গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, দেশ পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকার ও বিরোধী দলসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক ও জাতীয় বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে আলোচনা ও পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সিলেট সিটি করপোরেশন মাঠে সিটি করপোরেশন আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, আগামী দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে দেশ পুনর্গঠন, গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য আবাসস্থল তৈরি করা। এ লক্ষ্য অর্জনে বিভাজনের পরিবর্তে অভিন্ন স্বার্থের বিষয়গুলোতে ঐকমত্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান
রাষ্ট্রপতি বলেন, যেকোনো বিষয়ে সবার মত এক হবে—এমনটা নয়। বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিমত বা মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তবে আলোচনার মাধ্যমে এসব মতপার্থক্য দূর করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, “আসুন এখন অন্তত আমাদের কমন যে ইস্যুগুলো আছে, সেই ইস্যুগুলোতে আমরা একমত হই। একমত হয়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাই।”
সরকার ও বিরোধী দলসহ দেশের সব রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষকে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সিলেটের পর্যটন ও শিল্পে বিনিয়োগের আহ্বান
সিলেটের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের পর্যটন, চা, মৎস্য, কৃষি, জ্বালানি ও শিল্প খাতে আরও বেশি বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, সিলেটের পাহাড়, নদী, ঝরনা, চা-বাগান, বন ও হাওর—সব মিলিয়ে এ অঞ্চল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। এসব প্রাকৃতিক সম্পদ ও সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে পর্যটন খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রবাসে থাকা সিলেটের মানুষদের অনেকেই যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার দিক থেকে সমৃদ্ধ। তারা যদি দেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসেন, তাহলে সিলেটের পর্যটনসহ স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও গতি সৃষ্টি হতে পারে।
চা শিল্পে নতুন বাজার তৈরির সম্ভাবনা
সিলেটের চা শিল্পের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, সিলেটের চা-বাগান শুধু বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিত। ফলে চা উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজার সম্প্রসারণে আরও উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের হাইকমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রসঙ্গ তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি জানান, তিনি সিলেটে এসেছিলেন এবং সেখান থেকে চা নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
হাওর ও মৎস্য খাতেও সম্ভাবনা
সিলেটের হাওরাঞ্চলে মৎস্য চাষের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, হাওরগুলোকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো গেলে মৎস্য উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।
একই সঙ্গে সিলেটের প্রাকৃতিক সম্পদ ও খনিজ উপাদান কাজে লাগিয়ে শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এ জন্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাসহ স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।
প্রবাসীদের অবদানের প্রশংসা
সিলেটের প্রবাসী জনগোষ্ঠীর অবদানের প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রবাসীরা শুধু সিলেটের অর্থনীতিতে নয়, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
তিনি বলেন, প্রবাসীদের বিনিয়োগ ও অভিজ্ঞতাকে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
জ্বালানি, কৃষি ও শিল্পে বিনিয়োগের আহ্বান
রাষ্ট্রপতি সিলেটের গ্যাস, জ্বালানি, কৃষি, চা, পর্যটন ও শিল্প খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের এসব খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করেন।
তার বক্তব্যে স্থানীয় সম্পদ, প্রবাসী বিনিয়োগ এবং উদ্যোক্তাদের উদ্যোগকে সমন্বিত করে সিলেটের অর্থনৈতিক বিকাশ ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব উঠে আসে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাংলাদেশের সৌন্দর্য
বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়টিও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করেন। তার মতে, দেশের অন্যতম সৌন্দর্য হচ্ছে এই পারস্পরিক সম্প্রীতি।
তিনি এই সম্প্রীতি ও সহাবস্থান বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সিলেটবাসীর পাশে থাকার আশ্বাস
সিলেটের মানুষের সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি সবসময় সিলেটবাসীর পাশে ছিলেন এবং ভবিষ্যতেও তাদের পাশে থাকবেন।
নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, জাতীয় সংসদের হুইপ জিকে গাউছ, রাষ্ট্রদূত মুশফিকুল ফজল আনসারী এবং সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে সিলেটের উন্নয়ন, বিনিয়োগ সম্ভাবনা, প্রবাসীদের অবদান এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।

