বাগেরহাটের মোংলা উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। উপজেলার ৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৪টিতেই নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। এর মধ্যে ১৫টি বিদ্যালয়ে চলতি দায়িত্বে এবং ৩৯টি বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের একাধিক পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট চলতে থাকায় বিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সহকারী শিক্ষককে নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজ সামলাতে হচ্ছে। এতে একদিকে শিক্ষকদের ওপর বাড়তি দায়িত্বের চাপ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে শিক্ষক সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরাও কাঙ্ক্ষিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক ও অভিভাবকরা।
৭১ বিদ্যালয়ের মধ্যে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক মাত্র ১৭টিতে
মোংলা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ৭১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৭টি বিদ্যালয়ে স্থায়ীভাবে প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন।
স্থায়ী প্রধান শিক্ষক থাকা বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে উত্তর বুড়িরডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাপালির মেট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সানবান্ধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খানজাহান আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চাঁদপাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাইনমারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হলদিবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চিলা বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদুরপাল্টা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দিগরাজ বিএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঠোটারডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাহেবের মেট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আন্ধারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নিতাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং উত্তর জয়মনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
অন্য ৫৪টি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সহকারী শিক্ষকদের কাউকে চলতি দায়িত্ব এবং কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই শিক্ষককে ক্লাসের পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্ব
প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য থাকা বিদ্যালয়গুলোতে ভারপ্রাপ্ত বা চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়মিত পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজ, শিক্ষকদের সমন্বয়, বিভিন্ন নথিপত্র সংরক্ষণসহ প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তাঁদের নিয়মিত পাঠদানে সময় ও মনোযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক বলেন, একজন সাধারণ শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করলে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক সময় সহকর্মীদের মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে নিয়ে সমন্বয়ের সমস্যা দেখা দেয়। আবার ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় পড়েন।
তাদের মতে, দ্রুত স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এবং শূন্য থাকা সহকারী শিক্ষক পদগুলো পূরণ করা গেলে এ সংকট অনেকটাই কমে আসবে।
শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শ্রেণি কার্যক্রম
শুধু প্রধান শিক্ষক নয়, সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য থাকায় অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। কোথাও একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির দায়িত্ব নিতে হচ্ছে, আবার কোনো শিক্ষক ছুটিতে গেলে পুরো শ্রেণির পাঠদান কার্যক্রমই ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ফলে বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে শিক্ষকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে এ সংকট আরও বেশি প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কচুবুনিয়া বিদ্যালয়ে ছয় শ্রেণির জন্য শিক্ষক সংকট
সরেজমিনে রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) উপজেলার কচুবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষক সংকটের এমন চিত্র দেখা যায়। প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠদানের সময় শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে খেলাধুলা করতে দেখা যায়। এ সময় বিদ্যালয়ে উপস্থিত একমাত্র শিক্ষিকা ইসমত আরা শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছিলেন।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিত্যানন্দ সম্মাদার মুঠোফোনে জানান, তিনি ব্যক্তিগত ছুটিতে থাকায় ওই দিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন না।
তিনি জানান, বিদ্যালয়ে ছয়টি শ্রেণিতে প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষক পদ রয়েছে ছয়টি। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষকসহ দুটি পদ শূন্য। মোট চারজন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও তাদের একজন সালাউদ্দিন প্রশিক্ষণে এবং আরেকজন শিক্ষক ফারহানা রহমান মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন।
ফলে কার্যত শিক্ষকসংখ্যা আরও কমে যাওয়ায় দুই শিফটে ছয়টি শ্রেণির পাঠদান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি। কোনো শিক্ষক ছুটিতে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয় এবং সব শ্রেণিতে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
একজন শিক্ষক, তিনটি পদ শূন্য
উপজেলার সিকি সোনাইলতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র আরও সংকটপূর্ণ। বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষকসহ মোট চারটি শিক্ষক পদ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষকসহ তিনটি পদই শূন্য। স্থায়ীভাবে কর্মরত আছেন মাত্র একজন শিক্ষক—সুমাইয়া।
মুঠোফোনে সুমাইয়া জানান, শিক্ষক সংকটের কারণে বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে উপজেলা শিক্ষা অফিসের উদ্যোগে অন্য বিদ্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত দুই শিক্ষককে অস্থায়ীভাবে সেখানে পাঠদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এভাবেই বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
অভিভাবকদের উদ্বেগ
শিক্ষক সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অভিভাবকরাও। অভিভাবক মনোজিৎ কুমার, মিজান মাত্তবর, আবদুস সোবাহান, এনামুল হক ও নাজিরুল ইসলাম বলেন, উপজেলার অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষক কম থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তাদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শ্রেণিকক্ষে যথাযথ নজরদারি ও পাঠদান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাও ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চললে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসার আগ্রহ কমে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
অভিভাবকদের কেউ কেউ জানান, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক পরিবার সন্তানদের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করানোর দিকে ঝুঁকছে।
অবসর ও বদলিতে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য
মোংলা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পিন্টু রঞ্জন দাশ বলেন, অবসর ও বদলির কারণে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য হয়েছে। একই সঙ্গে অনেক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদও শূন্য রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব শূন্য পদের তালিকা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পদগুলো পূরণ করা হলে শিক্ষক সংকট অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দ্রুত নিয়োগ চান শিক্ষক-অভিভাবকরা
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ভিত্তি শক্ত করার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকলে শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়, বিদ্যালয়ের সামগ্রিক নেতৃত্ব ও শিক্ষা কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়ে। একইভাবে সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য থাকলে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সব শ্রেণির পাঠদান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় মোংলার ৫৪টি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শূন্য সহকারী শিক্ষক পদ দ্রুত পূরণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে বিদ্যালয়গুলোতে স্বাভাবিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত নিশ্চিত করবে এবং শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদানের পরিবেশ ফিরিয়ে আনবে।

