ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

৪০০ হটস্পট, ১ হাজার ৪০০ ছিনতাইকারী—কতটা নিরাপদ রাজধানী?

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬, ১১:৩৫ এএম

৪০০ হটস্পট, ১ হাজার ৪০০ ছিনতাইকারী—কতটা নিরাপদ রাজধানী?

ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকার ৫০টি থানাজুড়ে ছিনতাইয়ের অন্তত ৪০০টি হটস্পট চিহ্নিত করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এসব এলাকায় সক্রিয় বা তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী রয়েছে ওয়ারী এলাকায়। অন্যদিকে ছিনতাইয়ের ঘটনা তুলনামূলক বেশি সক্রিয় তেজগাঁও ও উত্তরা এলাকায়।

ছিনতাই প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান, মামলা ও গ্রেপ্তার চললেও নগরীতে এ অপরাধের ঘটনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এতে দিনের পাশাপাশি রাতেও নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ছিনতাইয়ের আতঙ্কে নগরবাসী

রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক, গণপরিবহন, বাজার, আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে নির্জন সড়ক—বিভিন্ন স্থানে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পথচারী, যাত্রী, ব্যবসায়ী ও মোটরসাইকেল আরোহীদের লক্ষ্য করে মোবাইল ফোন, টাকা, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

একজন ভুক্তভোগী বলেন, “বাসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সিটে বসি। এরপর পকেটে হাত দিয়ে দেখি, আমার ফোনটি নেই।”

আরেক ভুক্তভোগীর ভাষ্য, রাজধানীতে প্রতিনিয়ত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটায় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। তাঁর কথায়, “প্রতিনিয়তই ছিনতাই হচ্ছে। এখন মনে হয়, আমরা জিম্মি হয়ে আছি।”

গত ১৮ আগস্ট রাজধানীর চাঁদ উদ্যানের এক নম্বর সড়কে ব্যবসায়ী আবুল হোসেন ছিনতাইয়ের শিকার হন বলে অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় তিন যুবক তাঁকে ঘিরে ধরে। পরে চাপাতি দিয়ে আঘাত করে তাঁর কাছ থেকে ৯৮ লাখ টাকা, মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেল নিয়ে যায়।

আবুল হোসেন বলেন, “তারা এসে আমাকে নামিয়ে চাপাতি দিয়ে আঘাত করেছে। গালিগালাজ করেছে। এরপর মোটরসাইকেলে উঠে মোবাইলটি নিয়ে যায়। বাম পকেটে টাকা ছিল, সেই টাকাও নিয়ে যায়।”

এ ধরনের ঘটনা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

ছয় মাসে ১৭২ মামলা, গ্রেপ্তার চার শতাধিক

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৭২টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় চার শতাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০টি থানায় ছিনতাইয়ের অন্তত ৪০০টি হটস্পট রয়েছে। এসব এলাকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১ হাজার ৪০০ ছিনতাইকারী পুলিশের তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে ওয়ারী এলাকায় তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বলে ডিএমপি জানিয়েছে।

অন্যদিকে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি সক্রিয় এলাকার মধ্যে তেজগাঁও ও উত্তরা রয়েছে বলে পুলিশের তথ্য থেকে জানা গেছে।

রাত বাড়লে বাড়ে ঝুঁকি

ছিনতাইয়ের কয়েকটি হটস্পট সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, দিনের তুলনায় রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সড়কে মানুষের চলাচল কমে যায়। রাত ১২টার পর কিছু এলাকায় দু-একটি চেকপোস্টে টহলরত পুলিশ সদস্য দেখা গেলেও অনেক স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি তুলনামূলক কম দেখা যায়।

নির্জন ও অন্ধকার সড়ক, ঝোপঝাড় এবং কম আলোযুক্ত স্থানগুলোকে অপরাধীরা ছিনতাইয়ের জন্য ব্যবহার করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কখনো দলবদ্ধভাবে, আবার কখনো আড়ালে অবস্থান নিয়ে পথচারী বা যানবাহনের আরোহীদের লক্ষ্য করার অভিযোগ রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও পাওয়া যায়। তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।

