গাজীপুর মহানগরের চত্বর এলাকার ইবনে মাসউদ মাদরাসার অধ্যক্ষ আবুল হোসেন আল আমিনকে গুম ও হত্যার অভিযোগে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) সাবেক প্রধান আসাদুজ্জামান, তৎকালীন অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ইশতিয়াক আহমেদসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ অভিযোগ দাখিল করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান।
এর আগে গত মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের কাছে এ ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত সংস্থা। ওই প্রতিবেদনে তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান আসাদুজ্জামান, এডিসি ইশতিয়াক আহমেদ, তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক আসাদুজ্জামান মিয়াসহ মোট পাঁচজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
২০২৩ সালে মাদরাসা থেকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি ডিবি পুলিশের পরিচয়ে গাজীপুরের ইবনে মাসউদ মাদরাসা থেকে অধ্যক্ষ আবুল হোসেন আল আমিনকে তুলে নেওয়া হয়। এরপর থেকে তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর আগে ২৮ জানুয়ারি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসি। তাদের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৎকালীন সিটিটিসির এডিসি ইশতিয়াক আহমেদের নেতৃত্বে একটি দল ৩০ জানুয়ারি গাজীপুরের ওই মাদরাসায় যায়।
সেখান থেকে অধ্যক্ষ আবুল হোসেন আল আমিনকে আটক করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মিন্টো রোডের সিটিটিসি কার্যালয়ে নির্যাতনের অভিযোগ
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, গাজীপুর থেকে আটকের পর আবুল হোসেন আল আমিনকে মিন্টো রোডে সিটিটিসির কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে টানা ১৮ দিন শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
নির্যাতনের একপর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তাকে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
মরদেহ ধলেশ্বরী নদীতে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ
তদন্তে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, আবুল হোসেন আল আমিনের মৃত্যুর ঘটনা গোপন করতে তার মরদেহ কেরানীগঞ্জের তুলসীখালী সেতু থেকে ধলেশ্বরী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে মরদেহ গুমের এই ঘটনাকে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মরদেহের সন্ধান, উদ্ধারের বিষয়ে কী ধরনের প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং ঘটনাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পাঁচজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ
তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সাবেক সিটিটিসি প্রধান আসাদুজ্জামান, তৎকালীন এডিসি ইশতিয়াক আহমেদ, তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক আসাদুজ্জামান মিয়াসহ মোট পাঁচজনকে ঘটনায় অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। এখন ট্রাইব্যুনালের পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগটির বিষয়ে অগ্রসর হওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত হবে।
তদন্ত প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠে এসেছে
তদন্ত প্রতিবেদনের বর্ণনা অনুযায়ী, অধ্যক্ষ আবুল হোসেন আল আমিনকে আটকের পর তার পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা দীর্ঘ সময় তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি। পরে তার নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তদন্তের আওতায় আসে।
তদন্তকারীরা আটকের স্থান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা, সিটিটিসির হেফাজতে অবস্থান, অসুস্থ হয়ে পড়া, হাসপাতালে নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে মরদেহ গুমের অভিযোগ—এসব বিষয় পর্যালোচনা করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। আদালত বা ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ায় উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সময়ে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

