সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে সচিব কমিটির বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ উঠে এসেছে। তিনটি পৃথক বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সচিব কমিটি। তবে সব গ্রেডে সমান হারে বেতন বাড়ানো হবে না।
বুধবার (১২ আগস্ট) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সচিব কমিটির বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামোর বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে সরকারি চাকরিজীবীদের বর্তমান বেতন কাঠামো, জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং বিদ্যমান আর্থিক সক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নিম্ন গ্রেডে বেশি বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত নবম পে স্কেলে সব গ্রেডের বেতন একই হারে বাড়ানোর পরিবর্তে গ্রেডভেদে ভিন্ন হারে বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় তাদের মূল বেতন তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
সচিব কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের বর্তমান মূল বেতনের তুলনায় দ্বিগুণ পর্যন্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
তবে এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। সচিব কমিটির সুপারিশের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রিপরিষদ পর্যায়ে পর্যালোচনা এবং অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
একসঙ্গে নয়, দুই ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব
নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে এগোনোর প্রস্তাব দিয়েছে সচিব কমিটি। এতে সরকারের ওপর একবারে বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি না করে পর্যায়ক্রমে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী—
প্রথম ধাপে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংশোধিত মূল বেতন কার্যকর করা হবে।
দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা পুনর্নির্ধারণ বা বৃদ্ধি করার বিষয়টি বাস্তবায়ন করা হবে।
এর ফলে নতুন বেতন কাঠামো চালু হলেও ভাতা বৃদ্ধির সুবিধা পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে কার্যকর হতে পারে।
তিন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা
সচিব কমিটির আলোচনায় জাতীয় বেতন কমিশনের পাশাপাশি জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কমিশনের সুপারিশও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তিনটি কমিশনের পৃথক সুপারিশের মধ্যে সমন্বয় করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি বাস্তবসম্মত বেতন কাঠামো তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের সক্ষমতা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
সচিব কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তিন কমিশনের প্রতিবেদন সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করেই কমিটির পক্ষ থেকে সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এখন এই সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কমিটির কাছে পাঠানো হবে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় লাখো চাকরিজীবী
নবম জাতীয় পে স্কেল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বর্তমান বেতন কাঠামো সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসছেন সরকারি চাকরিজীবীরা।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মচারীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়ের কারণে আর্থিক চাপের কথা তুলে ধরে নতুন বেতন কাঠামোতে তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার দাবি করে আসছেন।
সচিব কমিটির সুপারিশে নিম্ন গ্রেডের বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব এবং পর্যায়ক্রমে ভাতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা থাকায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
তবে কোন গ্রেডে কত শতাংশ বেতন বাড়বে, নতুন বেতন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল বেতন কত হবে, ভাতা কীভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হবে এবং কবে থেকে তা কার্যকর হবে—এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সচিব কমিটির সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কমিটিতে উপস্থাপনের পর এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এরপর অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

