ঢাকা বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

“চট্টগ্রামের ৮ কারাগারে ১৯৮ বিদেশি, কীভাবে এলেন বাংলাদেশে?”

সজল, ক্রাইম রিপোর্টার

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬, ০১:২৯ পিএম

“চট্টগ্রামের ৮ কারাগারে ১৯৮ বিদেশি, কীভাবে এলেন বাংলাদেশে?”

ছবিঃ সংগৃহীত

ইয়াবা, কোকেনসহ মাদক পাচার থেকে শুরু করে অনলাইনভিত্তিক প্রতারণা ও অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে চট্টগ্রাম বিভাগের আটটি কারাগারে ১৯৮ জন বিদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন। কারা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ৩০ জন কয়েদি এবং বিচারাধীন ১৬৮ জন হাজতি।

চট্টগ্রাম বিভাগের ১২টি কারাগারের মধ্যে আটটিতেই বিভিন্ন দেশের এসব নাগরিক বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে মিয়ানমার, চীন, নাইজেরিয়া, লাওস, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, বন্দিদের একটি অংশ মাদক মামলায় এবং অন্যরা অনলাইন প্রতারণাসহ বিভিন্ন অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে বিচারাধীন রয়েছেন।

৮ কারাগারে কত বিদেশি বন্দি

চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বন্দি রয়েছেন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় ও কক্সবাজার কারাগারে।

কারাগারভিত্তিক হিসাবে—

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার: ৮৩ জন, এর মধ্যে ১৩ জন কয়েদি
কক্সবাজার কারাগার: ৬১ জন
বান্দরবান কারাগার: ৪৫ জন
ফেনী-১ কারাগার: ৩ জন
কুমিল্লা কারাগার: ২ জন
রাঙামাটি কারাগার: ২ জন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগার: ১ জন
নোয়াখালী কারাগার: ১ জন

সব মিলিয়ে আটটি কারাগারে রয়েছেন ১৯৮ জন বিদেশি নাগরিক। তাদের মধ্যে ১৬৮ জন হাজতি হিসেবে বিচারাধীন এবং ৩০ জন বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কয়েদি হিসেবে কারাগারে রয়েছেন।

মাদক মামলায় মিয়ানমারের নাগরিক বেশি

কারা বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশি বন্দিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মাদকসংক্রান্ত মামলায় আটক রয়েছেন। বিশেষ করে মিয়ানমারের নাগরিকদের মধ্যে মাদক মামলার আসামির সংখ্যা বেশি বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপ-মহাপরিদর্শক মো. ছগির মিয়া বলেন, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে অনেক বিদেশি নাগরিক বিভাগের কারাগারগুলোতে বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে মিয়ানমার, চীন, নাইজেরিয়া, লাওস, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন।

তিনি বলেন, মিয়ানমারের বন্দিদের মধ্যে বেশিরভাগই মাদক মামলার আসামি।

খুলশীতে ৬৩ বিদেশি গ্রেপ্তার

বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন প্রতারণার অভিযোগও সামনে এসেছে। সর্বশেষ গত ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানা এলাকায় একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও খুলশী থানা যৌথভাবে ওই অভিযান পরিচালনা করে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে চীন, পাকিস্তান, লাওস, নেপাল ও ভিয়েতনামের নাগরিক ছিলেন।

পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা একটি সংঘবদ্ধ অনলাইন প্রতারণা চক্রের সঙ্গে যুক্ত। অভিযানে তাদের কাছ থেকে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করা হয়েছে।

চাকরির প্রলোভন ও অনলাইন মার্কেটিংয়ের নামে প্রতারণার অভিযোগ

পুলিশ জানায়, নগরের একটি ভবন ভাড়া নিয়ে বিদেশি নাগরিকদের বিভিন্ন কক্ষে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকেই বিভিন্ন ধরনের অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনার তথ্য পাওয়া যায় বলে দাবি পুলিশের।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, চাকরির প্রলোভন দেখানো, অনলাইন মার্কেটিংয়ের নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং অন্যান্য প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের দোষী হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।

