২০০৯ সালের পিলখানা বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চাকরিচ্যুত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো সদস্যদের পুনরায় চাকরিতে বহালের দাবিতে রাজধানীতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন সাবেক সদস্যদের একটি অংশ। তারা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ওই সময়ের ঘটনাগুলো পুনর্মূল্যায়ন করে যোগ্য ও নির্দোষ সদস্যদের চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর জিগাতলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদর দপ্তরের প্রধান ফটকের সামনে তারা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে নিজেদের দাবির পক্ষে বক্তব্য দেন চাকরিচ্যুত সদস্যরা।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সদস্যরা বলেন, ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর বিভিন্ন পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক বিডিআর সদস্য চাকরি হারান। তাদের দাবি, ওই সময়ের ঘটনার সঙ্গে প্রত্যেক সদস্যের সম্পৃক্ততা এক নয়। তাই সবার বিষয়ে পৃথকভাবে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তারা বলেন, যেসব সদস্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের প্রমাণ নেই বা যারা অন্যায়ভাবে চাকরি হারিয়েছেন বলে দাবি করছেন, তাদের বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করে যোগ্যদের চাকরিতে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তারা।
দীর্ঘদিন চাকরির বাইরে, মানবিক সংকটের অভিযোগ
চাকরিচ্যুত সদস্যদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় ধরে চাকরির বাইরে থাকায় তারা নানা ধরনের মানবিক, সামাজিক ও আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। চাকরি হারানোর কারণে পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণ, সন্তানের পড়াশোনা এবং সামাজিক মর্যাদা নিয়ে তাদের অনেকে সংকটে পড়েছেন বলেও দাবি করেন তারা।
তাদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে দাবি জানানো হলেও কাঙ্ক্ষিত সমাধান হয়নি। ফলে এবার বিজিবি সদর দপ্তরের সামনে অবস্থান নিয়ে বিষয়টি সরকারের নজরে আনার চেষ্টা করছেন তারা।
৮ হাজার ৭৯৬ জনকে পুনর্বহালের আইনি সুযোগ নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
এদিকে, চাকরিচ্যুত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো সদস্যদের পুনর্বহালের দাবির বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে ভিন্ন অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, পিলখানা ঘটনায় চাকরিচ্যুত এবং বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো ৮ হাজার ৭৯৬ জন সদস্যকে পুনরায় চাকরিতে বহালের কোনো আইনি সুযোগ নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের কয়েক দিন পরই চাকরিচ্যুত সদস্যদের একটি অংশ বিজিবি সদর দপ্তরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করলেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পুনর্বহালের দাবিটি আবারও আলোচনায় এসেছে।
পুনর্বহালের দাবি অব্যাহত
চাকরিচ্যুত সদস্যরা বলেন, তাদের দাবি কোনো বিশেষ সুবিধা পাওয়া নয়; বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রত্যেকের ভূমিকা ও দায় পৃথকভাবে যাচাই করা। তদন্তে যারা দোষী প্রমাণিত হবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ নেই, তাদের ক্ষেত্রে চাকরিতে পুনর্বহাল বা উপযুক্ত প্রতিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত বলে তারা দাবি করেন।
তারা বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়া শুরুর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে চাকরিচ্যুত সদস্য ও তাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।
পিলখানা ঘটনা ও পরবর্তী প্রেক্ষাপট
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিলখানায় তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) সদর দপ্তরে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় তৎকালীন বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের পর ব্যাপক মামলা, তদন্ত, বিচার এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে অনেক সদস্যের চাকরি চলে যায় বা তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বছরের পর বছর পর চাকরিচ্যুত সদস্যদের একটি অংশ নিজেদের বিষয়ে পুনর্বিবেচনা ও পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে আসছেন। সর্বশেষ বুধবারের মানববন্ধন ও বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে তারা আবারও বিষয়টি সরকারের সামনে তুলে ধরেছেন।
তবে চাকরিচ্যুত ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো সব সদস্যকে একইভাবে বিবেচনা করা হবে কি না এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবির বিষয়ে সরকার নতুন কোনো পদক্ষেপ নেবে কি না—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
চাকরিচ্যুত সদস্যদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা ও ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের সুযোগ তৈরি করা হলে দীর্ঘদিনের এই বিরোধের একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।