সংসদ ভবন এলাকার সড়কেও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

রাজধানীর সংসদ ভবন এলাকার একটি সড়কে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে শিক্ষিকা রনজিলা পারভিনের মৃত্যুর ঘটনার পর ওই এলাকার নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সড়কের একটি ট্রাফিক বক্সের সামনে দু-একজন পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি দেখা গেলেও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি সবসময় দৃশ্যমান নয় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এদিকে ট্রাফিক বিভাগও জনবল সংকটের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছে বলে সংশ্লিষ্ট এক সদস্য জানিয়েছেন।

একজন ট্রাফিক পুলিশ সদস্য বলেন, “দুইজন লাগছে। তাই একজনকে বিশ্রামও দিতে পারছি না। আবার ধরেন, এ রকম কোনো ঘটনা ঘটল, আমি যদি মুভ করি, তাহলে কাউকে দিয়ে অন্য জায়গা সামলানোর সুযোগ হয়ে ওঠে না।”

পুলিশ বলছে, নজরদারিতে ঘাটতি নেই

ছিনতাইসহ নগরীর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের তৎপরতার কোনো ঘাটতি নেই বলে দাবি করেছে ডিএমপি। রাতে বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্ট, মোবাইল পার্টি ও টহল জোরদার করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

ডিএমপির ডিসি মো. আকতার হোসেন বলেন, “রাতে কোথায় কোথায় চেকপোস্ট হবে বা কোথায় কোথায় মোবাইল পার্টি থাকবে, তা তদারকির জন্য আমাদের এসি, এডিসি ও ডিসিরা মাঠপর্যায়ে থাকেন। তারা কোনো ব্যত্যয় দেখলে সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেন।”

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

জামিনের পর আবার অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশি অভিযান চললেও গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসার বিষয়টি ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে একটি চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক।

তিনি বলেন, “যারা অর্থ দিতে পারেন না, তাদেরকে বাকিতে বের করে আনা হয়। এসব অপরাধী বের হয়ে আবার নানা ধরনের অপরাধ করে। এই যে চক্র এদেরকে কারা জামিনে বের করে আনেন এবং তাদের অর্থ পরিশোধ করেন, সেটিও দেখতে হবে।”

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ছিনতাই কমাতে শুধু গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়; গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়া, জামিন এবং পুনরায় অপরাধে জড়ানোর বিষয়টিও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

জনবল ও নজরদারি বাড়ানোর দাবি

নগরীতে ছিনতাইয়ের হটস্পটের সংখ্যা এবং তালিকাভুক্ত অপরাধীর সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে এসব এলাকায় নিয়মিত পুলিশি টহল, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সিসিটিভি নজরদারি এবং দ্রুত реаг করার ব্যবস্থা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে রাতের বেলায় নির্জন সড়ক, বাসস্ট্যান্ড, গণপরিবহনকেন্দ্রিক এলাকা ও অপরাধপ্রবণ পয়েন্টগুলোতে দৃশ্যমান পুলিশি উপস্থিতি বাড়ানো গেলে অপরাধ প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

রাতে ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকি বেশি থাকায় নগরবাসীকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা। প্রয়োজন ছাড়া রাতে নির্জন সড়কে চলাচল না করা, মূল্যবান সামগ্রী প্রকাশ্যে বহন না করা, অপরিচিত ব্যক্তির গতিবিধি সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং কোনো অপরাধের শিকার হলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর ৫০টি থানায় অন্তত ৪০০টি ছিনতাইয়ের হটস্পট এবং প্রায় ১ হাজার ৪০০ তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারীর তথ্য নগরীর নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মামলা ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে ধারাবাহিক নজরদারি, পর্যাপ্ত জনবল এবং অপরাধীদের পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা কতটা নেওয়া যায়—এখন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!