নম্বর দাগের ৪৭৯ নম্বর খতিয়ানের ১৪ শতক জমি হাসনাহেনার স্বামী আব্দুল গফুর বাদশা ক্রয় করেন।

জমি কেনার পর নিয়ম অনুযায়ী নামজারি সম্পন্ন করে সেটি ভোগদখলে রাখেন তিনি। দীর্ঘদিন ওই জমি তাদের দখলেই ছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

প্রায় তিন বছর আগে আব্দুল গফুর বাদশার মৃত্যু হয়। এরপর চার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে বর্তমানে ওই বাড়িতে একাই বসবাস করছেন হাসনাহেনা। এর মধ্যে তিনি স্ট্রোক করে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর শারীরিক অসুস্থতা ও একাকীত্বের কারণে জমিজমা দেখাশোনা করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এই সুযোগেই নিকটাত্মীয়দের একটি পক্ষ জমিটি দখলের চেষ্টা শুরু করে বলে অভিযোগ তার।

গত বছরের ডিসেম্বরে টিনের ঘর নির্মাণের অভিযোগ

হাসনাহেনার ভাষ্য, জমি দখলের ধারাবাহিকতায় গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর কয়েকজন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে যান এবং তার জমিতে টিনের ঘর নির্মাণ করেন।

এ ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে ভজেন্দ্রপুর এলাকার শহীদ আলী, তাসলি খাতুন, ছয়েদ আলী, আব্দুল গাফফার, আলেপ প্রামাণিক ও শান্ত হোসেনের নাম উল্লেখ করেছেন তিনি।

হাসনাহেনার দাবি, জমিতে ঘর নির্মাণের সময় তিনি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তার কথা আমলে নেওয়া হয়নি। বরং জমি ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাকে বিভিন্নভাবে চাপ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে।

হাসনাহেনা বলেন, ‘আমি অসুস্থ ও অসহায় নারী। স্বামী মারা যাওয়ার পর চার মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। এখন একাই থাকি। জমি ছেড়ে দেওয়ার জন্য আমাকে কয়েক দফা হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ কারণে আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’

তিনি আরও দাবি করেন, নিজের জমির মালিকানা ও দখল ফিরে পেতে বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেও কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পাচ্ছেন না।

জমি দখলমুক্ত করে দেওয়ার দাবিতে গত ১৮ জুলাই পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর লিখিত আবেদন করেন হাসনাহেনা।

তার অভিযোগ, লিখিত আবেদন করার পরও এখন পর্যন্ত জমি দখলমুক্ত করার বিষয়ে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে তিনি আরও হতাশ হয়ে পড়েছেন।

হাসনাহেনার দাবি, জমির মালিকানা নিয়ে আদালতের রায় এবং ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তদন্ত প্রতিবেদনও তার পক্ষে রয়েছে। এরপরও বাস্তবে জমির দখল ফিরে না পাওয়ায় তিনি প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

অভিযুক্তদের দাবি, ‘আমরাই জমির মালিক’

তবে হাসনাহেনার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্তরা। শহীদ আলী, তাসলি খাতুনসহ অন্যদের দাবি, ওই জমির কয়েক শতাংশের মালিকানা তাদের রয়েছে।

তাদের ভাষ্য, তারা নিজেদের মালিকানাধীন জমিতেই ঘর নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট জমি নিজেদের নামে খারিজ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।

অভিযুক্তদের বক্তব্য অনুযায়ী, জমি নিয়ে তাদের দাবি আইনগত মালিকানা ও কাগজপত্রের ভিত্তিতেই। তাই তাদের বিরুদ্ধে জবরদখলের অভিযোগ সঠিক নয় বলে তারা দাবি করেছেন।

জমির মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী দাবির কারণে বিষয়টি এখন বিরোধপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। একদিকে হাসনাহেনা দলিল, নামজারি, আদালতের রায় ও ভূমি অফিসের তদন্ত প্রতিবেদনকে নিজের দাবির ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করছেন। অন্যদিকে অভিযুক্তরা নিজেদের মালিকানা ও খারিজের কথা বলছেন।

এ ধরনের ভূমি বিরোধে প্রকৃত মালিকানা ও দখলের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নথি, রেকর্ড ও আদালতের আদেশ পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো পক্ষ যাতে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে জবরদখল বা হুমকির ঘটনা ঘটাতে না পারে, সে বিষয়েও প্রশাসনিক নজরদারি জরুরি।

৭৫ বছর বয়সী অসুস্থ বিধবা হাসনাহেনার অভিযোগ এখন স্থানীয়ভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের মালিকানা ও ভোগদখলের দাবি করা জমি নিয়ে বিরোধের কারণে তিনি বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন।

তার প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নথিপত্র ও আদালতের সিদ্ধান্ত যাচাই করে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ করবে এবং আইনগতভাবে যার অধিকার, তাকে সেই অধিকার বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে।

অন্যদিকে অভিযুক্তদের দাবি, তারাও জমিটির অংশবিশেষের বৈধ মালিক। ফলে দুই পক্ষের দাবির চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ও আইনগত প্রক্রিয়াই হবে মূল বিষয়।

এ অবস্থায় অসুস্থ বৃদ্ধা হাসনাহেনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জমি নিয়ে বিরোধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত আইনগত নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!