ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

গঙ্গার পানি বাড়ছে, ফারাক্কার সব গেট খোলার দাবি বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৪, ২০২৬, ০৯:৪৮ এএম

গঙ্গার পানি বাড়ছে, ফারাক্কার সব গেট খোলার দাবি বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর

ছবিঃ সংগৃহীত

বিহারে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি এবং গঙ্গা নদীর পানির উচ্চতা বাড়তে থাকায় ফারাক্কা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী। এ বিষয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন।

রোববার (২৩ আগস্ট) ফোনালাপে বিহারের বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ফারাক্কা ব্যারাজের সব জলকপাট খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইয়ের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সম্রাট চৌধুরী বলেন, গঙ্গা নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে এবং বিহারের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় ফারাক্কা ব্যারাজের সব গেট খুলে দিলে নদীর পানির প্রবাহ স্বাভাবিক হতে পারে এবং বিহারের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।

দ্রুত পদক্ষেপের আশ্বাস

ফোনালাপের বিষয়টি জানিয়ে সম্রাট চৌধুরী বলেন, বিহারের বন্যা পরিস্থিতি এবং গঙ্গার পানির উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে তুলে ধরেছেন তিনি।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফারাক্কা ব্যারাজের সব গেট খুলে দেওয়ার অনুরোধের পর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

সম্রাট চৌধুরী বলেন, ফারাক্কার গেট খুলে দিলে গঙ্গার পানির প্রবাহ সহজ হবে এবং বিহারের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে বিহারের মানুষের নিরাপত্তা ও ত্রাণ কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তি নিয়ে নতুন বিতর্ক

এদিকে ফারাক্কা ব্যারাজ ও গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিহারের রাজনৈতিক দল জনতা দল-ইউনাইটেডের (জেডিইউ) সাংসদ সঞ্জয় ঝা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তার দাবি, চুক্তিটি নবায়নের ক্ষেত্রে বিহারের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, বিহারের স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে চুক্তি নবায়ন করা উচিত হবে না।

সঞ্জয় ঝার বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের সময় বিহারের স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, ওই সময়ই বিহারের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

ডিসেম্বরে চুক্তির ৩০ বছর

১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তির ৩০ বছর পূর্ণ হবে আগামী ডিসেম্বরে। এই সময়সীমাকে সামনে রেখে চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সঞ্জয় ঝা বলেছেন, চুক্তি নবায়নের আগে বিহারের স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে এবং বিহারের স্বার্থ নিশ্চিত না করে চুক্তি নবায়ন না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এতে একদিকে বিহারের বন্যা পরিস্থিতি, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানি বণ্টন—দুই বিষয়ই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা কেন গুরুত্বপূর্ণ

ফারাক্কা ব্যারাজ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এর মাধ্যমে গঙ্গার পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে হুগলি নদীতে পানি প্রবাহিত করার ব্যবস্থা রয়েছে।

বাংলাদেশে প্রবেশের পর গঙ্গা নদী পদ্মা নামে পরিচিত। ফলে ফারাক্কায় পানির প্রবাহের পরিবর্তন বাংলাদেশের পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

এই কারণে ফারাক্কা ব্যারাজ ও গঙ্গার পানি বণ্টন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়।

৫৪টি অভিন্ন নদী

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মোট ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এসব নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, নদীভাঙন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

এর মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ১৯৯৬ সালে দুই দেশ একটি চুক্তিতে পৌঁছায়। চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানির প্রবাহের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি বণ্টনের ব্যবস্থা করা হয়।

তবে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন এখনো অমীমাংসিত। এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একাধিক দফা আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।

তিস্তা চুক্তিও আটকে আছে

২০১১ সালে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে একটি চুক্তির প্রস্তাব সামনে এসেছিল। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, তিস্তার পানির ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ ভারত এবং ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ বাংলাদেশ পাওয়ার কথা ছিল। অবশিষ্ট পানি অন্যান্য প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় ব্যবহারের কথা ছিল।

তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে সেই প্রস্তাব আর বাস্তবায়িত হয়নি।

তিস্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত অবস্থার মধ্যেই এবার ফারাক্কার সব গেট খুলে দেওয়ার জন্য বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধ এবং ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন নিয়ে বিহারের রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বাংলাদেশ-ভারত পানি সম্পর্কের ওপর নজর

বিহারের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফারাক্কার গেট খোলার দাবি মূলত ভারতের অভ্যন্তরীণ বন্যা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এর প্রভাব সীমান্তের ওপারেও পড়তে পারে। কারণ গঙ্গার পানির প্রবাহ পরিবর্তিত হলে তার প্রভাব পদ্মা নদীর প্রবাহেও পড়ার সম্ভাবনা থাকে।

ফলে ফারাক্কা ব্যারাজের গেট খোলা, গঙ্গার পানির প্রবাহ এবং ১৯৯৬ সালের পানি চুক্তি নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্য—সবকিছুর দিকেই বাংলাদেশকে সতর্ক নজর রাখতে হবে।

বিশেষ করে আগামী ডিসেম্বরে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তির ৩০ বছর পূর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপটে চুক্তিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা দুই দেশের পানি কূটনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!