ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

যন্ত্র কেনা হয়েছে, সেবা নেই—কার স্বার্থে এই অপচয়?

২৮ জেলার ৫৩ হাসপাতালে ১৪৮ চিকিৎসাযন্ত্র অব্যবহৃত | জনবল-অবকাঠামো ছাড়াই কোটি কোটি টাকার কেনাকাটা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ২২, ২০২৬, ০২:৩৮ পিএম

২৮ জেলার ৫৩ হাসপাতালে ১৪৮ চিকিৎসাযন্ত্র অব্যবহৃত | জনবল-অবকাঠামো ছাড়াই কোটি কোটি টাকার কেনাকাটা

ছবিঃ সংগৃহীত

২৮ জেলার ৫৩ সরকারি হাসপাতালে পড়ে আছে ১৪৮টি আধুনিক যন্ত্র | জনবল-অবকাঠামোর অভাবে অচল আইসিইউ, ক্যাথল্যাব, ডায়ালাইসিস ইউনিট | কোথাও বছরের পর বছর তালাবদ্ধ কক্ষেই নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সরঞ্জাম । শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে সরকারি হাসপাতালে কেনা হয়েছে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। কোথাও আইসিইউর জন্য ভেন্টিলেটর, কোথাও হৃদরোগীদের এনজিওগ্রাম ও রিং পরানোর ক্যাথল্যাব, আবার কোথাও ডায়ালাইসিস, সিটি স্ক্যান, এমআরআই কিংবা ক্যানসারের রেডিওথেরাপির যন্ত্র। কিন্তু কেনার পর বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও এসবের বড় একটি অংশ চালু করা যায়নি। কোনোটি বাক্সবন্দি, কোনোটি ধুলায় ঢেকে গেছে, আবার কোনোটি তালাবদ্ধ কক্ষে পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার পথে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নথি বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। নথি অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের ২৮ জেলার ৫৩টি সরকারি হাসপাতালে ১৪৮টি চিকিৎসা সরঞ্জাম অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। তালিকায় থাকা যন্ত্রপাতির ৬০ শতাংশের বেশি আইসিইউ, ভেন্টিলেটর, এমআরআই, সিটি স্ক্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ ও ভারী চিকিৎসা সরঞ্জাম।

এদিকে অন্তত পাঁচটি সরকারি হাসপাতালে সরেজমিন অনুসন্ধানে প্রায় ১০০ কোটি টাকা মূল্যের চিকিৎসা সরঞ্জাম অব্যবহৃত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব যন্ত্র সচল থাকলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজারো রোগী নিজ জেলাতেই উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পেতেন। কিন্তু জনবল, অবকাঠামো, অক্সিজেন, বিদ্যুৎ, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট কিংবা প্রয়োজনীয় কারিগরি ব্যবস্থার অভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থে কেনা এসব সম্পদ এখন অনেক ক্ষেত্রেই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

টাঙ্গাইলে তালাবদ্ধ আইসিইউ, কাজে আসছে না কোটি টাকার যন্ত্র

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এই সংকটের অন্যতম বড় উদাহরণ। ২০২২ সালে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৫০০ শয্যার হাসপাতালটিতে আধুনিক চিকিৎসার জন্য নানা ধরনের অবকাঠামো ও সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় সব সুবিধা চালু না হওয়ায় রোগীদের অনেক পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে হচ্ছে।

সরেজমিনে হাসপাতালের সপ্তম তলায় গিয়ে দেখা যায়, আইসিইউর গেটে ঝুলছে মরিচা ধরা তালা। জানালা দিয়ে ভেতরে দেখা যায়, ১০ শয্যার আইসিইউতে ভেন্টিলেটরসহ আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম রয়েছে। কোভিড-১৯ ইআরপি প্রকল্পের আওতায় ২০২৩ সালে আইসিইউটি স্থাপন করা হলেও দীর্ঘ সময়েও তা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই ও জনবল না থাকায় আইসিইউ চালু করা সম্ভব হয়নি।

হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই না থাকায় আইসিইউ চালু করা যায়নি। মেশিনারি দেওয়া, নেওয়া ও সেটআপের ক্ষেত্রে শুরুতেই কিছু সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল বলেও তিনি জানান।

ক্যাথল্যাব আছে, সেবা নেই

শুধু আইসিইউ নয়, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হৃদরোগীদের জন্য স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক ক্যাথল্যাব। ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোতে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করে এনজিওগ্রাম ও হার্টে রিং পরানো হয়, একই ধরনের যন্ত্র এখানে স্থাপন করা হয়েছে।

২০২২ সালে জাপানের ক্যানন ব্র্যান্ডের এই যন্ত্রটি আনতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা। উদ্দেশ্য ছিল টাঙ্গাইলসহ আশপাশের জেলার বিপুলসংখ্যক হৃদরোগীকে স্থানীয়ভাবে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া।

কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যন্ত্রটি চালু না থাকায় গত কয়েক বছরে একজন রোগীও এর মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাননি। ফলে হৃদরোগীদের এখনো উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী হতে হচ্ছে।

অর্থাৎ কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত একটি আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি রোগীর জীবন বাঁচানোর পরিবর্তে পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়।

আট বছরেও চালু হয়নি ডায়ালাইসিস ইউনিট

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরও একটি বড় সমস্যা হলো ডায়ালাইসিস ইউনিট। সেখানে ১০টি অত্যাধুনিক ডায়ালাইসিস মেশিন থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে সেগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

প্রায় আট বছর ধরে পড়ে থাকা এসব মেশিনের সেবা না পাওয়ায় কিডনি রোগীদের বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। নিয়মিত ডায়ালাইসিস প্রয়োজন এমন রোগীদের জন্য এতে চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মতে, ডায়ালাইসিস চালুর জন্য প্রয়োজনীয় ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিবিদসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রয়োজন। এসব নিশ্চিত না হওয়ায় মেশিন থাকা সত্ত্বেও ইউনিটটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা যাচ্ছে না।

রোগীর মৃত্যু, প্রশ্ন উঠছে চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা নিয়ে

এমন বাস্তবতায় টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে হতাশ হচ্ছেন রোগী ও স্বজনরা। সম্প্রতি পেটে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে আসা ফকি আক্তারের ঘটনাটি সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।

৫ আগস্ট ভোরে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে হাসপাতালে আনা হয়। স্বজনদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাদের দীর্ঘ সময় ছোটাছুটি করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত দুপুরের দিকে দুই সন্তানের মা ফকি আক্তারকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

তার এক আত্মীয়ের অভিযোগ, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ না থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে হয়। এতে চিকিৎসা পেতে দেরি হয় এবং স্বজনদের দুর্ভোগ বাড়ে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট রোগীর মৃত্যুর সঙ্গে হাসপাতালে থাকা বা না থাকা কোনো যন্ত্রের সরাসরি সম্পর্ক ছিল কি না, তা চিকিৎসা-তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কিন্তু এ ধরনের ঘটনায় সরকারি হাসপাতালে স্থাপিত চিকিৎসা সরঞ্জাম কেন কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না—সে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জে ১০ কোটি টাকার ক্যাথল্যাবও ধুলায়

টাঙ্গাইলের পর একই চিত্র দেখা গেছে সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও। প্রায় ৮৮২ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্পের আওতায় হাসপাতালটির জন্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হয়।

এর মধ্যে হৃদরোগীদের চিকিৎসার জন্য ২০২২ সালে স্থাপন করা হয় অত্যাধুনিক ক্যাথল্যাব। প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা যন্ত্রটির মাধ্যমে এনজিওগ্রাম ও হার্টে রিং পরানোর কথা ছিল।

কিন্তু জনবল না থাকায় ক্যাথল্যাবটি এখনো চালু করা যায়নি। ফলে গুরুতর হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে।

হাসপাতালের উপপরিচালক মো. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ক্যাথল্যাবের সম্পূর্ণ সেটআপ রয়েছে; কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে এটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

প্রকল্প শেষ, কিন্তু সেবা শুরু হয়নি

সিরাজগঞ্জ হাসপাতালের প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে পরিকল্পনার দুর্বলতার বিষয়টি। প্রকল্পের সময় যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত জনবল তখনও নিশ্চিত করা হয়নি।

প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কৃষ্ণকুমার পাল জানান, প্রকল্প চলাকালে পর্যাপ্ত জনবল ছিল না। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়।

এদিকে আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরে প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে বরখাস্তের তথ্যও সামনে এসেছে। তবে যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত থাকার সঙ্গে এসব অভিযোগের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা পৃথক তদন্তের বিষয়।

পটুয়াখালীতে ৭৮ কোটি টাকার যন্ত্র বাক্সবন্দি

পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭৮ কোটি টাকা মূল্যের ভারী চিকিৎসা সরঞ্জাম দুই বছর ধরে বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে।

এসব সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে সিটি স্ক্যান, এমআরআই, আলট্রাসনোগ্রামসহ বিভিন্ন আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্র। পুরোপুরি ইনস্টলেশন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন না হওয়ায় এগুলো এখনো রোগীদের সেবায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

ফলে সরকারি হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকার পরও রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা অন্য শহরে যেতে হচ্ছে।

২০১২ সাল থেকে পড়ে আছে লিনিয়ার এক্সিলারেটর

চিকিৎসা সরঞ্জাম অব্যবহৃত থাকার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী উদাহরণগুলোর একটি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিনিয়ার এক্সিলারেটর। ক্যানসার রোগীদের রেডিওথেরাপি দেওয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই যন্ত্রটি ২০১২ সাল থেকে পড়ে আছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

