প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং আত্মনির্ভরশীল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সেই ধারাবাহিকতায় তিনজন মেধাবী ও সংগ্রামী প্রতিবন্ধী ব্যক্তির হাতে সরাসরি সরকারি চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকালে বাংলাদেশ সচিবালয়ে দিনের কর্মসূচির শুরুতেই এক আন্তরিক ও আবেগঘন পরিবেশে প্রধানমন্ত্রী তাদের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দেন। এ সময় উপস্থিত অতিথি ও কর্মকর্তারা নিয়োগপ্রাপ্তদের সংগ্রামী জীবন এবং সাফল্যের গল্পে অনুপ্রাণিত হন।
সরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাওয়া তিনজন হলেন—গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার আয়শা আক্তার, সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার নীলা খাতুন এবং নড়াইল সদর উপজেলার মো. হাসমত আলী।
তাদের মধ্যে আয়শা আক্তার ও নীলা খাতুন জন্মগতভাবে দুই হাতবিহীন। শারীরিক এই সীমাবদ্ধতাকে পরাজিত করে তারা পা দিয়ে লিখে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। দীর্ঘ সংগ্রাম, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছেন—ইচ্ছাশক্তির কাছে কোনো প্রতিবন্ধকতাই অদম্য নয়।
সিরাজগঞ্জের নীলা খাতুনকে রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে গাইবান্ধার আয়শা আক্তারকে বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজে ক্লাস সুপারভাইজার পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
নিয়োগপত্র গ্রহণের সময় হৃদয়স্পর্শী এক দৃশ্যের অবতারণা হয়। দুই হাত না থাকায় আয়শা আক্তার প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে মুখ দিয়ে নিয়োগপত্র গ্রহণ করেন। উপস্থিত সবার কাছে মুহূর্তটি হয়ে ওঠে আবেগঘন ও অনুপ্রেরণামূলক।
এদিকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মো. হাসমত আলীকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন ইউনিয়ন সমাজকর্মী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি সমাজের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কেবল সামাজিক সহানুভূতির নয়, বরং যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এ ধরনের উদ্যোগ তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর পাশাপাশি সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার পথকে আরও সুগম করবে।
নিয়োগপত্র প্রদান অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল, সমাজকল্যাণ সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তরিকুল আলম এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আবদুস সাত্তার দুলাল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ উদ্যোগের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার এমন উদ্যোগ শুধু তিনজনের জীবনই বদলাবে না, বরং দেশের হাজারো প্রতিবন্ধী মানুষকে নতুন স্বপ্ন দেখাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মসংস্থানের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হলে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারবেন। একই সঙ্গে এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হবে।