কক্সবাজারেও অনলাইন প্রতারণার অভিযোগ

চট্টগ্রাম বিভাগের আরেক পর্যটননগরী কক্সবাজারেও সম্প্রতি বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে অনলাইন প্রতারণার অভিযোগে অভিযান চালানো হয়।

গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজার শহরের একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে ছয় বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে পাঁচজন চীনের এবং একজন তাইওয়ানের নাগরিক।

পুলিশের অভিযানে তাদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৪০টি ল্যাপটপ ও যোগাযোগের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনাও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় বিদেশি নাগরিকদের মাধ্যমে পরিচালিত কথিত অনলাইনভিত্তিক অপরাধের বিষয়টি আলোচনায় এনেছে।

ইউপিএসের ভেতর কোকেন পাচারের অভিযোগ

চট্টগ্রামে বিদেশি নাগরিকদের মাদক পাচারে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগেরও নজির রয়েছে। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুল্ক গোয়েন্দা, নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও পুলিশের যৌথ অভিযানে বাহামা দ্বীপপুঞ্জের গ্র্যান্ড বাহামা দ্বীপের নাগরিক স্ট্যাশিয়া শ্যান্টিয়া রোলকে আটক করা হয়।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, তার কাছে থাকা একটি কম্পিউটার ইউপিএসের ভেতর থেকে ৩ কেজি ৯০০ গ্রাম কোকেন উদ্ধার করা হয়। ওই সময় তার বয়স ৫৩ বছর বলে জানানো হয়।

ঘটনায় পতেঙ্গা থানায় মামলা করা হয়। পরে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন স্ট্যাশিয়া শ্যান্টিয়া রোল।

ফুটবলের আড়ালে মাদক পাচারের অভিযোগ

ওই কোকেনের চালান তদারকিতে জড়িত থাকার অভিযোগে একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর দুই নাইজেরিয়ান নাগরিক আফিজ ওয়াহাব ও ইকোচুকু এনওয়াগডকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের অভিযোগ ছিল, তারা ফুটবল খেলোয়াড় এবং দেশের বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলতেন। ফুটবল খেলার আড়ালে তারা মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।

তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়।

সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বাড়ছে উদ্বেগ

চট্টগ্রাম বিভাগ ভৌগোলিকভাবে মিয়ানমার ও বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন হওয়ায় এ অঞ্চলে মাদক পাচার, অবৈধ প্রবেশ এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি রয়েছে। এর পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও পর্যটনকেন্দ্র থাকায় বিদেশি নাগরিকদের যাতায়াতও তুলনামূলক বেশি।

সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও অনলাইন প্রতারণার অভিযোগে একাধিক অভিযান পরিচালিত হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তবে কারাগারে বন্দি ১৯৮ জন বিদেশি নাগরিকের সবাই একই ধরনের অপরাধে জড়িত নন। কারা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কেউ মাদক মামলায়, কেউ অনলাইনভিত্তিক প্রতারণাসহ বিভিন্ন অভিযোগে বিচারাধীন; আবার ৩০ জন বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাভোগ করছেন।

কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশি বন্দিদের মধ্যে মিয়ানমারের নাগরিকদের একটি বড় অংশ মাদক মামলায় আটক থাকলেও অন্যান্য দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে মামলার ধরন ভিন্ন। ফলে প্রতিটি মামলায় অভিযোগ, তদন্তের ফল এবং আদালতের সিদ্ধান্ত পৃথকভাবে বিবেচ্য।

চট্টগ্রাম বিভাগের কারাগারগুলোতে বিদেশি নাগরিকের এই উপস্থিতি একদিকে যেমন আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার বিষয়টি সামনে আনছে, অন্যদিকে বিদেশি নাগরিকদের মাধ্যমে পরিচালিত কথিত সাইবার প্রতারণা ও মাদক পাচারের নেটওয়ার্ক নিয়ে তদন্ত ও নজরদারির প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরছে।

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!