যন্ত্রটি সচল করা গেলে খুলনা ও আশপাশের এলাকার ক্যানসার রোগীদের ঢাকায় না গিয়ে স্থানীয়ভাবে রেডিওথেরাপি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতো। কিন্তু প্রয়োজনীয় বাংকারসহ সহায়ক অবকাঠামো তৈরি না হওয়ায় যন্ত্রটি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

অর্থাৎ যন্ত্র কেনার পর সেটি পরিচালনার জন্য যে অবকাঠামো আগে নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল, তা যথাসময়ে না করায় একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা প্রযুক্তি বছরের পর বছর অকার্যকর হয়ে আছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তালিকায় ১৪৮ যন্ত্র

দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের এমন বিচ্ছিন্ন চিত্রকে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নথি। নথি অনুযায়ী, ২৮ জেলার ৫৩টি সরকারি হাসপাতালে ১৪৮টি চিকিৎসা সরঞ্জাম অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

তালিকায় থাকা সরঞ্জামগুলোর মধ্যে—

ওটি ও আইসিইউ সরঞ্জাম: ৪২টি
ল্যাব ও প্যাথলজি যন্ত্রপাতি: ৪০টি
ইমেজিং ও এক্স-রে যন্ত্র: ১৪টি
বিশেষায়িত ভারী মেশিন: ৫২টি

অব্যবহৃত সরঞ্জামের একটি বড় অংশই অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং বিশেষায়িত। ফলে এগুলো দীর্ঘদিন চালু না থাকলে শুধু জনগণ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে না, যন্ত্রগুলোর কার্যক্ষমতা ও ব্যবহারযোগ্যতাও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যন্ত্র কেনার আগে পরিকল্পনা ছিল কি?

সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে সাধারণত শুধু যন্ত্র কেনাই যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট যন্ত্র পরিচালনার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত টেকনোলজিস্ট, নার্স, বিদ্যুৎ, অক্সিজেন, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কক্ষের উপযোগী নকশা, রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রের সার্ভিসিং—সবকিছুর সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন।

কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, অনেক ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি কেনা ও স্থাপনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো একই সময়ে নিশ্চিত করা হয়নি।

এতে প্রশ্ন উঠছে—প্রকল্প গ্রহণের সময় কি ‘যন্ত্র কেনা’কেই মূল লক্ষ্য ধরা হয়েছিল, নাকি রোগীর কাছে কার্যকর চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো ছিল প্রকৃত উদ্দেশ্য?

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অবস্থান

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেছেন, জনগণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বাজেট বাড়লেই তা যত্রতত্র ব্যয় করার সুযোগ নেই। অব্যবহৃত যন্ত্রপাতি যাতে দ্রুত কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো নিশ্চিত না করেই আগের সরকারের সময়ে অতিরিক্ত দামে অনেক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছিল এবং এর পেছনে অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তিনি বলেন, যেসব যন্ত্র জনবল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে সচল করা সম্ভব, সেগুলো চালু করা হবে। যেগুলো মেরামতযোগ্য, সেগুলো মেরামত করে ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ঠেকাতে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সরকারি হাসপাতালে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে যন্ত্রপাতি কেনার পর তা যদি বছরের পর বছর অব্যবহৃত থাকে, তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্যও বড় ক্ষতি। কারণ এসব যন্ত্রের অর্থ এসেছে জনগণের করের টাকা থেকে। একদিকে রোগীরা উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী বা বেসরকারি হাসপাতালে যেতে বাধ্য হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারি হাসপাতালে পড়ে থাকা যন্ত্রের পেছনে ব্যয় হওয়া অর্থ কোনো সেবা তৈরি করছে না। বরং সময়ের সঙ্গে যন্ত্র নষ্ট হলে পুনরায় মেরামত বা নতুন যন্ত্র কেনার প্রয়োজন হতে পারে।

তাই নতুন করে যন্ত্র কেনার আগে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে জনবল, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, অক্সিজেন, পানি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহার পরিকল্পনা নিশ্চিত করা, একই সঙ্গে আগে কেনা অব্যবহৃত যন্ত্রপাতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে দ্রুত সচল করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৪৮টি অব্যবহৃত যন্ত্রের তালিকা কেবল সরকারি নথির সংখ্যা নয়; এর প্রতিটি যন্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনগণের অর্থ, চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার এবং অসংখ্য রোগীর জীবন-মৃত্যুর বাস্তবতা।

তালাবদ্ধ কক্ষের দরজা খুলে এসব যন্ত্র দ্রুত সচল করা গেলে সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা যেমন বাড়বে, তেমনি কমবে রোগীদের বেসরকারি হাসপাতালনির্ভরতা। আর তা না হলে বাক্সবন্দি যন্ত্রের সঙ্গে ধীরে ধীরে নষ্ট হবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ—আর চিকিৎসার জন্য ছুটতে থাকবে সাধারণ মানুষ।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!