দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দাবি, সরকারের ধারাবাহিক কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। নতুন প্রক্রিয়ায় প্রথম ধাপে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর বিষয়ে দেশটির কর্তৃপক্ষ নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বিমান ভাড়াসহ অভিবাসনসংক্রান্ত ব্যয় বহন করে প্রথম দফার কর্মীদের সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)-এর মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে কর্মী পাঠানোর বিস্তারিত প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মন্ত্রণালয় বলেছে, আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি ও নির্দেশনা জারির আগে কোনো কর্মপ্রত্যাশীকে টাকা লেনদেন, মেডিকেল পরীক্ষা বা পাসপোর্ট জমা না দিতে।
৩৩৮ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সুযোগ
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে কর্মী সরবরাহকারী প্রধান পাঁচ দেশের মধ্যে নেপাল ও বাংলাদেশের জন্য ২৫টি করে এবং ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের জন্য ১০টি করে রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত ২৫টি এজেন্সি আগের সরকারের সময়ে প্রণীত ৪২৩ রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকার অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মালয়েশিয়া সরকারকে অনুরোধ করা হয়, ওই তালিকার মধ্যে যারা অতীতে সুবিধাভোগী বা সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বাদ দিয়ে অন্য এজেন্সিগুলোকে সুযোগ দেওয়ার জন্য।
মন্ত্রণালয়ের দাবি, প্রায় ছয় মাসের ধারাবাহিক আলোচনার পর মালয়েশিয়া বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ দিয়েছে। দেশটির মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২৫টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে সরাসরি নির্বাচনের পাশাপাশি আরও ৩১২টি এজেন্সিকে সহযোগী বা অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটিং এজেন্সি হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
এর সঙ্গে সরকারি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলও কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে সব মিলিয়ে ৩৩৮টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাবে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
কারা বাছাই করেছে রিক্রুটিং এজেন্সি?
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, রিক্রুটিং এজেন্সি যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করেছে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি।
বাংলাদেশ সরকারের দাবি, এ বাছাই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সরকারের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ছিল না। মালয়েশিয়ার নিজস্ব আইন, নীতিমালা ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই এজেন্সিগুলো নির্বাচন করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় আশা করছে, চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন সমঝোতা স্মারক হলে রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদন ও কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
২০২২ সালের সমঝোতা স্মারক নিয়ে বিতর্ক
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর কর্মী পাঠানোর বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সমঝোতা স্মারকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ের দায়িত্ব এককভাবে মালয়েশিয়া সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল।
মন্ত্রণালয় বর্তমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার জন্য ওই সমঝোতা স্মারক ও তৎকালীন সরকারের নীতিকে দায়ী করেছে। তবে একই সঙ্গে জানিয়েছে, বিদ্যমান আইনি ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেই মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে।
১৬ মেডিকেল সেন্টার দিয়ে শুরু হতে পারে কার্যক্রম
শ্রমবাজার দ্রুত চালুর ক্ষেত্রে মেডিকেল পরীক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এ কারণে বাংলাদেশ সরকার বিদ্যমান মেডিকেল সেন্টারের তালিকায় পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিল।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে সরেজমিনে মেডিকেল সেন্টারগুলো পরিদর্শন করবে। এরপর নতুন নীতিমালা অনুযায়ী চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে।
এরই মধ্যে মালয়েশিয়া অনুমোদিত বিদ্যমান তালিকা থেকে বাংলাদেশের অনুরোধে বিতর্কিত ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা মেডিকেল সেন্টারগুলো বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ১৬টি মেডিকেল সেন্টারের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
শ্রমবাজার চালুর পাশাপাশি মালয়েশিয়ার তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে নতুন নীতিমালার ভিত্তিতে মেডিকেল সেন্টারগুলো যাচাই-বাছাই করে পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ করবে।
কর্মীদের বেতন, আবাসন ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার উদ্যোগ
নতুন করে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অতীতের বিভিন্ন অভিযোগ এড়াতে কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকার।
মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে কর্মীদের হয়রানি বন্ধ, সরাসরি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে কাজে যোগদান এবং দেশটির শ্রম আইন অনুযায়ী নিয়মিত বেতন-ভাতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
পাশাপাশি কর্মীদের জন্য আবাসন ও চিকিৎসাসেবার বিষয়টিও নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অভিবাসনসংক্রান্ত কোনো অভিযোগ বা সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত সমাধানের জন্য ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল ও হেল্পডেস্ক স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার পেছনে ছিল সিন্ডিকেটের অভিযোগ
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগী, রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেট এবং কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে।
সরকার বলছে, নতুন ব্যবস্থায় এসব অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা হবে। কর্মী পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করার পাশাপাশি অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে বাস্তবে এই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ থাকবে এবং কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া বন্ধ করা যাবে কি না—তা নির্ভর করবে নজরদারি ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপর।
১০ হাজার কর্মী পাঠানোর উদ্যোগে নতুন আশার সৃষ্টি
প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে বিমান ভাড়াসহ অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগকে কর্মপ্রত্যাশীদের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব শ্রমিক দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ থাকায় অনিশ্চয়তায় ছিলেন, তাদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
সরকারের মতে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হলে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশে বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কর্মপ্রত্যাশীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা
তবে মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কর্মী পাঠানোর বিস্তারিত প্রক্রিয়া এখনো প্রক্রিয়াধীন। তাই সরকারি বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশনা প্রকাশের আগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কথায় টাকা দেওয়া উচিত নয়।
সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী—
আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগে কোনো অর্থ লেনদেন করা যাবে না।
নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত মেডিকেল পরীক্ষা করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
কোনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে পাসপোর্ট জমা দেওয়া যাবে না।
শুধু অনুমোদিত প্রক্রিয়া ও সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
মালয়েশিয়ায় চাকরির নামে কেউ টাকা দাবি করলে তার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর চূড়ান্ত প্রক্রিয়া ও পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে যথাসময়ে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হবে।
মন্ত্রণালয়ের প্রত্যাশা, নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে অতীতের অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও স্বচ্ছ, কম ব্যয়বহুল এবং কর্মীবান্ধব একটি অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সংক্ষেপে: মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কী পরিবর্তন আসছে?
প্রথম ধাপে: ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ।
কর্মী পাঠাবে: সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলসহ অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি।
রিক্রুটিং এজেন্সি: ২৫টি সরাসরি + ৩১২টি সহযোগী = ৩৩৭টি বেসরকারি এজেন্সি; এর সঙ্গে বোয়েসেল।
প্রাথমিক মেডিকেল সেন্টার: ১৬টি।
প্রথম ধাপের কর্মীদের ব্যয়: বিমান ভাড়াসহ অভিবাসন ব্যয় সরকারিভাবে বহনের পরিকল্পনা।
মনিটরিং: ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল ও হেল্পডেস্ক স্থাপনের উদ্যোগ।
কর্মপ্রত্যাশীদের সতর্কতা: সরকারি বিজ্ঞপ্তি না আসা পর্যন্ত টাকা, মেডিকেল বা পাসপোর্ট জমা নয়।

