শিক্ষকদের নিজেদের প্রাপ্য অর্থ পেতে ঘুষ দেওয়া কিংবা দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে হয়রানির শিকার হওয়াকে জাতির দীনতা ও হীনতার প্রকাশ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, যে শিক্ষক সমাজ দেশের মানুষকে নীতি, নৈতিকতা ও আদর্শের শিক্ষা দেন, তাঁদেরই যদি নিজেদের অধিকার আদায়ে ঘুষ দিতে হয়, তাহলে এর চেয়ে লজ্জাজনক বিষয় আর হতে পারে না।
শনিবার (১৫ আগস্ট) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধের অংশ হিসেবে দেশের ৬৪ জেলার ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-শিক্ষিকার মধ্যে এককালীন ২ হাজার ৩৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অর্থ সরাসরি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়েছে।
‘শিক্ষকরাই জাতির নীতি-নৈতিকতার ভিত্তি তৈরি করেন’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষক সমাজ শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না; তাঁরা একটি প্রজন্মের চিন্তা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের কাছ থেকেই শিক্ষার্থীরা দেশপ্রেম, ন্যায়-অন্যায়বোধ, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার শিক্ষা পায়।
এ কারণে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, শিক্ষকদের নিজেদের জমানো বা আইনগতভাবে প্রাপ্য অর্থ পেতে ঘুষ দিতে হবে—এ ধরনের পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁদের এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরে হয়রানির শিকার হওয়ার বিষয়টিও বন্ধ করতে হবে।
৭০ হাজারের বেশি শিক্ষক পেলেন বকেয়া অর্থ
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ২০২২ সালের পরবর্তী সময়ের বকেয়া অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ পরিশোধের অংশ হিসেবে ৬৪ জেলার ৭০ হাজার ১১৯ জন শিক্ষক-শিক্ষিকার ব্যাংক হিসাবে মোট ২ হাজার ৩৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা পাঠানো হয়েছে।
এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারীর আর্থিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকদের প্রাপ্য অর্থ পাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার প্রয়োজন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
‘অনলাইন ব্যবস্থায় হয়রানি ছাড়াই অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বর্তমান সরকার অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রাপ্য অর্থ সরাসরি তাঁদের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
ডিজিটাল ব্যবস্থার ফলে মধ্যস্বত্বভোগী কিংবা অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়ের সুযোগ কমবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে অবসর ও কল্যাণ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে যেন কোনো শিক্ষককে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে না হয়, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তহবিল নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে ব্যাংক ও বীমার পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষকদের কল্যাণ ও অবসর সুবিধা তহবিল নিয়েও অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভুয়া ইনডেক্স তৈরিসহ বিভিন্ন অনিয়মের কারণে তহবিলগুলো প্রায় দেউলিয়া হওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েছিল।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য বা স্বাধীন তদন্তের ফলাফল আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রীয় অর্থ ও শিক্ষকদের কল্যাণ তহবিলের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষকদের প্রাপ্য অর্থ নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
শিক্ষা ও নারীশিক্ষায় খালেদা জিয়ার অবদান স্মরণ
অনুষ্ঠানে শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্ন উদ্যোগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়ার অবদানের কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তারেক রহমান।
বিশেষ করে শিক্ষা উপবৃত্তি ও নারীশিক্ষার প্রসারে তাঁর সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন তিনি।
শিক্ষকদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিতের তাগিদ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকদের মর্যাদা শুধু বক্তব্যের মাধ্যমে নয়, তাঁদের বাস্তব জীবনেও নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত বেতন-ভাতা, অবসরকালীন সুবিধা, কল্যাণ সুবিধা এবং অন্যান্য প্রাপ্য অর্থ যথাসময়ে পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, একজন শিক্ষককে যদি তাঁর ন্যায্য পাওনা পেতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয় কিংবা ঘুষ ও হয়রানির শিকার হতে হয়, তাহলে তা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই নেতিবাচক বার্তা তৈরি করে।
তাই শিক্ষকদের আর্থিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবসর ও কল্যাণ সুবিধা প্রদানের পুরো প্রক্রিয়াকে আরও ডিজিটাল, স্বচ্ছ, দ্রুত ও দুর্নীতিমুক্ত করার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী।

